আলমগীর নামের দোতলা বাস!

‘আলমগীর হইলো দোতলা বাস; তার পাশে নায়িকারে তো বাটুল লাগবেই’- উদ্ধৃতিটির জন্ম আনুমানিক ১৯৯১-৯২ সাল, যখন আমার বয়স ছয়েরও কম। উদ্ধৃতিকারী ব্যক্তি আমার মা; বিটিভিতে সিনেমা প্রচারিত হচ্ছিলো, শ্রেষ্ঠাংশে শাবানা-আলমগীর এবং আরো অনেকে। একটা গানের দৃশ্য শাবানা-আলমগীরের রসায়ন দেখে তিনি এই উদ্ধৃতি প্রদান করেছিলেন। সিনেমা দেখাকালে উদ্ধৃতি দেয়া বা মন্তব্য করা চিরায়ত দর্শক-বৈশিষ্ট্য; আমার মা কেবল সেই রীতিটিরই বৈচিত্র্যহীন অনুসরণ করেছিলেন মাত্র, কিন্তু সেই ভীষণ তুচ্ছ উদ্ধৃতিটি আমার শিশুমনকে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দেয়, টিভি স্ক্রিনে অকস্মাৎ আবিষ্কার করি আলমগীরের পেছন দিয়ে একটি বাস চলে যাচ্ছে, যেটার উচ্চতা আলমগীরের সমান, যদিও সিনেমার দৃশ্যে কোনো বাস ছিলোই না!

এখন ২০১৮ চলছে, কিন্তু বিগত ২৬-২৭ বছর ধরে যখনই নায়ক আলমগীরকে দেখি আমি তার পেছন দিয়ে বাস চলে যেতে দেখি। বয়স বাড়ার পর বিআরটিসির দোতলা বাসের সাথে পরিচয় ঘটেছে; ফলে সাধারণ বাসের জায়গায় বিআরটিসির দোতলা বাস এসেছে, কিন্তু আলমগীর আর বাস একে অপরের সমান্তরাল হয়ে বিগত ২৬ বছর ধরে আমার অবসেসনের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি একজন পারসোনালিটি ডিসঅর্ডারে ভোগা মেন্টালি রিটার্ডেড মানুষ; বাস্তবের চাইতে কল্পনাতেই বসবাস বেশি করি।

নামহীন বই লিখতে গিয়ে গুনে দেখলাম আমি সার্বক্ষণিক ২৬টি অবসেসন দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকি। সেখানে মাইকেল মধুসূদন দত্ত, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, টেন্ডুলকার, টেসলা, পীথাগোরাস, গ্যালিলিও, কাফকা, রূপা গাঙ্গুলী যেমন আছে তেমনি নিজের ব্যক্তিগত জীবনের পরিচিত সোহাগ ভাই, চমক ভাই, ফারহানা ব্রতী, লুবনা, ৩১৭৯, ওমর বহ্নি,পাপড়ি, সঞ্চিতা দে এর পাশাপাশি বীক্ষণ প্রান্ত বইয়ের ‘ষৎকো’ নামের পিঁপড়াটিও উপস্থিত।

তবু স্থায়িত্বের দিক থেকে নায়ক আলমগীরই প্রাচীনতম অবসেসন। কেন সে আর দোতলা বাস একাকার হয়ে গেল আজও উদ্ধার করতে পারিনি কারণ। ক্রিকেট, রেসলিং দেখাসূত্রে দৈত্যাকৃতির বহু মানুষ দেখেছি জীবনে, তবু তাদের যে কাউকে দেখামাত্র প্রথমেই মাথায় আসে সে কি আলমগীরের চাইতেও লম্বা?

অবসেসনের তীব্রতা বোঝার জন্য আরো একটা তথ্য শেয়ার করি। ২০১৭ তে ৭জন তরুণকে আমি একটা মেথডলজিকাল সার্ভে করতে দিয়েছিলাম। বাংলা সিনেমার সবচাইতে লম্বা নায়ক কে। ফেসবুক-রিয়েল লাইফ মিলিয়ে ৩৩০০ মানুষকে এই প্রশ্নটি করেছিলো তারা; ৭৯% এর বেশি মানুষ উত্তরে আলমগীরের নাম বলেছে, ২য় স্থানে ছিলো আরিফিন শুভ, এরপর পর্যায়ক্রমে মান্না, শাকিব খান, আমিন খান, ওমর সানি। তবে একজন মাত্র মানুষ কনফিডেন্টলি মাহমুদ কলির নাম উল্লেখ করেছিলো; সে নাকি এফডিসিতে আলমগীর-মাহমুদ কলিকে পাশাপাশি দেখেছে, এবং মাহমুদ কলি পরিষ্কার ব্যবধানে দেড়-দুই ইঞ্চি বেশি লম্বা ছিলো।

২০১৪-১৫-এর দিকে নাট্যকার নজরুল ইসলামের সাথে অন্যরকম গ্রুপের অফিসে আড্ডা মেরেছিলাম; সুচিত্রা ভট্টাচার্যের ‘কাছের মানুষ’ উপন্যাস নাট্যরূপ দিয়েছিলো সে, আলমগীর তাতে অভিনয় করেছিলো; তাকে যখন জিজ্ঞেস করি আলমগীর হাইট কতো, সে জানায় ৬ফুট ১ ইঞ্চি!

বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এটা অবশ্যই অনেক উচ্চতা, কিন্তু রেসলিংয়ে বিগশো, কেইন, আন্ডারটেকার, কিংবা ক্রিকেটে মোহাম্মদ ইরফান, জেসন হোল্ডার, ওয়ালশ, এমব্রোসকে এতো বেশি দেখা হয়েছে, ৬ফুট১ ইঞ্চিকে আহামরি কিছুই লাগার কথা নয়। এমনকি মডেল মনির খান শিমুল, অভিনেতা তারিক আনিম খান, ভিলেন শানু শিবা, কিংবা হাল আমলের আরিফিন শুভ- প্রত্যেকের উচ্চতা ৬ ফুট ১ এর বেশি; তবু সেই শৈশবের দোতলা বাস বিভ্রম থেকে আজও বের হতে পারিনি।

আমি কি আলমগীরের ফ্যান? কখনোই না। বাংলা সিনেমার প্রতিই চরম বিতৃষ্ণা এবং বিরক্তি কাজ করে। এমনকি রাজ্জাক, রহমানের আমল, যেটাকে বলা হয় বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগ, তখনকার সিনেমার প্রতিও আগ্রহ নেই বিন্দুমাত্র। এর প্রধান এবং একমাত্র কারণ, প্রেডিক্টেবল, দুর্বল স্টোরিলাইন এবং নিম্নমানের আর্ট ডিরেকশন। উপন্যাস অবলম্বনে যেসব সিনেমা নির্মিত হয়েছে, এর বাইরে মৌলিক গল্পের সিনেমা এযাবৎকালে কয়টা নির্মাণ করা হয়েছে? একটা মুখস্থ ফরম্যাট আছে; যুগানুক্রমে সেই ফরম্যাটের অন্ধ অনুসরণ চলছে। অনেকে বলবেন মেকিং, অ্যাক্টিং, সিনেমাটোগ্রাফি, সংলাপ এসবের কারণে সিনেমা চলে, কিন্তু একটু ধীরস্থির হয়ে নিজেকে প্রশ্ন করলেই দেখবেন, আপনার যেসব সিনেমা ভালো লাগে তার প্রধান কারণ স্টোরিলাইন, অন্য সবকিছু সেকেন্ডারি অপশন। হুমায়ূন আহমেদ মোটেও কোনো মানসম্মত ডিরেক্টর ছিলেন না, কিন্তু তার শ্রাবণ মেঘের দিন, আগুনের পরশমনি, কিংবা দুই দুয়ারি সিনেমাগুলো নন্দিত হওয়ার একমাত্র নিয়ামক এগুলোর স্টোরিলাইন। মানুষ গল্প করতে, শুনতে এবং দেখতে পছন্দ করে। বাংলা সিনেমায় এই জিনিসটাই নেই। ৬০ বা ৭০ এর দশকে মধ্যবিত্ত শ্রেণি হলিউড, মালায়লাম, কোরিয়ান মুভির সাথে পরিচিত ছিলোই না বলতে গেলে। কলকাতা বাংলা আর হিন্দি সিনেমার যে মুষ্টিমেয় দর্শক ছিলো তারাও ঠিকই ধরতে পারতেন ৬০ বা ৭০ এর দশকের নামকরা সিনেমাগুলোর বড়ো অংশই আদতে নকল। এমনকি বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশ নিয়েও নকলের অভিযোগ শোনা যায়।

২০০০ সালের পরের পৃথিবী রকেটের গতিতে এগিয়ে গেছে। গ্লোবালাইজেশন নামক মন্ত্রের কারণে কালচারাল বাউন্ডারিও ভেঙ্গে পড়েছে। শশাঙ্ক রিডাম্পশন, পারসুইট অব হ্যাপিনেস, ডেড পোয়েট সোসাইটি কিংবা টুয়েলভ এংরি মেন জাতীয় সিনেমা দেখা দর্শকের পক্ষে চাইলেও মেরিটলেস স্টোরিলাইনের সিনেমা দেখা আজকের পৃথিবীতে সম্ভব নয়। এই চিরসত্যকে আড়াল করতে ডিফেন্স মেকানিজম হিসেবে বরাবরই আমাদের কলাকুশলীরা বাজেট স্বল্পতার ইস্যুকে সামনে নিয়ে আসে। একে আমার বরাবরই বাজে এক্সকিউজ মনে হয়। ধরলাম, মুম্বাইয়ে ১০০ কোটি রুপির সিনেমা হয়, আমাদের এখানে বাজেট ২ কোটি টাকা। কিন্তু আমি শতভাগ নিশ্চিত ২০০ কোটি টাকা বাজেট দিলেও এদেশের পরিচালকরা কোয়ালিটি সম্পন্ন সিনেমা নির্মাণ করতে পারবে না। সেই মেধা, প্রজ্ঞার শোচনীয়রকম অভাব রয়েছে। একটা কমন এক্সকিউজ- ভালো গল্পের সিনেমা চলে না। সিনেমার দর্শক কি গার্মেন্টস শ্রমিক-রিকশাওয়ালা কিংবা নিম্নপেশাজীবীরা? তাদের রুচি সম্পর্কেই বা এতো নিচু ধারণা কেন পরিচালক-প্রযোজকদের? ওই নিম্ন পেশাজীবী শ্রেণীও কিন্তু এখন শাহরুখ খান, সালমান খানের সিনেমা দেখে। তাদের স্টোরিলাইন কি খুব আহামরি? তারাও তো মসলাদার সিনেমাই বানায়।

