আজিজুল হাকিম: নীরব তবে অপরিহার্য

‘মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কারাগারে আটকে আছি, তাই সাইকেল নিয়ে বের হই।’

শঙ্খনীল কারাগার সিনেমায় ‘মজনু’ চরিত্রটি খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়,তবে হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টি বলেই ছোট ছোট চরিত্রগুলো মন ছুঁয়ে যায়। এই সিনেমায় মজনু পরিবারের ছোট ছেলে, বলা যায় নীরব দর্শক। পরিবারের নানা সীমাবদ্ধতা তাঁর চোখে পড়ে, কিন্তু কিছুই করতে পারে না। বাবা- মার পাশাপাশি বড় আপা কিংবা ভাইয়াদের কাছেই তাদের যত আবদার। কখনো মিটে, কখনো মিটে না।

মজনুর কবিতা যখন পত্রিকায় ছাপানো হয়, তখন লাজুক ভঙ্গিতে বড় আপার কাছে প্রকাশ করে সেটা সত্যিই বাস্তবিক। তারপর সাইকেল চালিয়ে মজনুর যে তারুণ্যের উচ্ছাস দেখানো হয়, সেটার বর্ণণা সঠিক ভাবে দেয়া যায় না। মজনু এখানে মধ্যবিত্ত পরিবারের ছোট ছেলের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। এই সিনেমায় মজনু চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন এক সময়ের টেলিভিশন নাটকের জনপ্রিয় অভিনেতা আজিজুল হাকিম।

আজিজুল হাকিম কখনোই আমার নায়কোচিত মনে হয়নি। পরিবারের ছোট চাচা বা মামাদের যেমন চরিত্র থাকে বা মুখঅবয়ব থাকে, তিনি ঠিক তেমনি। তবে, যখন যে চরিত্র করতেন তাতেই হয়ে যেতেন অপরিহার্য। হুমায়ূন আহমেদের নক্ষত্রের রাত ধারাবাহিকেও তিনি ছোট ছেলের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। ছোট বোন মনিষার সঙ্গে যে দ্বৈতভাব প্রকাশ পেয়েছিল তা মুগ্ধ করার মতন।

টেলিভিশন নাটকে প্রথম অভিনয় ‘এখানে নোঙর’ নাটক দিয়ে, সময় অসময় নাটকেও ছিলেন। তবে আলোচনায় আসেন ইমদাদুল হক মিলনের ‘কোন কাননের ফুল’ ধারাবাহিক নাটক দিয়ে। এরপর কোথায় সে জন, না, জীবন ছবি, স্পর্শ, পুত্রদায়, অতিক্রম-সহ নব্বই দশকে অসংখ্য নাটকে অভিনয় করেছেন। আফসানা মিমির সঙ্গে জুটি বেশ দর্শকপ্রিয়। অন্যদিকে সুরাইয়া হুদা রাত্রির সাথে জুটিও বেশ দর্শকালোচিত ছিল।

গত দশকের প্রথম মধ্যভাগ পর্যন্ত বেশ জনপ্রিয় ছিলেন। ‘টেরিবাবু’ টেলিফিল্মটি তো বেশ জনপ্রিয় ছিলো। এছাড়া নাইওরী, লোভ, বাবুদের ফুটানি, অত:পর নুরুলহুদা, চেরাগ আলী, ওসমান গনি চাঁদে যাবে, গরম ভাত অথবা নিছক ভূতের গল্প, শূন্যস্থান পূর্ণ-সহ অনেক নাটকে অভিনয় করেছেন।

নিজের পরিচালনায় ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ ধারাবাহিক নাটকটিও বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। এরপর থেকেই অনিয়মিত হয়ে পড়েন। বিটিভির নিজস্ব প্রযোজনার কিছু নাটকে অভিনয় করতেন। কিছুদিন আগেই গ্রামীণফোনের বিজ্ঞাপনে বাবার চরিত্রে দেখা মিলেছিল অনেকদিন পর। সম্প্রতি একটি নাটকে মিথিলার বাবার চরিত্রে অভিনয় করেছেন।

শঙ্খনীল কারাগারের পর সতীর্থ তৌকীর আহমেদের ‘জয়যাত্রা’তে অভিনয় করেছেন। এই সিনেমায় বিপাশা হায়াতের স্বামী ‘আদম’ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। এরপর আর কোনো সিনেমাতেই তাঁকে আর পাওয়া যায়নি।

আজিজুল হাকিমের জন্ম কুমিল্লায়। ১৯৭৭ সালে ছাত্রাবস্থাতেই মঞ্চ নাটকে যোগ দেন তিনি। তাঁর শুরু হয় ‘আরণ্যক’ দিয়ে। প্রথম করেন ‘কদম আলী’ নাটকটা। ওরা আছে বলেই, ইবলিশ, নানকার পালা, গিনিপিগ, সমতট, করিওলেনাস, কির্তনখোলা, তালপাতার সেপাই, সংসদের মা – ইত্যাদি নাটকের নিয়মিত মুখ ছিলেন তিনি। তবে, ১৯৯৮ সালের পর আর মঞ্চের নাটনে দেখা যায়নি তাঁকে।

ব্যক্তিজীবনে বিয়ে করেছেন জনপ্রিয় নাট্যকার জিনাত হাকিমকে। বিয়ে হয় ১৯৯৩ সালে। তাঁদের দুই ছেলে মেয়ে, মেয়ে নাযাহ্ এবং ছেলে হূদ।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।