বড় ক্রিকেটার হতে পারতেন তিনি!

পাকিস্তানের পেশোয়ার, সময়টা ২০০৩ সালের আগস্ট মাস। টেস্ট খেলা হচ্ছে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সঙ্গে। বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ৩৬১ রান করেছে। সে সময়ের হিসেবে বেশ ভাল স্কোর। জবাবে পাকিস্তানের ইনিংস রফিকের বোলিং তোপে পড়ে পথ হারানোর পথে। ঠিক তখন শেষ বিকেলে হাজির হলো এক তরুণ, সদ্য কৈশোর পোর এক বোলার; যে লেগ স্পিন করে। ওভারের পঞ্চম বলে সে শাব্বিরকে আউট করলো, ষষ্ঠ বলে দানিশ কানেরিয়া।

হ্যাটট্রিক বল হবে পরেরটি, ওভার শেষ হওয়ায় সে ওভারে আর হলো না। এক ওভার বাদে ছেলেটি আবার বল করতে এল, তার হাতে বল তুলে দিলেন তখনকার ক্যাপ্টেন খালেদ মাহমুদ সুজন। পাকিস্তানের হাতে এক উইকেট, বাংলাদেশ তখনো লিডে। কি অবাক কাণ্ড, ছেলেটির লেগ স্পিনে লেগ বিফোর উইকেট হয়ে গেলেন উমর গুল। বাংলাদেশ তাঁদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ইতিহাসে পেয়ে গেল প্রথম হ্যাটট্রিক, ছেলেটির নাম? তার নাম অলক কাপালি।
আমরা তখনো টেস্ট ক্রিকেটের বিশাল সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছি, ওয়ানডেতেও অনিয়মিত জয় পাচ্ছি; এমন দুর্গম সময়ে আমাদের কেউ হ্যাটট্রিক করতে পারে তা ছিল ভাবনার অতীত। সে কাজটিই করে দেখিয়েছে এক লেগ স্পিনার, যে লেগ স্পিনার নিয়ে আমাদের হাহাকার চিরন্তন। আমার দেখা বাংলাদেশের অন্যতম স্টাইলিশ ব্যাটসম্যানের নাম অলক কাপালি।

স্মৃতির পাতা হাতড়ে টেস্ট স্ট্যাটাস প্রাপ্তির পরের কয়েক বছরের খেলাগুলোর কথা মনে করুন তো। আমাদের ব্যাটিং ছিল তাসের ঘর, আশরাফুলের ক্ষণিকের চমকের পর দলের হাল ধরতে হতো খালেদ মাসুদ পাইলট ও অলক কাপালিকে। কি করে যেন তারা একটি, দুটি করে রান করতেন; দলও সম্মানজনক পরাজয়ের কাছে যেত। জয় আমরা তখনো পেতে শিখিনি, জিম্বাবুয়েই ছিল আমাদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী। তবে আমাদের কয়েকজন ভয়ডরহীন ক্রিকেটার ছিলেন। তারা হলেন আশরাফুল, আফতাব, মাশরাফি আর অলক কাপালি।

২০০৮ সালের এশিয়া কাপের কথা মনে পড়ে? পাকিস্তানে হওয়া সে এশিয়া কাপে ভারতের সাথে একটি ম্যাচ ছিল বাংলাদেশের। সে ম্যাচে বাংলাদেশ শুরুতে ব্যাট করে ২৮৩ রান তুলেছিল। ছয় নম্বরে ব্যাট করে ৯৬ বলে ১১৫ রান করেছিলেন অলক কাপালি, ছিল ৫টি ছয় ও ১০টি চারের মার। ভারতের সাথে সেটিই ছিল আমাদের প্রথম শতক। যাত্রাটা শুরু করেছিলেন অলকই।

অলকের ক্যারিয়ারের একটি বিশেষ অধ্যায় ছিল ভারতের বিদ্রোহী ক্রিকেট টুর্নামেন্ট ইন্ডিয়ান ক্রিকেট লিগ (আইসিএল)। ঢাকা ওয়ারিওর নামে একটি দল করে দেশের শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটাররা সে আসরে নাম লিখিয়েছিলেন। অলক কাপালি টুর্নামেন্টের প্রথম শতরান উপহার দেন মাত্র ৬০ বলে, হয়ে যান টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্কোরার। তাকে ১০ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে বিসিবি, পরবর্তীতে তিনি সেটি ছেড়ে দিলে বিসিবি তাকে আবার বিবেচনা করে জাতীয় দলের জন্য। তবে পুরনো কাপালিকে আর পাওয়া যায়নি।