এখানেই বোঝার গ্যাপ। স্টোরিলাইন চমৎকার হওয়া মানে কিন্তু চমৎকার সাহিত্যনির্ভর বা অভিনব কনসেপ্ট নয়। স্টোরিলাইনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য পেস এবং স্পেস, সঙ্গে টুইস্ট। তামিল-তেলেগু মুভি দেখেন যারা তারা জানেন ওই সিনেমাগুলোতে হিরোইজমের কেমন বাড়াবাড়ি থাকে, তবু দেখতে ক্লান্ত লাগে না, কারণ ওদের বেশিরভাগ সিনেমাতেই ইন্টারমিশনের পরের কাহিনী প্রথমাংশের পুরো বিপরীত হয়ে যায়। এই টুইস্টগুলো দর্শককে বেঁধে ফেলে। এই মুহূর্তে হলিউডের ‘Four Rooms’ নামের একটা সিনেমার কথা মনে পড়ছে। বুয়েটে পড়াকালে বন্ধু তুহিনের মুখে শুনেছিলাম, একটা হোটেলের ৪টা রুমের আলাদা কাহিনী নিয়ে এগিয়েছে সমগ্র সিনেমা। এটা নির্মাণ করতে কি অনেক টাকা বাজেট লেগেছিলো? কিংবা আরো একটা সিনেমা মনে পড়লো, নামটা মনে নেই। একজনমাত্র অভিনেতা; সে কোনোভাবে গর্তের নিচে চাপা পড়েছে; সিনেমাজুড়ে সে ফোনে কথা বলে শুধু, কিন্তু তাতেই ইমোশনালি এটাচড হয়ে পড়ে দর্শক। এই সিনেমা শ্যুট করতে তো একটা হ্যান্ডি ক্যামেরাই যথেষ্ট।

বিউটিকুইন ববিতার সাথে আলমগীর

এর চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কাদের অর্থনৈতিক সঙ্গতি বেশি; মিডলক্লাস কিংবা শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের, নাকি নিম্ন পেশাজীবীদের? কারা সিনেমা বেশি দেখে; মিডল ক্লাস, শিক্ষিত তরুণ-তরুণী, নাকি নিম্ন পেশাজীবীরা? মুভিফ্রিক গোষ্ঠীটি ক্রমশই সম্প্রসারিত হচ্ছে। উল্লিখিত প্রশ্ন দুটোতেই নিম্ন পেশাজীবীরা পরিষ্কার ব্যবধানে পিছিয়ে থাকবে। তবু নিম্ন মেধার পরিচালক, এবং শিল্পরুচিহীন প্রযোজকরা তাদের ঘাড়ে বন্দুক রেখেই বাংলা সিনেমা নামক ইন্ডাস্ট্রিটিকে অবিরাম নির্যাতন চালিয়ে গেলো, এবং এখনো যাচ্ছে।

পাবলিক খাবে না, এই কথা বা ধারণাটাই বরং অখাদ্য পর্যায়ের। মানুষ যা খাবে, কেবলমাত্র সেটাই খাওয়াতে থাকলে কিছুদিনের মধ্যে সব ধরনের খাবারের প্রতিই অরুচি তৈরি হবে। বরং রুচি তৈরি করাও শিল্পীসমাজের অনেক বড়ো শৈল্পিক দায়িত্ব। সেটা বোঝার মতো মেধা-মনন থাকলে এমন বালসুলভ স্টোরিলাইনের সিনেমা বানাতো নাকি!

আপনি বলতে পারেন, এরকম অফট্র্যাক সিনেমা দিয়ে তো একটা ইন্ডাস্ট্রি চলতে পারে না। এ কথার যুক্তি আছে। কলকাতা বাংলা সিনেমার দিকে তাকালেই উদাহরণটা স্পষ্ট হয় আরো। প্রসেনজিত-তাপসপাল-চিরঞ্জিতদের উদ্ভট আর্ট ডিরেকশন, স্টোরিলাইনের সিনেমা পেরিয়ে এখনকার কলকাতায় দুটো ধারা তৈরি হয়ে গেছে। একদিকে, জিত-দেব-কোয়েল মল্লিকদের তামিল-তেলেগু কপিপেস্ট, অন্যদিকে হেমলক সোসাইটি, প্রাক্তন, রাজকাহিনী কিংবা ব্যোমকেশ ধরনের অফট্র্যাক সিনেমা। দুটোই চলছে পাশাপাশি।

ঐতিহাসিকভাবেই আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ পরিচালকদের মৌলিকতা এতোটাই কম যে, তারা সেটা লুকানোর রাস্তা না পেয়ে বাজেট নামক ছাতার নিচে আশ্রছ নিয়েছে, যদিও তাদের জানা নেই ছাতার ভেতরে অজস্র ফুটো।

একারণে বাংলা সিনেমা সবসময়ই আমার কাছে নিছক ননসেন্স হিউমার চর্চার জায়গা ছিলো। জসীম-রুবেলের সংলাপ শুনি, এক্সপ্রেসন দেখি- আর হাসতেই থাকি; তারা নায়ক, নাকি কমেডিয়ান সেই মীমাংসায় পৌঁছানোর আগেই সিনেমা শেষ হয়ে যায়।

