আলতা দীঘি: বাংলাদেশের লুকানো আভিজাত্য!

আমাদের দেশের মধ্যে কোথাও যে এমন প্রাচীন আমলের লুকায়িত ধন-সম্পদের মত প্রাকৃতিক আভিজাত্যও লুকিয়ে থাকতে পারে এটা কখনো ভাবিনি। সেটাও কোথায়? যেখানে বছরে অন্তত একবার হলেও আমার যাওয়া হয়, সেই জেলার মধ্যে নওগাঁতেই! কি অদ্ভুত? আর সেই আভিজাত্যের খোঁজ কিনা আমি পেলাম একটি ট্র্যাভেল গ্রুপে! এতো এতোদিন পরে?

অবশ্য সেটাই স্বাভাবিক, লুকানো আভিজাত্য বলে কথা, প্রাচীন আমলের লুকানো ধন-সম্পদ কি আর চাইলেই সবার চোখে পরত? এমনকি ঘরের পাশে থাকলেও যেমন তেমন কারো চোখে পরতোনা, ঠিক এই আলতাদীঘির লুকানো আভিজাত্যও তেমনি। নিজের নিয়মিত যাতায়াত আছে এমন একটি যায়গায় অথচ আমি দারুণ ভ্রমণপ্রিয় হওয়া সত্ত্বেও এটি আমার অগোচরে রয়ে গেছে এতোদিন।

নিজের বেশ পরিচিত যায়গায়, সাধ্যের মধ্যে আর ভীষণ সাশ্রয়ী এই আভিজাত্যের রূপ দেখার জন্য মাথার মধ্যে একটা আলাদা আকর্ষণ অনুভব করছিলাম এটা দেখার পর থেকে, যে কারনে ছোট্ট একটা পরিকল্পনা করে রেখেছিলাম, যে এরপর নওগাঁ গেলে লুকানো আভিজাত্যের এই ‘আলতা দীঘি’ অবশ্যই দেখতে যেতে হবে কোন একদিন সকাল সকাল।

তো এবার ঈদের অনেক লম্বা কিন্তু এবড়ো থেবড়ো ছুটি, নিজের দারুণ অসুস্থতা, ঈদের পরের অফিসের ছুটি বাতিল সব মিলিয়ে আমার নিজের সকল ভ্রমণ পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার পরে ঠিক করলাম। ঈদের ছুটিতে যেহেতু তেমন বিশেষ কোন যায়গায় যাওয়া হলনা, একটু সুস্থ হলে, দেশের আনাচে-কানাচে কিছু কিছু যায়গায় না হয় যাওয়া যাবে। আর এরমধ্যে আলতা দীঘিকে রেখেছিলাম অন্যতম প্রধান দর্শনীয় স্থান হিসেবে।

তো নওগাঁ যাবার পরে একটু সুস্থ আর আরাম বোধ করতেই পরদিন আলতা দীঘি যাবার পরিকল্পনা করে ফেললাম। নওগাঁ থেকে আলতা দীঘির দুরত্ত ৬১ কিলোমিটার। তো এক সকালে নাস্তা করে বেরিয়ে পরলাম। সেদিন ঈদের পরদিন হওয়ায়, বাসের সংখ্যা একটু কম ছিল আর এক বন্ধু জানালো আলতাদীঘি যেহেতু যাবে সাথে প্রাচীন আর এক দীঘি ‘দিবর দীঘিও’ দেখে এসো। বন্ধুর পরামর্শমত একদিনে দুই দীঘি দেখতে বেড়িয়ে পরলাম। নওগাঁ থেকে বাসে যেতে হবে ধামুরহাট।

অথবা জয়পুর হাটের বাসে ধামুরহাট থেকে একটু সামনে গিয়ে নামতে হবে কালুপাড়া সীমান্ত ফাঁড়ির কাছে নামতে হবে। এরপর অটো রিক্সায় তিন থেকে চার কিলোমিটার ভিতরে গ্রাম, অরণ্য, সবুজ ধানক্ষেতের ভিতর দিয়ে গেলেই পেয়ে যাবেন কাঙ্ক্ষিত আর লুকানো এক আভিজাত্যের দেখা ‘আলতা দীঘি’।