বেলা অনেক গড়িয়েছে, মারকুটে কাপালী জাতীয় দলের জায়গা হারালেও ঘরোয়া ক্রিকেটে রান করে যাচ্ছেন। লঙ্গার ভার্সনে লোকাল ক্রিকেটে নির্ভরতার প্রতীক এই অলক কাপালী। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে তার রয়েছে সাড়ে আট হাজারের মতো রান, ২০ টির মতো সেঞ্চুরি, একাধিক ডাবল সেঞ্চুরি। সেই কাপালি মাসের পর মাস, বছরের পর বছর উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছেন, জাতীয় দল তো বটেই এ দলেও তার ঠাঁই হয় না।

আচ্ছা বলুন তো ত্রিশ পার হলেই কি মানুষ বুড়ো হয়ে যায়? মিসবাহ উল হক, শহীদ আফ্রিদি, অজিত অগরকার, ম্যাথু হেইডেনরা তো তাহলে অনেক আগেই অতীত হয়ে যেতেন। হিসেবটা শুধু বাংলাদেশেই খাটে। আকরাম খান, আমিনুল ইসলাম, মিনহাজুল আবেদীন, আতহার আলী, হাবিবুল বাশার – কার ভাগ্যে বিদায়ী ম্যাচ খেলে ক্রিকেটকে বিদায় জানানোর সুযোগ হয়েছিল?

অলক কাপালি এখনো খেলছেন, যতোদিন ভাল লাগবে, ফিটনেস থাকবে তিনি খেলবেন। খেলাটিকে ভালোবাসেন বলে আজো তিনি খেলছেন, হয়তো তাকে কখনো জাতীয় দলে দেখা যাবেনা; তবে অলক কাপালীর অবদান কখনো মুছতে পারবেনা তারা যারা তাকে অবহেলা করে চলছে প্রতিনিয়ত।

যতোদিন বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাস ঘাঁটা হবে, ততোদিন অলকের নাম উঠে আসবে দেশের হয়ে প্রথম হ্যাটট্রিক, ভারতের সাথে প্রথম শতরানের জন্য। আজকের সাব্বির, সৌম্যদের ভয়ডরহীন ক্রিকেটের যাত্রা শুরু হয়েছিল আমাদের ট্রিপল ‘এ’র জন্য। আশরাফুল, আফতাব ও অলক তাই চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন ক্রিকেট ইতিহাসে। আফতাব ফিটনেস হারিয়ে চুপ হয়ে গেলেও আশরাফুল, অলক শত প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ক্রিকেটের ভালোবাসায় মাঠে আছেন; রান করছেন, ঘাম ঝরাচ্ছেন; বিসিবি তাদের মনে রাখুক বা না রাখুক ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে তাদের জায়গা চিরস্থায়ী।

নতুন ক্রিকেটার আসছে, আসবে; একজন অলক কাপালির বিকল্প আজো খুঁজে পায়নি বাংলাদেশ। কবে ঘুচবে একজন লেগ স্পিনার কাম ব্যাটসম্যানের অভাব, অলক কাপালীর প্রতি অবিচারের অভিশাপ নয় তো?

কিংবদন্তিদের সাথে এশিয়া একাদশে

ভাল থাকুন অলক কাপালি, খেলে যান যতোদিন সম্ভব, সমৃদ্ধ করুন নিজের ক্যারিয়ার; করতে থাকুন একের পর এক ডাবল সেঞ্চুরি। এদেশ অন্য অনেক খাতের মতো ক্রিকেটেও প্রতিভার যোগ্য সম্মান দিতে পারেনা। আপনিও হয়তো তেমন এক দুর্ভাগা হিসেবে নিজেকে ধরে নেবেন। এভাবেই চলবে ক্রিকেট, প্রতিভারা সুযোগের অভাবে হয়তো হারিয়ে যাবে হয়তো না।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।