আলমগীরের সিনেমাও বাংলা সিনেমার মুখস্থ ফরম্যাটের স্টোরিলাইন। সুতরাং তার ফ্যান হওয়ার কোনোরকম সুযোগ-সম্ভাবনাই ছিলো না কখনো। তার খুব বেশি সিনেমা দেখাও হয়নি আমার। তবু আমার জীবনের সবচাইতে পুরনো অবসেসনের একজন হওয়ায় তার প্রতি বরাবরই আগ্রহ বোধ করেছি; তাকে বোঝার চেষ্টা করেছি, এবং এক পর্যায়ে উপলব্ধি করেছি, ‘নায়ক’ শব্দটা বললেই হলিউড-বলিউড-কোরিয়ান- জাপানিজ- কলকাতা বাংলা বা হিন্দি, যে ভাষারই সিনেমা হোক, আমার সবসময় আলমগীরের ইমেজটাই চলে আসে।

বুলবুল আহমেদের সাথে

বাংলা চলচ্চিত্রেই তো আলমগীর নিরঙ্কুশ অধিপতি নয়। রাজ্জাকের নামের পূর্বে নায়করাজ ট্যাগ বসে গেছে; সারেং বৌ, লাঠিয়াল, সাহেব, সুজন সখী সিনেমার কারণে ফারুকও স্বকীয় অবস্থান অর্জন করে নিয়েছে। উজ্জলের নামের পূর্বে সবসময় মেগাস্টার বিশেষণ বসতে দেখি, যদিও জানি না সে কীভাবে মেগাস্টার হলো। ইলিয়াস কাঞ্চনকেও রাজ্জাকের পরে সবচাইতে প্রভাবশালী হিসেবে মেনে নেয় অনেকে। আমার কমেডিয়ান মনে হলেও রুবেল-জসিমের বিরাট ফ্যান-ফলোয়ার আছে; সালমান শাহ মাত্র ৩ বছরের ক্যারিয়ারে নিজেকে এক অতুলনীয় অবস্থানে নিয়ে গেছে; মান্না-শাকিব খানও ইন্ডাস্ট্রিতে রাজত্ব করেছে বা করছে। মাল্টি ট্যালেন্টেড হিসেবে জাফর ইকবালেরও ভিন্ন এক ইমেজ আছে।

এর মধ্যে আলমগীরের অবস্থান কোথায়? সে সিনেমা করেছে ২৩৫টি, তার ১০৬টিতেই নায়িকা ছিলো শাবানা। উপমহাদেশের সিনেমা সংস্কৃতিতে জুটিপ্রথা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ছিলো একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত। উত্তম কুমার-সুচিত্রা সেন, অমিতাভ-রেখা, ধর্মেন্দ্র-হেমামালিনী, কিংবা পরের জেনারেশনে শাহরুখ-কাজল, সালমান শাহ-শাবনুর, জুটি হিসেবে দারুণ গ্রহণযোগ্যতা অর্জনে সমর্থ হয়েছিলো। এখনকার সিনেমায় যে ধারা চলছে, তাতে একক জুটিপ্রথার সেই জৌলুস বা আবেদন কমে গেছে অনেকটাই। বাংলা সিনেমায় জুটি বললেই সর্বপ্রথম চলে আসে রাজ্জাক-কবরির কথা। তবুও জুটিপ্রথা প্রমোট করা উপমহাদেশীয় চলচ্চিত্রে কোনো জুটিই একসাথে ১০০টির বেশি সিনেমা করেনি। এটা অবশ্যই একটা রেকর্ড। তবু রাজ্জাক-কবরি এর পাশে শাবানা-আলমগীর যেন অনেকটাই ম্রিয়মান।

এর কারণ অবশ্য জুটির প্যাটার্নের মধ্যেই নিহিত। একটা নায়ক ডমিনেন্ট (রাজ্জাক-কবরি), অন্যটা নায়িকা ডমিনেন্ট (শাবানা-আলমগীর)। সম্ভবত তারাই একমাত্র জুটি যেখানে সবসময় নায়িকার নাম আগে আসে। রাজ্জাক-কবরি বা রাজ্জাক-ববিতা জুটি হিসেবে যতো শোনা যায়, রাজ্জাক-শাবানা জুটি হিসেবে অনেক সিনেমা করলেও ডমিনেন্স ফ্যাক্টরের কারণে সম্ভবত রাজ্জাকের চাইতে আলমগীরই বেটার অপশন হয়েছে শাবানার জন্য।

যেহেতু নায়ক বললেই আলমগীরের ইমেজ মাথায় আসে, আমি তাই সর্বদাই বোঝার চেষ্টা করেছি, কেন নায়ক আর আলমগীর সমার্থক হয়ে রইলো জীবনভর। সে ৯ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছে; অভিনেতাদের মধ্যে এটা সম্ভবত সর্বোচ্চ। কিন্তু বাংলাদেশের পুরস্কার ব্যাপারটা অনেকটাই জোকস বা রসিকতার মতো লাগে বলে পুরস্কার দিয়ে কখনোই শিল্পীকে বিচার করি না। ফলে আলমগীর ৯ বার কেন, ৯৯ বার পেলেও ইমেজ একই থাকতো, একবারও না পেলে ইমেজের হেরফের ঘটতো না।

আমি তারপরে মনোযোগ দিই আলমগীরের বিশেষত্ব খুঁজতে, এবং একসময় আবিষ্কারও করি। তার সবচাইতে ইউনিকনেস হলো হাঁটার স্টাইল। লং এঙ্গেল শটে তার হাঁটার কোনো দৃশ্য দেখে থাকলে বক্তব্যের সত্যতা পাবেন। তার হাঁটার মধ্যে একটা অনোনুকরণীয় স্মার্টনেস পাই, যেটা আর কোনো নায়কের মধ্যে দেখি না।

