আমিনুল বিপ্লব: আ বিগ হার্টেড লেগি

তিনটি ম্যাচ কাউকে বিচার করার জন্য যথেষ্ট নয়। তবে তৃতীয় ম্যাচটি দেখে কিছু বলে ফেলার সাহস পাচ্ছি। আমিনুল ইসলাম বিপ্লব নামক ছোট ছেলেটির হৃদয় অনেক বড়!

লেগ স্পিনারদের ‘বিগ হার্টেড’ হতে হয়। বিশাল হৃদয় না হলে এই শিল্পের ঝানু কারিগর হওয়া কঠিন। বাজে দিন আসবে, মার খেতে হবে, বাজে ডেলিভারি হবে, ব্যাটসম্যান গুঁড়িয়ে দিতে চাইবে। কিন্তু ভেঙে পড়লে চলবে না। বরং ওসববেই শিকার ধরার উপায় খুঁজতে হবে। ঘুরে দাঁড়াতে হবে। ২০ বছর বয়সী, আপাত নিরীহ দর্শন, অন্তর্মুখি, চুপচাপ স্বভাবের ছেলেটি ‘বিগ হার্টেড’ ক্রিকেটার বলেই মনে হচ্ছে।

মনে হওয়া মানেই নিশ্চয়তা নয়। তবে সেই নিশ্চয়তায় পৌঁছানোর আভাস যথেষ্টই স্পষ্ট।

তৃতীয় ম্যাচে বাকি বোলারদের তুলোধুনো হওয়ার দিনেও বিপ্লব ছিলেন যথেষ্ট নিয়ন্ত্রিত। একই সঙ্গে দারুণ সাহসী। ব্যাটসম্যানদের রুদ্র মূর্তির সামনেও বল ফ্লাইট দিয়েছেন যথেষ্ট। তার প্রথম ওভারে ঝুলিয়ে দেওয়া বলে শিখর ধাওয়ান বেরিয়ে এসে চার মেরেছেন। পরের বল আরও ধীরগতিতে বাতাসে ভাসিয়ে দিয়েছেন। মার খেলে, ব্যাটসম্যান আগ্রাসী চেহারায় থাকলে অনেক স্পিনারই জোরে বোলিং করে ফেলেন। বিপ্লব ঠাণ্ডা মাথায় ফ্লাইট দিয়ে যাচ্ছিলেন, কলিজা লাগে এটি করতে।

ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে আসা ধাওয়ানকে তিনি ফ্লাইটে বিভ্রান্ত করেই বোল্ড করেছেন। রোহিতের উইকেটটি অবশ্য ভালো ডেলিভারিতে পাননি। অনেক শর্ট ছিল বল, কিন্তু পিচ করে নীচু হয়ে যাওয়ায় রোহিতের ব্যাটের মাঝে লাগেনি। লেগ স্পিনারদের ক্ষেত্রে এটি অস্বাভাবিক কিছু নয়। অনেক সময়ই সেরা ডেলিভারিতে উইকেট পান না তারা, পেয়ে যান আলগা বলে। বিপ্লব ফুল টস, শর্ট বলও করেছেন কিছু এই ম্যাচগুলিতে। মাত্রই শুরু করা তরুণ লেগ স্পিনারের জন্য এসবও অস্বাভাবিক নয়। বরং নিয়ন্ত্রণ ভালো মনে হয়েছে এই কয়েক ম্যাচে।

বিপ্লব অবশ্য বেশি চমকে দিয়েছেন ভারত সিরিজের প্রথম ম্যাচে। জানি না, এত টার্ন সেদিন তিনি কিভাবে পেলেন বা আদায় করলেন!

দিল্লির উইকেটের খানিকটা ভূমিকা নিশ্চয়ই ছিল। তবে শুধু উইকেটে সহায়তা থাকলেই তো হয় না, টার্ন করাতেও হয়। বিপ্লব তো ন্যাচারাল টার্নার নয় বলেই জানা ছিল। সেই তিনি কিভাবে অত টার্ন পেলেন!

নিশ্চয়ই তার ভেতরে কিছু ছিল। আছে। হয়তো এই ক’দিনে উন্নতি করেছেন।

ড্যানিয়েল ভেটোরি আসার পর কয়েক দিনে অনুশীলনে সবচেয়ে বেশি সময় কাটিয়েছেন বিপ্লবকে নিয়েই। এমনকি নিজেদের মধ্যে খেলা প্রস্তুতি ম্যাচে বিপ্লব বোলিংয়ে আসার পর ভেটোরি গিয়ে আম্পায়ারের পেছনে দাঁড়িয়েছেন, প্রতিটি ডেলিভারির পর বিপ্লবের সঙ্গে কথা বলেছেন। যুজবেন্দ্র চেহেলের উন্নতির পেছনে ভেটোরির অবদান অনেক, আইপিএলে বেঙ্গালুরুর দায়িত্বে থাকার সময় ভেটোরি কাজ করেছেন চেহেলর বোলিং নিয়ে। বিপ্লবও হয়তো তার সংম্পর্শে উপকৃত হবেন।

তবে যত কিছুই হোক, মাত্র এই কদিনে ভেটোরি নিশ্চয়ই জাদুমন্ত্র দিয়ে সব করে ফেলছেন না। বিপ্লবের ভেতরেই হয়তো লেগ স্পিনটা ছিল। এমনকি রাজকোটের ব্যাটিং স্বর্গেও টার্ন কিছু পেয়েছেন।

তো, ভেতরে কিছু আছে, মাথাটাও খাটাচ্ছেন, সাহসও আছে। ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল ধরে নেওয়ার অনেক উপকরণ আপাতত দেখা যাচ্ছে।