সকালে বাসা থেকে বেরিয়ে আলতা দীঘির উদ্দেশ্যে বাস খুঁজতে গিয়ে পেলামনা ঈদের পরদিন অন্যান্য দিনের মত বাসের পর্যাপ্ততা না থাকায়। কিন্তু সময় নষ্ট করার পক্ষে আমি মোটেই নেই। যে কারনে দিনের শেষের দিবর দীঘির দিকে আগে রওনা হলাম। নওগাঁ থেকে ৫৫ কিলোমিটার দূরে সাপাহার উপজেলার এক প্রাচীন দীঘির খোঁজে। সেই গল্প পরে আলাদা করে বলবো।

দুপুর নাগাদ দিবর দীঘি পর্ব শেষ করে আবার বাসে উঠে পরলাম সাপাহার থেকে। গন্ত্যব্য এবার মুল আকর্ষণ আলতাদীঘি। বাসে করে ২০ কিলোমিটার দূরের নজিপুর এসে আবার বাস বদলে জয়পুরহাটের বাসে উঠে বসলাম। দুইবাস মিলিয়ে সময় নিল একঘণ্টা পনের মিনিট। কালুপাড়া সীমান্ত ফাঁড়ির মোড়ে নামিয়ে দিল। সেখান থেকে অটো রিক্সায় চেপে বসলাম। ভাঙাচোড়া, এবড়ো থেবড়ো রাস্তার ঝাঁকুনি ভুলিয়ে দিয়েছি দুই পাশের সবুজ প্রকৃতি আর মিহি বাতাস।

পথ চলতে শুরু করতেই পথের দুইপাশের সবুজ ধান ক্ষেতের আমন্ত্রণে মুগ্ধ হওয়া। দুই পাশের যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। সবুজ প্রান্তরের সাথে মিলেমিশে আছে ঝকঝকে নীল আকাশের আকর্ষণ, নীল আকাশের কোথাও কোথাও সাদা মেঘেদের আপন মনে উড়ে চলা, পথ চলতে রাস্তার দুপাশে গাছ আর ঘাসের ছুঁয়ে যাওয়া আর মাঝে মাঝে ভাঙা পথের ঝাঁকুনি খেতে খেতেই ভীষণ অবাক করে দিয়ে চোখে পড়লো ঘন অরণ্যে আবৃত, বড় বড় গাছের সমারোহ, একের পর এক বাঁশ ঝাড়ের অন্ধকারে আচ্ছাদিত এক অভয়ারন্য যেন! বিস্মিত হয়ে সেদিকে তাকিয়ে ছিলাম, যেন অজানা কোন গহীন বনের মধ্যে ঢুঁকে পরেছি ভুল করে।

এমন নিখাদ অরণ্যের মাঝে যেতে যেতেই কিছুদূর পর চোখে পরলো আলতা দীঘি অভয়ারণ্যের সরকারী সাইনবোর্ড। তার মানে প্রতীক্ষিত আলতাদীঘিতে প্রবেশ করেছি। ভাবতেই দারুণ আনন্দ বোধ হতে লাগলো আর সাথে কিছু অস্থিরতা। অনেক অপেক্ষার কিছু যখন সামনে এসে যাই যাই করে আমার সব সময়ই কেমন যেন একটা অস্থির অনুভূতি হয়। এবারও তার ব্যাতিক্রম হলনা।

এমন নিখাদ অরণ্য, ঘন অন্ধকার, চারপাশের মিহি সবুজ আর নীরব নির্জন গ্রামের পথ পেরিয়ে একটা যায়গায় অটো রিক্সা আমাকে নামিয়ে দিল। তিনি অন্যপথে যাবেন বলে। আমাকে দেখিয়ে দিল যে পথে নেমেছি সেই পথ ধরে সামনে এগোলেই ৩-৫ মিনিটের মধ্যে পেয়ে যাবো আলতাদীঘি।