আলমগীরে পাশে প্রথম কন্যা আঁখি। সাথে বাকি দুই কন্যা ও প্রথম স্ত্রী খোশনূর।

শুধুমাত্র হাঁটার স্টাইল একজন অভিনেতাকে ইউনিক বানিয়ে দিতে পারে? ম্যানলিনেস ধারণাটার মধ্যে যে বৈশিষ্ট্যগুলো পড়ে তার মধ্যে তো বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, গেশ্চার খুব ভালোমতোই অন্তর্ভুক্ত। সাধারণত নায়িকাদের হাসির সৌন্দর্য নিয়েই কথা হয়। তবে উত্তম কুমারসূত্রে নায়কদের হাসিও যে অলংকার হতে পারে সেটা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। এখনকার প্রৌঢ় আলমগীর নয়, মাঝবয়েসী নায়ক আলমগীরের হাসিটা এরপরে লক্ষ্য করবেন; আর কিছু বলতে চাই না। এক্টিং বা অভিনয়ের ব্যাকরণ জানা নেই আমার; তাই অভিনেতা হিসেবে সে কেমন বলতে পারছি না। মরণের পরে নামে একটা সিনেমা দেখেছিলাম, যেখানে ৬ বাচ্চার সবগুলোকে একে একে পালক দেয়; স্টোরিলাইনের কারণেই হয়তোবা তার অভিনয় ভালো লেগেছিলো। এছাড়া দেশপ্রেমিক সিনেমায় বিধ্বস্ত পরিচালক চরিত্রে তার অভিনয়টা আলাদাভাবে নজরে পড়েছিলো। আমি কল্পনা করতে থাকি- ওই চরিত্রে যদি রাজ্জাক-সোহেল রানা বা ফারুক অভিনয় করতো, কেমন লাগতো? কোনোভাবেই তাদের ফিট করতে পারিনি, যে কারণে মনে হয়েছে ওই চরিত্রটায় সে ভালো অভিনয় করেছে।

পক্ষান্তরে, ‘কাছের মানুষ’ নাটকে সে যখন শুভাশিস চরিত্রে অভিনয় করেছিলো, খুবই এমেচার টাইপ অভিনয় মনে হয়েছে। সে যে সিনেমার এতো বড়ো নামকরা নায়ক, অভিনয় দেখে মনেই হয়নি। তখন আরো ভালোভাবে নিশ্চিত হয়েছি, সিনেমা আর নাটকের অভিনয়ের গ্রামার আলাদা।

রাজ্জাক আর সে অনেকগুলো ছবিতেই স্ক্রিন শেয়ার করেছে। জসিম, ওয়াসিমের সাথেও সিনেমা দেখেছি, কিংবা পরের প্রজন্মের ইলিয়াস কাঞ্চন, মাহমুদ কলি, মান্না, রুবেল এদের সাথেও একই সিনেমায় অভিনয় করেছে। কিন্তু সমসাময়িক অন্য দুজন নায়ক ফারুক আর সোহেল রানার সাথে সে কোনো সিনেমা করেছে কিনা জানা নেই। সম্ভবত করেনি। এই ব্যাপারটা খুবই অবাক লাগে আমার।

তার চাইতেও অবাক লাগে ববিতার মতো নায়িকার সাথে তার সিনেমার সংখ্যা এতো কম কেন, সেই প্রশ্নের যথাযথ ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে না পেরে। শাবানার সাথে অতিরিক্ত সিনেমা করাই কি কারণ, নাকি ফারুক-সোহেল রানার সাথে যে কারণে কাজ করা হয়নি বা হলেও খুবই কম, সেরকম কোনো যোগসূত্র রয়েছে, এতোদিন পরে সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা অর্থহীন। কিছুদিন আগে ইউটিউবে সেন্স অব হিউমার নামের একটা অনুষ্ঠান দেখলাম, অতিথি হিসেবে এসেছিলো নায়ক ফারুক ও সোহেল রানা; উপস্থাপক জয় তাদের দুজনকেই নায়িকা ববিতার প্রেমিক হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করে। ফিল্ম পলিটিক্স চিরন্তন ব্যাপার। ববিতার সাথে যথেষ্ট পরিমাণে সিনেমা না করার পেছনে এরকম কোনো পলিটিক্স থাকলেও থাকতে পারে এটাই অনুমান আমার। শাবানার বাইরে রোজিনাই বোধহয় তার ২য় সর্বোচ্চ সংখ্যক সিনেমার নায়িকা। যেহেতু বাংলা সিনেমা বিষয়ে খুব ভালোমানের কোনো লেখা গুগলে পাওয়া যায় না, এবং আমিও বাংলা সিনেমার প্রতি খুব বেশি আকৃষ্ট ছিলাম না, যে কারণে সবই অনুমাননির্ভর কথা বলতে হচ্ছে।

বাংলা সিনেমার স্টোরিলাইন প্রেডিক্টেবল এবং ভঙ্গুর হলেও বাংলা সিনেমার গান সে তুলনায় যথেষ্ট সমৃদ্ধ। ক্ষতিপূরণ সিনেমার ‘এই পথ চলি একা, রাতের আঁধার সাথী করে, দূরাশার পৃথিবীতে শূন্য হৃদয় যায় জ্বলে, শুধু তুমি কাছে নেই বলে’- এই গানটা প্রতি সপ্তাহেই শোনা হয়, বিশেষত যখন ব্লগের জন্য পোস্ট লিখতে বসি কানে হেডফোন লাগিয়ে ইউটিউবে গানটাই বাজতেই থাকে। ব্লগ লেখার সময় আরো কয়েকটা গান থাকে অবশ্য- সামার ওয়াইন, পাপড়ি কেন বোঝে না, মেরে ভিগি ভিগি সে, নীলাঞ্জনা ফিউশন, প্রভৃতি।

