একটি আলমাস সিনেমা এবং কিছু হাহাকার

চট্টগ্রাম শহরের মোট সিনেমা হল সংখ্যা হল পাঁচটি। সিলভার স্কিন, আলমাস সিনেমা, পূরবী সিনেমা, সিনেমা প্যালেস, দিনার সিনেমা। এর মধ্যে সিনেমা প্যালেস, দিনার, পূরবী এই সিনেমা হল গুলোতে সিনেমা দেখার পরিবেশ নেই বললেই চলে।

তাই এই হল গুলোর কথা আপাতত বাদ দিলাম। তাহলে পাঁচটির মধ্যে বাকি রইল মাত্র দুটো হল এর মধ্যে সিলভার স্ক্রিন হয়েছে খুব বেশি দিন হয়নি, এই সিনেপ্লেক্সের আসন সংখ্যাও খুবই সীমিত মাত্র ৭০ টি। তাই কর্তৃপক্ষও টিকিটের দাম রেখেছে চড়া ৪০০- ৫০০ টাকা যা সাধারণ ছাত্রদের জন্যই কেবল নয়, বরং সবার জন্য অনেক বেশি হয়।

শুনেছি এই সিনেপ্লেক্সে বর্তমানে দর্শক সমাগম বেশ ভালই হচ্ছে। এই সংবাদটা অবশ্য আমাকে অনেক আনন্দ দেয়। কিন্তু আমার মত দর্শকের জন্য এই সিনেপ্লেক্স সিনেমা দেখা সম্ভব না। আমাদের জন্য তাই বাকি রইলো একটি সিনেমা হল – আলমাস সিনেমা।

এবার আসি এই বিখ্যাত সিনেমা হলের পরিবেশ, সিনেমা পরিবেশনার কথায়।

হলে ঢোকার পর প্রথমে আপনাকে অনেকক্ষণ একটি ভাল সিটের জন্য হাই পাওয়ারের টর্চ লাইট নিয়ে অনুসন্ধান চালাতে হবে। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর ভাগ্যক্রমে হয়ত একটি ভাল সিট আপনি পেয়ে যাবেন। আর যদি না পান তাহলে সামনে আপনার জন্য চরম ভোগান্তির দীর্ঘ একটি জার্নি অপেক্ষা করছে।

সিটে বসার পর আপনার মনে হবে এর চেয়ে দাড়িয়ে থাকলে বোধহয় আপনার জন্য ভাল ছিল। সিনেমা শুরু হলে অবশ্যই আপনার নিজের চোখ গুলোর প্রতি মায়া হবে।কারণ পর্দার আলো কম হওয়ার কারণে আপনি নিজেই বলতে বাধ্য হবেন, ‘কি দরকার ছিল নিজের চোখ গুলোকে এত কষ্ট দিয়ে অন্ধ হওয়ার!’

এই অত্যাচার যতক্ষন পর্যন্ত সিনেমা দেখবেন চলতে থাকবে। সিনেমা দেখা তো শুরু করলেন কিন্তু আপনার অজান্তে শার্ট ভিজে একাকার হয়ে যাবে হলে লাগানো ইয়ার কন্ডিশনার আ মিন ফ্যান গুলোর নাজেহাল অবস্থার কারণে। বেচারা ফ্যান গুলোর দিকে তাকালেই মায়া হয় কতই না কষ্ট করে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।

এই যখন অবস্থা সিনেমায় কি হচ্ছে সে দিকে মনযোগ দেয়ার সুযোগ আপনি কই পাবেন? তার উপর বোনাস স্বরুপ আপনার জন্য থাকবে মাঝেমধ্যে ছারপোকার কামড়। ভাবছেন এত কিছুর পর কিভাবে সিনেমা দেখেছি? শুধু একবার নয় এই পর্যন্ত অনেকবার এই হলে সিনেমা দেখেছি এক প্রকার বাধ্য হয়েছি।

জেনে আরো অবাক হবেন কোন ভাল সিনেমা এই হলে আসলে অনেক দিন হাউসফুল যায়। ভাবছেন কিভাবে সম্ভব? হলের সর্বোচ্চ মানের সারির এই অবস্থা হওয়া সত্ত্বেও ১৪০ টাকা দাম দিয়ে সিনেমা দেখতে যাই শুধু মাত্র বাংলা সিনেমাকে ভালবাসি বলে।

এত কিছু বলার এক মাত্র কারণ হলে আমরা যারা আলমাসে সিনেমা দেখি তারা সবাই হলের এই অবস্থা নিয়ে আপসোস করি। তাহলে শুনুন যেখানে হল কর্তৃপক্ষ এত পুরনো একটা হলের কোন সংস্কার ব্যতিত টানা হাউসফুল শো এর সাথে দর্শকের উপচে পড়া ভীড় পাচ্ছে, সেখানে কেন তারা শুধু শুধু টাকা খরচ আর কষ্ট করে হল সংস্কার করতে যাবে?

হ্যাঁ, তাঁরা চাইলেই হল সংস্কার করতে পারে। কিন্তু তাঁরা তা করবে না কারণ দর্শক তাদের কাছে জিম্মি। দর্শকের কাছে আর কোন পথ নেই তাদের হলে যাওয়া ছাড়া। কারণ বছরে যা ভাল ছবি হয় সেগুলো এই হল ছাড়া বাকি যে হল গুলোর কথা বলা হয়েছে সেগুলোতে আসে না।

এই রকম পরিস্থিতির সুবিধা হয়ত আপনিও নিবেন যদি না আপনি উদার, মানবিক হন এক্ষেত্রে তারা দর্শকের প্রতি উদার, মানবিক কোনটিই নন বরং সুবিধা ভোগী। তাহলে প্রশ্ন হতে পারে দোষটা আসলে কার দর্শকের নাকি হল কর্তৃপক্ষের বা সমস্যাটা আসলে কোথায়?

আগেও বলেছি দর্শক এক্ষেত্রে নিরুপায় তাহলে দোষটা কি হল কর্তৃপক্ষের? হ্যাঁ, তাঁরা অনেক ক্ষেত্রে দায়ী কিন্তু সম্পূর্ণ দোষটা তাদের উপর দেয়া যায় না কারণ যদি পর্যাপ্ত হল থাকত বা অন্যান্য হল গুলোতে সিনেমা দেখার পরিবেশ থাকত তাহলে কি দর্শক তাদের কাছে যেতে বাধ্য হত বা তারা এই রকম করতে পারত?

উওরটা হল ‘না’। এখন এত কিছু বলার পর যে মূল পয়েন্টটা দাঁড়াল সেটা হল চট্টগ্রামের মত এত বড় একটা শহরে হলের এই অবস্থার কারণ হল আমাদের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি সহ পুরো দেশে হল নিয়ন্ত্রণকারী সমিতির পুরো সিস্টেমে সমস্যা।

এখন চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির সমস্যা বা হল নিয়ন্ত্রণকারী সমিতির সমস্যা নিয়ে কথা বলতে গেলে হাজারটা কথা বলা যাবে বা বলেও শেষ করা যাবে না। অদূর ভবিষ্যৎ এ এসব সমস্যার কখনো সমাধান হবে কিনা জানা নেই। কিন্তু দিন শেষে এই অবুঝ মন তো একটু সান্তনা পেতে চায়, যে সব ঠিক হয়ে যাবে আগের মত!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।