বেশ ভালো ভাড়া মিটিয়ে চলেছি আলতা দীঘির পথে। দুই থেকে তিন মিনিট হেটে সামনে এগিয়ে, একটি বাঁক নিয়ে অন্য বাঁকে পৌছাতেই কেমন যেন লোকে লোকারণ্য দেখে কৌতূহল তৈরি হল, পৌঁছে গেছি নাকি? আমার বামে গভীর অরণ্য আর ডানে গাছ গাছালি আর ক্ষেতের মাঝের আইলের ওপারে বাঁশ গাছের ফাঁক ফোঁকর দিয়ে টলটলে জলে শেষ দুপুরের সূর্যের আলোর ঝলকানি এসে লাগলো চোখে। কি ওখানে? একটু ভালো করে তাকাতেই দেখি টলটলে জলের মাঝে বড় বড় সবুজ পাতায় পাতায় আচ্ছাদিত, যার মাঝে মাঝে হেলে দুলে দাড়িয়ে আছে সাদা, গোলাপি পদ্মের দল! আহা, তার মানে এসে পড়েছি, সেই লুকানো আভিত্যের কাছে, অপেক্ষার আলতা দীঘির পাড়ে!

ঝটপট রাস্তা ছেড়ে বনের দিয়ে, ক্ষেতের আইল দিয়ে আলতা দীঘির পাড়ে চলে এলাম। সচারাচার আমার মুখ দিয়ে যে শব্দ বের হয়না, সেটাই বেরিয়ে এলো তাকে প্রথম দর্শনে ‘ওয়াও’। একি দেখছি? এতো বিশাল, এতো বিশাল আর এতো বিশাল যে দীঘির একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত ঠিক মত দেখাই যায়না! দেখা যাবে কি করে এক কিলোমিটারের চেয়েও দীর্ঘ এই দীঘির বিস্তার।

একটু ছায়া দেখে আগে বসলাম কিছুক্ষণ ভাঙা রাস্তার ঝাঁকুনির ক্লান্তি দূর করে নেই। আর মনে মনে নিজেকে বাহবা দিলাম এখানে আগে এসে তাড়াতাড়ি করে দেখে শেষে আবার দিবর দীঘি যেতে হচ্ছেনা বলে। দিনের বাকিটা সময় ধীরে ধীরে লুকানো আভিজাত্যের এই অপরূপ রূপের স্বাদ আস্বাদন করা যাবে বলে। এক ঠোঙা বাদাম কিনলাম বসে বসে খেতে খেতে। দীঘির আর একটু পাড়ে গিয়ে বসলাম বাদামের ঠোঙা নিয়ে।

ভাগ্যিস দীঘির আর একটু কাছে গিয়েছিলাম বলে, নইলে এমন অপার্থিব রূপের দর্শন কি পেতাম? মোটেই না। কাছে গিয়ে বসতেই দেখি বড় বড় পদ্ম পাতার উপরে বড় সাইজের মুক্ত দানার মত টলটল করছে জলের ফোঁটা। হাঁসেদের জলকেলি করে যাবার সময় কিছু কিছু জলের ফোঁটা সবুজ পদ্ম পাতার উপরে উঠে গেছে, যা সূর্যের আলোর ঝিলিকে ঝলমল করছে। একটি দুটি পাতায় নয়, শতশত পদ্ম পাতার উপরে এমন জলের ঝিলিক পুরো দীঘিকেই কেন এক মুক্তর আঁধার বানিয়ে ফেলেছে! আর সেই পদ্ম পাতা, জলের মত মুক্তোর ঝিলকের মাঝে মাঝে সমহিমায় নিজের আভিজাত্যের জানান দিচ্ছিল সাদা, গোলাপি পদ্মফুলেরা।