সুখী দম্পতি

গানের প্রসঙ্গ টানলাম, কারণ আলমগীরকে বুঝতে গিয়ে তার অভিনয়ের চাইতে গানপ্রীতির ব্যাপারটাই সামনে চলে এসেছে বারবার। তার সিনেমার আরো কয়েকটা গান মাথায় আসছে। ‘জীবন যেন শুরু হলো নতুন করে’, ‘তুমি আরো কাছে আসিয়া আমায় যাও না ভালোবাসিয়া’, ‘কোথায় স্বর্গ আর কোথায় তারা’, ‘টেলিফোনে কিছু কথা হলো’, ‘কে জানে কত দূরে সুখের ঠিকানা’, ‘ভালোবেসে গেলাম শুধু ভালোবাসা পেলাম না’, ‘মানুষের মতো মানুষ পৃথিবীতে নেই’। গানের রেফারেন্স দিচ্ছি, কারণ আলমগীর তার বহু ইন্টারভিউতে স্বীকার করেছে, সে মূলত গায়ক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছে, চেষ্টাও করেছে, কিন্তু তার ফিগার দেখে নায়ক বানিয়ে দেয়া হয়েছে। শিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদির কাছে তিনমাস গান শেখার চেষ্টা করেছে সে। ইউটিউবে খুঁজলে তার গাওয়া বেশ কয়েকটা গানই পাওয়া যায়। তন্মধ্যে ‘তুমি আরেকবার আসিয়া যাও মোরে কান্দাইয়া, ‘আছেন আমার মোক্তার আছেন আমার ব্যারিস্টার’ গান দুটো শুনে মনেই হয় না এমেচার কোনো গায়ক গেয়েছে। তার স্ত্রী খোশনুর একজন গীতিকবি, বড়ো মেয়ে আঁখিও গান করে, এবং স্টারবক্স নামের এক অনুষ্ঠানে মেয়ে বাবার সাক্ষাৎকার নিয়েছে, সেখানে আলমগীর বলেছে- তার গায়ক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ না হওয়ায় মেয়েকে অভিনয়ে না জড়িয়ে গায়িকা বানানোর চেষ্টা করেছে।

গানের প্রতি তার আকর্ষণকে স্রেফ ভালো লাগা বলাটা ভুল উপসংহারে নিয়ে যেতে পারে আমাদের। আমার ধারণাটা, গানের প্রতি তার প্রচণ্ড অবসেসন কাজ করে। যে বয়সে রুনা লায়লাকে সে বিয়ে করেছে ওটা ঠিক প্রেম-কামের বয়স নয়; তখন তার বয়স ৫০ বা তার আশপাশে; রুনা লায়লারও হয়তোবা তাই। শাবানা-আলমগীরের অজস্র সিনেমায় এন্ড্রু কিশোর-রুনা লায়লা গান গেয়েছে; প্রেম-কাম জাতীয় বোধগুলো সক্রিয় হলে সেটা আরো আগেই হতে পারতো, কারণ তারা অনেকদিন আগে থেকেই একে অপরের পরিচিত। কিন্তু বিয়েটা হলো কখন? রুনা লায়লার বায়োপিক ‘শিল্পী’ সিনেমায় একসাথে কাজ করা সূত্রে। এই সিনেমায় রুনা লায়লা স্বনামে অভিনয় করেছিলো, পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম; সেই সিনেমার স্টোরিলাইন এতো দুর্বল; এটা কি ইচ্ছাকৃত, নাকি কাকতালীয়? ইচ্ছাকৃত মনে হওয়ার প্রধান কারণ, এই সিনেমায় আলমগীরের ক্যারেক্টার। সিনেমায় সে রুনা লায়লার সিকিউরিটি গার্ড, এক পর্যায়ে রুনা লায়লা তার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে, সেও নিজের দুর্বলতা ঢেকে রাখতে পারে না; কিন্তু শিল্পী রুনা সবার, এই অদ্ভুত যুক্তি দেখিয়ে ‘হয়তো কিছু নাহি পাবো, তবুও তোমায় আমি দূর হতে ভালোবেসে যাবো’ গানের মতো একটা এন্ডিং।

আলমগীর তখন বিবাহিত, ৩ সন্তানের সবাই যথেষ্ট বড়ো হয়ে গেছে; সুতরাং বিয়ে করাটা কতটুকু শোভন হবে বা আদৌ উচিত হবে কিনা, এরকম একটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করছিলো বলেই বোধহয়, এই ধরনের এন্ডিং। নইলে যেখানে রুনা লায়লা স্বনামে অভিনয় করছে, সেখানে সে একজন সিকিউরিটি গার্ডের প্রেমে পড়বে, শিল্পী রুনা লায়লার সাথে এটা কোনোভাবেই মানানসই নয়। একারণে আমার ধারণা, শিল্পী সিনেমাটা একটা ‘গট আপ কেস’; বিয়ে করার গ্রাউন্ড প্রতিষ্ঠা করতেই হয়তোবা সিনেমাটা নির্মিত হয়েছিলো। নইলে, সিকিউরিটি গার্ডের ক্যারেক্টার আলমগীরের করার কারণ দেখি না। সিনেমাটা খুব মনোযোগ দিয়ে দেখলে ‘গট আপ কেস’ এর ধারণাটা আরো জোরালো হয়। প্রচুর ক্লু বা হিন্টস আছে সিনেমাজুড়ে। আলমগীর গানের অবসেসন থেকে, রুনা লায়লা নায়কোচিত পারসোনালিটি খুঁজতে হয়তোবা পরস্পরের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলো।

