একজন কিশোর যোদ্ধার বীরত্বগাঁথা

কিছু কিছু সূর্যোদয় সীমাহীন বেদনার মহাভার নিয়ে আসে। বাংলাদেশ, প্রিয় জন্মভূমি আজ তুমি হারিয়েছ তোমার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের একজনকে। তোমাকে ভালোবাসার অপরাধে এ মানুষটির পিঠের চামড়া তুলে নিয়েছিল পাকিস্তানী অমানুষরা, তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৫।

যুদ্ধাপরাধ মামলায় গোলাম আজমের বিচারিক পর্বে রাষ্ট্রের ১৪ তম সাক্ষী ছিলেন অসাধারণ সব গানের সুরকার, বীর মুক্তিযোদ্ধা শ্রদ্ধেয় আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। ব্যাক্তি বুলবুল ভাইয়ের মুক্তিযুদ্ধকালীন ভুমিকার কথা আমাদের দেশের মানুষ খুব সামান্যই জেনেছেন এই মামলাটির আগে।

মুক্তিযুদ্ধে শ্রদ্ধেয় আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের পরিবারের অসামান্য অবদান রয়েছে। তাঁর বড় ভাই শ্রদ্ধেয় ইফতেখারউদ্দিন আহমেদ টুলটুল ছিলেন ক্র্যাক প্লাটুন খ্যাত গেরিলা দলটির দুঃসাহসী সদস্য। মাত্র ১৫ বছর বয়সে পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে দাঁড়াবার মত সাহস আমাদের অনেকের না থাকলেও ইমতিয়াজ বুলবুলের ছিল। বুলবুল ভাইয়ের কথা প্রাসঙ্গিকভাবেই চলে আসে যখন আমরা গোলাম আজমের কথা বলবো। বুলবুল সাক্ষ্য দেবার সময় বলেছিলেন শহীদ সিরু মিয়া ও তাঁর একমাত্র পুত্র শহীদ কামালের কথা।

বুলবুল ভাইয়ের কাছে একাত্তরের বেদনার স্মৃতি তৈরি করতো কান্নার নোনা জল। যে জল কখনোই ফুরাবার নয়। রাজাকার আর পাকিস্তানীদের কখনোই তিনি ক্ষমা করেননি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া কারাগারে আটক থাকা অবস্থায় বুলবুল ভাই ছিলেন শহীদ সিরু মিয়া দারোগা ও তার সন্তান শহীদ কামাল আনোয়ার ও শহীদ নজরুলসহ ৩৮ জনকে ঈদের দিন রাতে কারাগার থেকে বের আনার ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী।

আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের অনন্য এই যোদ্ধা আমাদের প্রকৃত যোদ্ধা হতে শিক্ষা দিয়েছেন গানে ও সুরে। বাংলাদেশের প্রায় সহস্রাধিক গানের জনপ্রিয় সুরকার-গীতিকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মকে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন তার মতো সাহসী আর নির্ভীক করে, যাতে সবসময় তৈরি থাকে দেশ-মানুষ আর মাটির জন্য যুদ্ধে যেতে।

বছর খানেক আগে এক সংবাদপত্রের মাধ্যমে জেনেছিলাম, মুক্তিযোদ্ধা এবং সংগীত পরিচালক হিসেবে সরকারের কাছে ৫০ হাজার টাকা জমা দিয়ে আড়াই কাঠা জমির জন্য আবেদন করেছিলেন বুলবুল ভাই। ১৯৯৭ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার এই আহবানে সাড়া দিয়ে তাঁকে আড়াই কাঠার প্লট বরাদ্দ করেছিল। কিন্তু, পরবর্তীতে ২০০১ সালে বিএনপি-জামাত সরকার গঠন করে এসে সেই প্লট কেড়ে নিয়েছিল, যা আজ পর্যন্ত আর ফেরত দেয়া হয়নি। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আজও তাঁর দেয়া সেই ৫০ হাজার টাকার কোন সুরাহা করেনি। এই জমি ও অর্থের আর কোন প্রয়োজন নেই তাঁর।

 

আপনাকে কতোটা ভালবাসি সেটা কিছুটা জানতেন, মিরাজ ভাইয়ের মৃত্যুর পর আপনার দহনও দেখেছি। আজ আপনিও চলে গেলেন পরমের কাছে। এই বাঁধভাঙা অশ্রু কিছুতেই থামছে না ভাইয়া।

এত জলদি যাবার তাড়া কেন ছিল?

বুলবুল ভাই, আমাদের হৃদয়ের সব ক’টা জানালা খুলে রাখবো সব সময় আপনার জন্য। অপার্থিব জগত থেকে আপনি দেখবেন। আপনি দেখবেন, দেশাত্মবোধক গানের সম্রাটকে আমরা হৃদয়ের উজ্জ্বলতম প্রকোষ্ঠে ভালোবাসায় সম্মানের সাথে রেখেছি।

বিদায় জানাচ্ছি না বুলবুল ভাই। দেখা হয়ে যাবে ওপারে, এ কেবলই এক সাময়িক বিচ্ছেদ মাত্র।

কৃতজ্ঞতা: গেরিলা ১৯৭১

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।