লখনৌ থেকে ঢাকা: দেড়শ বছরের পুরনো আলাউদ্দিন সুইটমিট

তখন প্রাচীন ভারতবর্ষ। ব্রিটিশ শাসন আমল চলে। সময়টা আজ থেকে প্রায় ১৫০ বছরেরও বেশি সময় আগের। কাগজে কলমে তখন ১৮৬৪ সাল। লখনৌ থেকে ঢাকায় এসেছিলেন আলাউদ্দিন হালুয়াই। তিনি দোকান দিয়েছিলেন ঢাকার চকবাজারে। নিমকি, সমুচা ও লখনৌ শিরমাল তখন কেবল তাঁর দোকানেই পাওয়া যেত।

দেখতে দেখতে দোকানটা ঢাকার জীবনের অবিচ্ছেদ্দ এক অংশে পরিনত হয়। কালক্রমে সেই আলাউদ্দিন হালুয়াইয়ের মিষ্টির দোকানই এখন আলাউদ্দিন সুইটমিট নামে পরিচিত। লখনৌ থেকে আসা আলাউদ্দিন না থাকলেও দিব্যি টিকে আছে আলাউদ্দিন সুইটমিট।

পুরান ঢাকার ব্যবসায়ের প্রাণকেন্দ্র বলা হয় চকবাজারকে। সেখানে গেলেই শাহী মসজিদের পাশে চোখে পড়বে আলাউদ্দিন সুইটমিটের মূল শাখাটি। এটা সেই ১৮৯৪ সাল থেকে টিকে আছে। পুরান ঢাকার স্থানীয়দের তো বটেই, নতুন ঢাকার মানুষদের জন্য আলাউদ্দিনের মিষ্টি একটা বিশ্বাসযোগ্য ও ভরসার ব্র্যান্ড।

একটা সময় ছিল যখন পুরান ঢাকার বিয়ে, জন্মদিন ও অন্যান্য যেকোন সামাজিক অনুষ্ঠানে আলাউদ্দিন সুইটমিট ছিল আভিজাত্যেপর প্রতীক। তখন আলাউদ্দিনের বাজারও ছিল একচেটিয়া। আলাউদ্দিনের মিষ্টি ছাড়া তখন যেকোনো শুভ কাজই যেন অসম্পূর্ণ রয়ে যেত।

রসগোল্লা, গোলাপ বরফি, পান বরফি, কাজু বরফি, গুলাব জাবন, লালমোহন, মতিচুর লাড্ডু, রসকদম, বড় চমচম, হাফসি হালুয়া, দই, কালোজাম, মালাইকারি, দুদিয়া সন্দেশ, কাঁচা সন্দেশ, রসমালাই, জিলাপিসহ ইত্যাদি অনেক ধরনের মিষ্টি তৈরি করে থাকে। এখানকার সব মিষ্টিই বেশ সুস্বাদু। এখন পর্যন্ত মানের খুব বেশি পতন হয়নি।

আলাউদ্দিনের নেশেস্তার হালুয়া বেশ বিখ্যাত। একে মাসকাট হালুয়াও বলা হয়ে থাকে। এখনো দেশের নানা প্রান্ত থেকে এই মিষ্টির জন্য আলাউদ্দিনে ছুটে যান ভোজনবিলাসিরা।

আলাউদ্দিন ব্রিটিশ আমলেই মারা যান। তার মৃত্যুর পর ছেলে আফসারউদ্দিন ব্যবসার হাল ধরেন। আফসারউদ্দিন মারা গেলে তাঁর সন্তানরা এ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। আফসারউদ্দীনের চার ছেলের মধ্যে বর্তমানে জীবিত আছে দুজন। এখন ব্যবসা পরিচালনা করছেন হাজী মাহবুবউদ্দিন। মিষ্টির জগতে এই প্রতিষ্ঠানটিকে পথিকৃৎ বলা যায়।

শুধু দেশেই নয়, দেশের বাইরেও এর শাখা আছে। মোটা শাখার সংখ্যা ১৬ টি। কেবল পুরান ঢাকার চকবাজারেই এর দু’টি শাখা আছে। এর বাদে নারিন্দা, মগবাজার, ইসলামপুর ও মৌচাকসহ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে আলাউদ্দিনের মিষ্টির দোকান আছে। দেশের বাইরে আছে নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস ও লন্ডনের ব্রিকলেনে।

আজো নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও দাপটের সাথে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে আলাউদ্দিন সুইটমিট লিমিটেড। একবাক্যে বলা যায় যে, ঢাকার পুরনো মিষ্টির দোকানগুলোর মধ্যে, আলাউদ্দিনের চেয়ে বড় ব্র্র্যান্ড আর নেই।

১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ও আলাউদ্দিন সুইটমিটকে অনেক বিরুদ্ধ সময় কাটাতে হয়েছে। দোকান ভাঙচুর হয়েছে, লুটপাট হয়েছে। তবে, এত ঝড়-ঝাপটার মধ্যেও ঠিকই টিকেছিল এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।