অথচ ২ মাস আগেও যদি বলা হতো, লেগ স্পিনার হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলবেন, বিপ্লব নিজেও হয়তো হেসেই খুন হতেন! হ্যাঁ, বোলিং তিনি করতেন। তবে মূলত ছিলেন ব্যাটসম্যান। মোটেও টি-টোয়েন্টি ঘরানার ব্যাটসম্যান নন, ধীরস্থির ব্যাটসম্যান। গত ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে ৪৪০ রান করেছিলেন, স্ট্রাইক রেট ছিল ৬৭। ইনজুরির কারণে বোলিং খুব বেশি করতে পারেননি।

লিগের পর এই বিপ্লবের লেগ স্পিন প্রতিভা নেটে দেখলেন এইচপি স্কোয়াডের কোচ সাইমন হেলমট। তার মনে ধরল। নির্বাচকদের বললেন। মনে ধরল নির্বাচকদেরও। আচমকাই তাকে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ‘এ’ দলে সুযোগ দেওয়া হলো। তার বোলিং দেখতে প্রধান নির্বাচক বিকেএসপি গেলেন। শ্রীলঙ্কা ইমার্জিংয়ের বিপক্ষে সিরিজে নেওয়া হলো। সেপ্টেম্বরে ত্রিদেশীয় টি-টোয়েন্টি সিরিজের আগে রশিদ খানের লেগ স্পিন সামলানোর প্রস্তুতি হিসেবে জাতীয় দলের নেটে নেওয়া হলো তাকে। জাতীয় দলের টিম ম্যানেজেমেন্টেরও মনে ধরল। রাতারাতি তার দুনিয়া বদলে গেল। ২ মাস আগের নেট বোলার এখন বাংলাদেশ ক্রিকেটের অন্যতম ভবিষ্যৎ।

তাকে দেখা, বুঝতে পারা এবং দলে নেওয়ার সাহসটুকুর জন্য এইচপির কোচ, জাতীয় নির্বাচক ও ম্যানেজমেন্ট কৃতিত্ব পেতেই পারে।

ঢাকা লিগের ব্যাটিং থেকে তাকে টি-টোয়েন্টি ঘরানার মনে করার কোনো কারণ নেই। তবে গতকাল শেষ দিকে নেমে একটি প্যাডল শটে চার মেরেছেন। একটি শট, বার্তা বেশ কিছু। ওই শটের মানে, তিনি মানিয়ে নিতে পারছেন, উদ্ভাবনী কিছু করার বোধ ও সাহস আছে।

একটা ব্যাপার মনে রাখতে হবে, তার সম্ভাবনা আছে, তবে এখনই অনেক কিছু আশা করা ঠিক নয়। তিনি পরিপূর্ণ লেগ স্পিনার নন এখনও, খুব প্রথাগতও নন। কন্ট্রোল ভালো, সাহস আছে, ব্যাটসম্যানকে বুঝে ও ফিল্ডিং অনুযায়ী বল করতে পারছেন। একটু টার্ন করাতে শিখছেন। দু-একটি ফ্লিপার দেখেছি। হয়ে গেছে, নাকি করিয়েছেন, জানি না। এই তো। খুব বেশি কিছু কিন্তু তার বোলিংয়ে এখনও নেই। সেটিই স্বাভাবিক, নিজেই তো নিজের লেগ স্পিনার সত্ত্বা জানতে পারলেন মাত্র কদিন হলো!

আর এখনকার ক্রিকেটে, টি-টোয়েন্টিতে কার্যকর হতে স্রেফ কিছু ব্যাপার থাকলেও চালিয়ে নেওয়া যায়, তা স্যামুয়েল বদ্রি, অ্যাডাম জ্যাম্পা, ইশ সোধিরা দেখাচ্ছেন। বিপ্লবের না পারার কারণ নেই।

তবে, এত দ্রুত নিজেকে যতটা গুছিয়ে নিয়েছেন এবং যেভাবে শিখছেন, এটাই সবচেয়ে আশা জাগানিয়া। নিশ্চয়ই আরও কিছু শিখবেন, যোগ করবেন বোলিংয়ে। আরও সমৃদ্ধ হবেন।

সেসব করতে গিয়ে আবার এখন যা আছে, সেসব হারিয়ে গেলে বিপদ। নিজের শক্তির জায়গা আরও পোক্ত করে তবেই অন্যান্য কিছু যোগ করতে হবে। তরুণ একজন লেগ স্পিনারকে অনেক সতর্কতায় এগোতে হয়। দেশের ক্রিকেটেরও দায়িত্ব, তাকে যত্ন করে সামলানোর। পরের ম্যাচেই ৪ ওভারে ৫০-৬০ হজম করতে পারেন। অনেক দিনই আসবে, বেদম মার খাবেন। কিন্তু ভরসা তার ওপর রাখতে হবে। তাকে বিশ্বাস জোগাতে হবে।

আবার শুরুতে ফিরছি, মাত্রই তিন ম্যাচ যথেষ্ট নয় সব বোঝার জন্য। আশার তীব্র আলো দেখার পর সেটি আলেয়া প্রমাণিত হওয়ার নজির দেশের ক্রিকেটে অসংখ্য আছে। বিপ্লবের বাস্তবতাও প্রমাণ করবে সময়। তবে সেই সময়টা পর্যন্ত, বিপ্লবের নিজের আর দেশের ক্রিকেটের, দায়িত্ব সমান!

– ফেসবুক ওয়াল থেকে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।