রুনা লায়লা গায়িকা না হলে হয়তোবা এই বিয়ে হওয়ার প্রশ্নই উঠতো না। এবং যেনতেন শিল্পী নয়, ভারতীয় উপমহাদেশের সঙ্গীতেই রুনা লায়লা একজন কিংবদন্তী। কবির সুমন আর সাবিনা ইয়াসমীনের বিয়ে করার চাইতেও আলমগীর-রুনা লায়লার বিয়েটা আমার বেশি ইন্টারেস্টিং এবং কৌতূহলোদ্দীপক কেইস স্টাডি মনে হয়। এখানেও আলমগীরকে কর্তৃকারক না হয়ে, কর্মকারক হয়ে গেলো, কারণ নায়ক আলমগীরের চাইতে কণ্ঠশিল্পী রুনা লায়লার পরিচিতি এবং প্রতিপত্তি অবশ্যই বেশি। নায়ক ক্যারিয়ারে শাবানার আড়ালে, ২য় বিয়ে করে রুনা লায়লার আড়ালে ঢাকা পড়ে যাওয়া অনেকটাই।

কন্যা ও গায়িকা আঁখি আলমগীরের সাথে।

অবশ্য আরেকটা ইন্টারেস্টিং অনুমান আছে আমার শাবানা-আলমগীর জুটি নিয়ে। শাবানা যখন নায়িকা ইমেজের ঊর্ধ্বে উঠে প্রোটাগনিস্ট হয়ে উঠেছে সিনেমাগুলোর, সেসময় হঠাৎ করেই জসিমের সাথে তার একটা জুটির মতো গড়ে উঠেছিলো। সেসময় কি শাবানা-আলমগীরের মধ্যে কোনোকারণে একঘেয়েমি চলে এসেছিলো? নইলে স্বামী কেন আসামী সিনেমায় জসিম যে চরিত্রটি করেছে, সেটা নির্দ্বিধায় আলমগীর করতে পারতো, এবং সে-ই পারফেক্ট হতো। ঘাতক সিনেমায় আলমগীরের প্রেজেন্টেশন দেখলে এই স্টেটমেন্ট সম্পর্কে আরো নিঃসংশয় হওয়া যায়।

শাবানা সিনেমা থেকে অবসরে চলে যাওয়ার পর আলমগীরও সিনেমাতে অনিয়মিত হয়ে পড়ে। কিন্তু ৯০ এর দশকে এই জুটিকে ঘিরে বেশ কিছু পারিবারিক সিনেমা নির্মিত হয়েছিলো। এই মুহূর্তে মনে পড়ছে জজ ব্যারিষ্টার, স্নেহ, সত্যের মৃত্যু নেই। আরো অনেকগুলো ছিলো। শাবানার উচ্চতা কম, আলমগীর দোতলা বাস- তবু এই জুটি শতাধিক সিনেমার রেকর্ড গড়লো কীভাবে, এটা খুবই বিস্ময়কর একটা ঘটনা মনে হয়।

‘মহানায়ক’ নামে একটা সিনেমা নির্মিত হয়েছিলো, যেখানে অভিনয় করেছিলো বুলবুল আহমেদ। সেই সিনেমার গানগুলো দুর্দান্ত ছিলো। একারণে বুলবুল আহমেদকে অনেকেই মহানায়ক বলে ডাকতো; কিন্তু সিনেমাটা দেখে বারবারই মনে হয়েছে নামের ভার বহনের মতো যথেষ্ট চওড়া বুলবুল আহমেদের কাঁধটি নয়। এখানে আলমগীর মানিয়ে যেতো হয়তোবা।

আলমগীর যদি কলকাতা বা মুম্বাইয়ে অভিনয় করতো, ক্যারিয়ার শেষে সে কি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বা অমিতাভ বচ্চনের মতো পারসোনালিটি ফিগার হতে পারতো? সত্যজিত রায়ের হাতে পড়লে সে নিজেকে নিশ্চিতভাবেই আরও সমৃদ্ধ করতে পারতো। সৌমিত্রের সৌমিত্র হওয়ার ক্ষেত্রে তার নিজের যতখানি অবদান, সত্যজিতের পৃষ্ঠপোষকতাও নেহায়েত কম নয়। এক্সকিউজপ্রবণ মানুষেরাই জন্মস্থান নিয়ে আফসোস করে, চ্যাম্পিয়নেরা জন্মস্থান-সময় প্রভৃতিকে জয় করে নেয়। বরিশালের গৌরাঙ্গ চক্রবর্তী যদি বলিউডের ডিসকো ড্যান্সার মিঠুন চক্রবর্তী হতে পারে, আলমগীরের যদি সেরকম বড়ো ভিশন বা স্বপ্ন থাকতো, সেও চেষ্টা করতো হয়তোবা। তবে মিঠুন আর আলমগীরের কনটেক্সট পুরোপুরি আলাদা। পারিবারিকভাবে তারা স্বচ্ছল; তার বাবা বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশের অন্যতম প্রযোজক ছিলেন। সেই পরিবারের ছেলে কেবলমাত্র সিনেমায় ক্যারিয়ার গড়ার উদ্দেশ্যে কলকাতা বা মুম্বাইয়ে চলে যাবে, এটা একটু অলীক কল্পনা হয়ে যায়।