কতক্ষণ ঠায় বসে ছিলাম জানিনা। তবে দীঘির ওপর পাশের শাল বনের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলোর ঝলকানি চোখে পরতেই উঠে পরেছিলাম। আর তক্ষুনি মনে পড়লো আরে আমি তো এক ঠোঙা বাদাম কিনেছিলাম, সেটা খাওয়া শুরু করতেই ভুলে গেছি যে! রোদ থেকে উঠে পরে এবার দীঘির পাড় দিয়ে ধীর ধীরে হেটে যেতে শুরু করলাম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত।

দীঘির পাড়ে কিছু দোকান খুবই দৃষ্টি কটুভাবে গজিয়ে উঠেছে। সেই ক্ষোভ আপাতত থাক। এখানে শুধু আভিজাত্যের আনন্দটুকুই থাক। নানা রকম গাছে আচ্ছাদিত দীঘির পাড় দিয়ে হেটে হেটে অনেক সময় নিয়ে অন্যপাশে চলে গেলাম। দীর্ঘ দীঘির প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত যেতেই আর এক মুগ্ধতা, ‘ওপারে তে বন্ধুর বাড়ি!’ মানে দীঘির যেখানে শেষ, ঠিক সেই পাড় থেকেই ভারতের সীমানা শুরু! আহা পাসপোর্ট সাথেই ছিল ভিসাসহ শুধু মানুষ যাওয়া আসার ব্যবস্থা থাকলেই একটু ঢুঁ মেরে আসতাম হয়তো। সেটা আর হলনা আর কেউ জানাতেও পারলোনা ওপারে ভারতের কোন যায়গা, নাম কি? যদিও সেখানে ২৪ ঘণ্টার বিজিবি মোতায়ন করা আছে।

দীঘির অন্য পাড়ে চলে গেলাম বন্ধুর বাড়ির সীমানা ধরে। যে পাড়ের মুগ্ধতা আরও অনেক অনেক বেশী। পদ্মগুলো যেন এপারেই বেশী আকর্ষণীয়, বেশী মাধুর্য ছড়ানো আর অনেক বেশী আভিজত্যের সম্মোহনী সৌন্দর্য নিয়ে জলে ভেসে আছে। একদম দীঘির পাড় ঘেঁসে পদ্ম ফুলের শুরু যা আছে দীঘির যতদূর চোখে যায়। এপারে আছে শাল গাছের অরণ্য, পাড় জুড়ে ছায়া ঘেরা পথ, বসার জন্য গাছের গুড়ি, আর ইট পাথরের বেদীও। আছে ঘাঁটে বাঁধা ছোট ডিঙি নৌকা। নির্ধারিত অর্থের বিনিময়ে ঘুরে আসা যায় টলটলে দীঘির, ঢেউহীন জলে, ছুঁয়ে দেখা যায়, শিহরিত হওয়া যায় সাদা-গোলাপি পদ্মের কোমল শরীর। হাত দিয়ে সরিয়ে দেয়া যায় পদ্ম পাতায় জমে থাকা মুক্তো দানার মত জলের বিন্দু।

এভাবে কখনো বসে, কখনো হেটে, কখনো ডিঙি নৌকায় ভেসে ভেসে কখন যে বিকেল গড়িয়ে গেছে বুঝতেই পারিনি। সূর্য যখন দূর গগনে অস্তমিত তখন ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও বাধ্য হয়ে ফেরার পথ ধরতে হয়েছিল কেন পুরো একটি দিন এখানে কাটাতে পারলামনা সেই আক্ষেপ সাথে করে। তবে মনে মনে ঠিক করেছি এরপর নওগাঁ গেলে পুরো একটি দিন কাটাবো এই লুকানো আভিজাত্যের আলতাদীঘির পাড়ে, গাছের ছায়ায়, জলের খেয়ায়।

এই এমনই এক আভিজাত্য যাকে দেখে, উপভোগ করে তৃপ্ত হবার নয়। এখানে বার বার যেতে হয়, ইচ্ছে করে সাধ জাগে। এখানে আভিজাত্য এমনই আকর্ষণের, সম্মোহনের আর আকুলতার।

সত্যি-ই আলতাদীঘি বাংলাদেশের এক লুকানো আভিজাত্য!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।