অমিতাভ-ঋষি: বন্ধু তুমি, শত্রু তুমি

‘এটা খুব ছোট্ট একটা ইন্ডাস্ট্রি!’

বি-টাউনে এই কথাটা প্রায়ই শোনা যায়। কথাটা খুব মিথ্যাও না। অভিনয় শিল্পীরা আজ গলাগলি করে ঘুরছেন, তো কাল তাঁদের মধ্যে মুখ দেখাদেখি বন্ধ। আবার ঠিক এর পরদিনই বইছে শান্তির সুবাতাস। পর্দায় যেমন তাঁরা অনেক রং দেখান, তাদের ভেতরকার সম্পর্কগুলোও তেমনি ক্ষণে ক্ষণে রং বদলায়।

কথাটা বলিউডের ক্লাসিক দুই অভিনেতা – অমিতাভ বচ্চন ও ঋষি কাপুরের ক্ষেত্রেও খাটে। কখনো তাঁরা খুব ভাল বন্ধু ছিলেন, একটা পর্যায়ে পারিবারিক, সামাজিক নানা কারণে তাঁদের মধ্যে দূরত্ব চলে এসেছে। আবার সেই দূরত্ব একদম ঘুঁচে গিয়ে শেষবেলায় তাঁরা আবারো ঘনিষ্ট হয়েছেন।

ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই দু’জন দু’টি ভিন্ন ঘরানায় কাজ করেছেন। বক্স অফিসে তাদের মধ্যে এক সময় হাড্ডাহাড্ডি যুদ্ধ হত। দুই শীর্ষ নায়ক ছিলেন আশির দশকের। কাজে প্রতিদ্বন্দ্বীতা থাকলেও, সেটার প্রভাব নিজেদের সম্পর্কের ওপর পরেনি কখনো। বরং নানা ভাবে একজন আরেকজনকে সাহায্য করতেন।

নায়ক হিসেবে ঋষির অভিষেক ১৯৭৩ সালে। ছবির নাম ‘ববি’। বিপরীতে ডিম্পল কাপাডিয়া। বাবার নির্মানে প্রথম ছবিতেই বাজিমাৎ। ছবি দিয়ে ‘চকোলেট বয়’-এর তকমা পান। ঋষি মানেই তখন রোম্যান্টিকতা।

যশ চোপড়ার ছবি ‘কাভি কাভি’। অমিতাভ ও ঋষির সাথে শশী কাপুর।

অমিতাভের ক্যারিয়ারও তখন শুরুর দিকে। একই বছর মুক্তি পায় ‘জাঞ্জির’। এই ছবি দিয়ে ‘অ্যাঙরি ইয়ং ম্যান’-এর তকমা পান ‘বিগ বি’। বচ্চন-কাপুরের লড়াইয়ের প্রথম রাউন্ডে জয়টা ভালবাসারই হয়েছিল!

শুরুর এই যুদ্ধের পর অবশ্য লড়াইয়ের চেয়ে তাদের পাশাপাশি হাঁটাই হয়েছে বেশি। তারা ‘অমর আকবর অ্যান্থনী’, ‘কাভি কাভি’ কিংবা ‘কুলি’র মত কালজয়ী ছবিতে স্ক্রিন শেয়ার করেছেন।

‘কুলি’ ছবির একটি দৃশ্য

নব্বইয়ের দশকটা ‘সারভাইভ’ করা দু’জনের জন্যই ছিল কষ্টকর। কারণ, ততদিনে নিজেদের যৌবন হারিয়ে ফেলেছিলেন। নায়কের চরিত্র করে যাচ্ছিলেন, কিন্তু একদমই মানাচ্ছিল না। কালক্রমে দু’জনই চরিত্রাভিনেতা হওয়ার পথে হাঁটেন। আর রাতারাতি সাফল্যও পান। এই জায়গাটায় এই দু’জন অনন্য।

দু’জনের মধ্যে দূরত্ব আসার বিষয়টা আসলে হয়েছিল পারিবারিক কারণেই। অমিতাভের ছেলে অভিষেক বচ্চনের সাথে প্রেম ছিল রণধীর কাপুরের মেয়ে ও ঋষি কাপুরের ভাতিজি কারিশমা কাপুরের।  মুম্বাইয়ের পাঁচ তারকা হোটেলে অমিতাভের ৬০ তম জন্মদিনে দুই পরিবারের উপস্থিতিতে তাঁদের বাগদানও হয়।

১৯৯১ সালের ছবি ‘আজুবা’

তবে, এর কয়েক মাস পরই পাল্টে যায় দৃশ্যপট। কারিশমার মা অবশ্য সেই সম্পর্কের বিরোধী ছিলেন। তাঁর অভিষেককে পছন্দ ছিল না। কারণ, অভিষেকের ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের সিনেমাগুলো মার খাচ্ছিল বক্স অফিসে। তাই নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন তিনি।

হুট করে বিয়ে ভেঙে যাওয়ায় বচ্চন ও কাপুর পরিবারের মধ্যকার সৌহার্দ্রপূর্ণ সম্পর্কে ছেদ পড়ে। মুখ দেখাদেখিও বন্ধ ছিল তাদের মধ্যে। এক সময়ের বন্ধু অমিতাভ ও ঋষিও ২৭ বছর এক সাথে কোনো ছবি করেননি।

‘আজুবা’র পর ‘১০২ নট আউট’ – মাঝে ২৭ বছরের লম্বা বিরতি

এই অচলায়তন ভাঙে সম্প্রতিই। দু’জনে মিলে ‘১০২ নট আউট’ ছবিতে কাজ করেন। ২০১৮ সালে এই জুটির প্রত্যাবর্তনটা স্মরণীয় হয়ে ছিল। দু’জনেরই কমিক সেন্স আর টাইমিং ছিল অসাধারণ। অমিতাভ এখানে বাবা, আর ঋষি ছেলে।

ঋষি খিটখিটে এক বুড়োর চরিত্রে কাজ করলেও অমিতাভ ছিলেন পুরো উল্টো। চিরতরুণ, আমোদপ্রিয় এই শতবর্ষী বুড়ো নি:সন্দেহে সবার মন জয় করেছেন। দু’জনের এই যুগলবন্দী ৭০-৮০ দশকের দর্শকদের নস্টালজিয়ায় নিয়ে যেতে শতভাগ সক্ষম হয়েছিল।

হয়তো, সামনেও এক সাথে আরো কাজ করতেন দু’জনে। কিন্তু, তা আ হল কোথায়! ২০২০ সালের ৩০ এপ্রিল ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধ করে শেষ বিদায় বলে দিলেন ঋষি। টুইটারে সবার আগে খবরটা অমিতাভই জানান।

অভিষেক বচ্চন রাগ ভুলে ছুটে যান হাসপাতালে। শত্রুতা, অপমান, রাগ, ক্রোধ – সব অনুভূতিগুলো মিথ্যা হয়ে যায় কেবল একটি চলে যাওয়ার খবরে!

১০২ নট আউট

অমিতাভ লিখেছেন, ‘আমি ওকে অসুস্থ অবস্থায় কখনো দেখতে যাইনি। ওই হাসিমাখা মুখটার ওরকম পরিণতি দেখার দু:সাহস আমার ছিল না। তবে, আমি নিশ্চিত শেষ বিদায়ে ওর ঠোঁটে একটা স্মিত হাসি ছিল!’

আহা বন্ধুত্ব!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।