নায়ক বললেই যেহেতু আলমগীরের ইমেজ মাথায় আসে, কল্পনায় আমি তাকে প্রোটাগনিস্ট ধরে সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখতে থাকি। আলমগীরকে ফোকাস পয়েন্ট ধরে বাংলা সিনেমার সমগ্র জার্নিটা বা ইতিহাসটা স্টোরিলাইনে তুলে আনা। ৭০ বছরের আলমগীর নিজের বাসায় একটা স্টুডিও বানিয়েছে; সেই স্টুডিওতে সুমিতা দেবি থেকে শুরু করে বাপ্পি-সায়মন সবার ছবি। স্টুডিওতে বসে পুরনো দিনের ছবি দেখে। কখনো রাজ্জাক, আনোয়ার হোসেন, খলিল, রাজিব দের কথার প্রতিধ্বনিত শুনতে পায়, কখনোবা শাবানা-রোজিনা কিংবা ববিতা-অলিভিয়ার সাথে গানের দৃশ্যায়নগুলো মনে পড়ে।

বিভিন্ন পরিচালক, নতুন নায়ক-নায়িকারাও স্টুডিওতে আসে বিভিন্নভাবে; একটামাত্র রুম আর কয়েকটা লোকেশনে পুরো সিনেমার শুটিং করে ফেলা যায়। সেখানে গানের বিবর্তন ধারা থাকবে; মানে রাজ্জাক-কবরি যুগ, ইলিয়াস কাঞ্চন চম্পা, সালমান-শাহ মৌসুমী পেরিয়ে, হাল আমলের আইটেম সং, হিপহপ সং সেগুলোও থাকবে। ফলে এটা কোনোভাবেই আর্টফিল্ম বা অফট্র্যাক ফিল্ম হবে না, পুরোদস্তুর কমার্শিয়াল সিনেমা, কিন্তু এক সিনেমায় বাংলা সিনেমার দীর্ঘ ইতিহাস উঠে আসবে। সেজন্য প্রচুর তথ্য-উপাত্ত জোগাড় করতে হবে, কিন্তু একটা উৎকৃষ্ট সিনেমা স্ক্রিপ্ট লিখতে উৎকৃষ্ট স্যাক্রিফাইসই লাগে; এসিরুমে বসে কপি-পেস্ট প্রোডাকশনই বের হবে।

জানি না কল্পনার এই স্ক্রিপ্ট বাস্তবায়নের মতো টাকা কোনোদিন আমার হবে কিনা, কিংবা যতদিনে টাকা হবে ততদিনে আলমগীর বেঁচে থাকবে কিনা। কিন্তু মৃত্যুর পূর্বে আমি অন্তত ১টা সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখবোই। আলমগীর বেঁচে থাকলে তাকে অভিনয়ের জন্য অনুরোধ করবো, প্রকৃতির নিয়মে চলে গেলে আলমগীর চরিত্রে অন্য কোনো অভিনেতা অভিনয় করবে। জহির রায়হান ব্যতীত বাংলাদেশের কোনো পরিচালকের প্রতিই শ্রদ্ধা নেই; অধিকাংশেরই আর্ট সেন্স এবং আর্টরুচি অত্যন্ত বাজে; তারা স্টোরিলাইনের বারোটা বাজিয়ে দিবে; একারণে আর্ট ডিরেক্টর নির্বাচনের আগে প্রচুর ইন্টারভিউ নেয়ার ইচ্ছা। এই ইচ্ছা পূরণ হবে কিনা বলতে পারি না।

কিন্তু সেই ১৯৯১-৯২ এ মাত্র ৫-৬ বছর বয়সে আম্মুর বলা উদ্ধৃতি থেকে যে ঘোর বা অবসেসনের মধ্যে ঢুকে পড়েছি, নিজের সমবয়সী অবসেসন চরিত্র কিংবা নায়ক ইমেজ কিংবা দোতলা বাস ‘আলমগীর’-এর প্রতি ট্রিবিউট জানানোর জন্য এর চাইতে সুন্দর বুদ্ধি মাথায় আসছে না।

এধরনের কথা শুনলে যে কোনো সেলিব্রিটি ভাববে আমি বুঝি তার ফ্যান। একটা কথা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, ফ্যান বলতে আমি টেবিল কিংবা সিলিং ফ্যান বুঝি। কারো ফ্যান হওয়া রাশিতে নেই আমার। তাছাড়া বাংলা সিনেমার যেসব স্টোরিলাইন, এখানকার কোনো অভিনেতার ফ্যান হওয়া স্রেফ অসম্ভব। কিন্তু অবসেসন তো ব্যাকরণ-ভূগোল মেনে তৈরি হয় না। আমি আমাকে নয়, অবসেসনই ক্ষণে-বিক্ষণে নিয়ন্ত্রণে করে আমায়।

এখনো যখন রাস্তায় বের হলে বিআরটিসির দোতলা বাস দেখি, প্রথমেই মাথায় আসে আম্মু কেন আলমগীরকে দোতলা বাস বলেছিলো। এবং তখনই আলমগীরের ইউনিক হাঁটার স্টাইলটা মনে পড়ে যায়। অবসেসনের আড্ডায়, বাঁড়ুক সময় প্রজ্ঞায়।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।