শো মাস্ট গো অন!

ক্যানবেরায় কার্টিস প্যাটারসন টেস্টে নিজের প্রথম সেঞ্চুরি করেছেন। গ্যালারিতে বসে ছেলের এই কীর্তির স্বাক্ষী হয়েছেন প্যাটারসনের বাবা-মা। সেঞ্চুরির পর প্যাটারসন যখন গ্যালারীর উদ্দেশ্যে ব্যাট উচিয়ে ধরেছেন, বাবার চোখ তখন ছলছল, মা একটানা হাততালি দিয়েই যাচ্ছেন। ছেলের সাফল্যে গর্বিত বাবা-মায়ের মুখের হাসি এই পৃথিবীর সেরা দৃশ্যগুলোর একটি।

দেখতে দেখতে আমার হঠাৎ মনে পড়ে গেল আরেক মায়ের কথা। ২৫ নভেম্বর ২০১৪, সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ড। শেফিল্ড শিল্ডের ম্যাচে ছেলের ব্যাটিং দেখতে এসেছিলেন ভার্জিনিয়া হিউজ। চমৎকার ব্যাটিং করছিল ছেলে। ফিফটি করে যখন ব্যাটটা উচিয়ে ধরলো গ্যালারির দিকে, হাততালি দিয়ে ছেলেকে অভিবাদন জানিয়েছিলেন মা।

কার্টিস প্যাটারসন

হয়তো আশায় ছিলেন, সেই মৌসুমে শিল্ডে প্রথম সেঞ্চুরিটা এই ম্যাচেই পেয়ে যাবে ছেলে। হয়তো সেটাই হতো। মা হয়তো ছেলের সেঞ্চুরির খুশিতে উদ্বেল হতেন, প্যাটারসনের মায়ের মতোই। হয়তো হাততালি দিতেন অনেকক্ষণ ধরে, দিনের খেলা শেষে হয়তো কপালে একে দিতেন একটা চুমু। হতেই পারতো এসব।

কিন্তু সেই সব সম্ভাবনা কেড়ে নিল একটা বাউন্সার। হুক করার ব্যর্থ প্রচেষ্টায় বলের আঘাতে মায়ের চোখের সামনেই ক্রিজে লুটিয়ে পড়লো ছেলে। আর উঠলো না। চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা, বিশ্বজুড়ে লাখো ক্রিকেটভক্তের প্রার্থনা বা মায়ের শুভাশীষ – সবকিছুকেই ব্যর্থ করে দিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন ফিল হিউজ।

অমোঘ নিয়তি বলেই মৃত্যু মাঝেমাঝে ক্রিকেটকে ছাপিয়ে যায়। ছেলের শেষযাত্রায় ভার্জিনিয়ার হু হু করে কান্নার ছবিটা এখনও চোখে লেগে আছে। ছেলের মৃত্যুতে মায়ের কান্না এই পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম দৃশ্যগুলোর একটি।

নিষ্ঠুর এক বাস্তবতা এবার থমকে দিয়েছে আলজারি জোসেফকেও। ঘরের মাঠ অ্যান্টিগাতে দ্বিতীয় টেস্টে মাঠে নেমেছিলেন সিরিজ জয়ের স্বপ্ন নিয়ে। এখন পর্যন্ত যা অবস্থা, তাতে সিরিজ জয়টা উইন্ডিজের জন্য খুবই সম্ভব সমীকরণ। হয়তো সিরিজটা জিতেই মায়ের কাছে ছুটে যেতেন জোসেফ।

মা শ্যারন বেশ অনেকদিন ধরেই অসুস্থ। ছেলের সাফল্যে হয়তো অসুস্থ মা কিছুক্ষণের জন্য হলেও শারীরিক কষ্টটা ভুলে যেতেন। সেই সুযোগ আর হয়নি শ্যারনের, মায়ের কাছে ছুটে যাবার সুযোগটাও পাননি জোসেফ। ছেলেকে খেলার মাঝে রেখেই মা চলে গেছেন না ফেরার দেশে।

চাইলে মায়ের কাছে ছুটে যেতে পারতেন ২২ বছরের তরুণ। কেঁদে কেঁদেই হয়তো দিনটা কেটে যেতো। অসুস্থ মায়ের পাশে থাকতে এর আগে একবার সফরের মাঝপথ থেকে ফিরে এসেছিলেন অ্যান্টিগায়। এবার চাইলে টেস্ট ছেড়েই চলে যেতে পারতেন।

কিন্তু আলজারি জোসেফ নিজের কর্তব্য ভোলেননি। তৃতীয় দিনে যখন ব্যাট হাতে নেমেছেন, দর্শক সারির সবাই দাঁড়িয়ে সম্মান জানিয়েছেন তাঁকে। মায়ের মৃত্যুতে বাকি খেলোয়াড়দের শোক পালন দেখেছেন।

বোলিং করেছেন। না, বলা উচিৎ মনে রাখার মত বোলিং করেছেন। প্রথম ইনিংসের মত দ্বিতীয় ইনিংসেও পেয়েছেন দুই উইকেট। ম্যাচ শেষ করেই ছুটে গেছেন মায়ের কাছে। সিরিজটা জিতেই গেছেন! মায়ের জন্য এটাই হয়ে রইলো তাঁর ‘ফেয়ারওয়েল গিফট’!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।