জায়ান্টদের সাজানো বাগান নষ্ট করাই ওদের কাজ

কাগজে কলমে এখনো বিশ্বকাপের সবচেয়ে নবীন ও খর্বশক্তির দল হল আফগানিস্তান। কিন্তু এ কি! যে দলটা আগে বিশ্বকাপে প্রথম রাউন্ডের বাঁধাই কখনো অতিক্রম করতে পারেনি, তাঁরাই এবার বিশ্বজয়ের ছক কষছে। সেটা হয়তো হবে না, তবে আক্ষরিক অর্থেই বড় দলগুলোর সাজানো বাগান তছনছ করার ক্ষমতা আছে এই দলটির।

  • দলের শক্তিমত্তা

বিশ্বসেরা স্পিন ডিপার্টমেন্ট আফগানদের মূল শক্তি। দলে রয়েছে তিনজন ভয়ানক স্পিনার; লেগি রশিদ খান, অফ স্পিনার মুজিব উর রহমান ও আরেক অফ স্পিনার মোহাম্মদ নবী। তিন স্পিনার মিলে খেলেছেন ২০১ ম্যাচ, তুলে নিয়েছেন ২৯৪ উইকেট! গড় ইকোনমি চারেরও কম। যেকোনো শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপে এই ত্রয়ী কাঁপন ধরাতে বদ্ধপরিকর।

দ্বিতীয় শক্তিশালী দিক আফগানিস্তানের পাওয়ার হিটিং। দলে রয়েছে একঝাঁক সুঠাম দেহের অধিকারী ব্যাটসম্যান। রয়েছে মোহাম্মাদ শাহজাদ, হযরতুল্লাহ জাজাই, নাজিবুল্লাহ জাদরান, মোহাম্মাদ নবী, রশিদ খানদের মতো একাধিক বিগ হিটিং ব্যাটসম্যান। রিদমে থাকলে এরা বড় দলের উৎযাপন নষ্ট করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

  • অভিজ্ঞতা

আফগানিস্তান দলটি অভিজ্ঞতার দিক থেকে অনেক তরুণ। ম্যাচ খেলার দিক থেকে এবারের আসরের সবচেয়ে কম অভিজ্ঞ দল এটি। আফগানিস্তান এর আগে মাত্র একটি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করেছে। ২০১৫ সালের সেই বিশ্বকাপ খেলেছেন, বর্তমান দলে এমন খেলোয়াড় আছেন আট জন। তাঁরা হলেন – অধিনায়ক গুলবাদিন নাইব, ব্যাটসম্যান আসগর আফগান, ব্যাটসম্যান নাজিবুল্লাহ জাদরান, অলরাউন্ডার শামিউল্লাহ শিনওয়ারী, অলরাউন্ডার মোহাম্মাদ নবী, মিডিয়াম ফার্স্ট আফতাব আলম, ফার্স্ট বোলার দৌলত জাদরান এবং আরেক ফার্স্ট বোলার হামিদ হাসান। স্কোয়াডে থাকা বাকি ৭ জন এবারই প্রথম বিশ্বমঞ্চে পা রাখছেন।

  • তুরুপের তাস

অফ স্পিনার মুজিব উর রহমান এই দলের সবথেকে বড় এক্স ফ্যাক্টর। এবারের আসরের একমাত্র টিনএজ খেলোয়াড় তিনি। নতুন বলে অসাধারণ সব টার্ন ও বাউন্স দিয়ে প্রতিপক্ষকে দিশেহারা করে ফেলেন। ৩০ ম্যাচ খেলে তিনি এপর্যন্ত ৫১ উইকেট নিয়েছেন, গড় ইকোনমি ৩.৭৬, যা ঈর্ষণীয়!

দ্বিতীয় অস্ত্র হলো বল হাতে ফর্মের তুঙ্গে থাকা রশিদ খান। ইতিমধ্যে তিনি ৫৯ ম্যাচ খেলে ১২৫ উইকেট পকেটে পুরেছেন, তার গড় ইকোনমি ৩.৯! মূলত ইনিংসের মাঝের ওভারগুলোতে রান চাপিয়ে ব্রেকথ্রু এনে দেওয়াই তার কাজ। আর এই কাজে তিনি বেশ পারদর্শী।

আফগান অলরাউন্ডার মোহাম্মাদ নবীর ওপর আফগানিস্তান দলের পারফরমেন্স নির্ভর করে। অভিজ্ঞ এই স্পিন অলরাউন্ডার ভালো খেললে আফগানরা ভালো খেলে। এই আসরে তার দিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশটির সমর্থকেরা চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকবে।

বিধ্বংসী ব্যাটসম্যান মোহাম্মদ শাহজাদ একবার উইকেটে সেট হয়ে গেলে প্রতিপক্ষের জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। আফগানিস্তানের হয়ে তিনি রেকর্ড সর্বোচ্চ ৬ টি সেঞ্চুরি হাকিয়েছেন। এছাড়া হাসমতুল্লাহ শাহিদি বেশ ভালো স্ট্রাইক রোটেট করে খেলতে পারেন। আফগানিস্তানের অন্য দশজন ব্যাটসম্যানের মতো তিনি বিগ হিটিংয়ে খেলেন না, তাই দলীয় ইনিংস তৈরির ক্ষেত্রে তিনি বেশ কার্যকর হবেন।

  • দুর্বলতা

আফগানিস্তানের শক্তিশালী দিক যেখানে, দূর্বলতাও সেখানে। ব্যাটিংয়ে ধরে খেলা ব্যাটসম্যানের বড্ড অভাব। সেট হওয়ার আগেই ভুলভাল শট খেলে উইকেট বিলিয়ে দিয়ে আসা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এক আসগর আফগান এবং আরেক হাসমতুল্লাহ শাহিদি ছাড়া কেউই এই দলে নির্ভরযোগ্য না।

দ্বিতীয় দুর্বলতা দলের পেস আক্রমণে। বর্তমানে আফগান স্কোয়াডে যেসব ফার্স্ট বোলাররা আছেন তারা খুব একটা ভালো রিদমে নেই। গতি বাড়াতে গিয়ে লাইন লেন্থ মিস করছে, দু’হাত ভরে রান গুনছে। ইংল্যান্ডের ব্যাটিং ট্র্যাকে বড় দলগুলোর সাথে এই সিম অ্যাটাক কতটা কার্যকর হবে তা যথেষ্ট প্রশ্নবিদ্ধ।

বিশ্বকাপের মাসখানেক আগেই তিন ফরম্যাটের অধিনায়ক পাল্টেছে আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (এসিবি)। আসগর আফগানের জায়গায় ওয়ানডের অধিনায়ক এখন গুলবাদিন নাইব। তবে, এটা করতে গিয়ে অনেক রকম ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে এসিবিকে। টুইটারে প্রকাশ্যে সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন রশিদ খান ও মোহাম্মদ নবী। অন্যদিকে, বিশ্বকাপের পরেই দলের কোচের পদ থেকে পদত্যাগ করার আগাম ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন ক্যারিবিয়ান কোচ ফিল সিমন্স। এই অবস্থায় একটা দলের বিশ্বকাপের মত চ্যালেঞ্জিং জায়গায় পারফরম করা খুব শক্ত।

এছাড়া আফগানিস্তানের ফিল্ডিং খুবই বাজে। এদের ফিটনেস লেভেলও খুব একটা ভালো না। অফফর্মে থাকা পেস অ্যাটাকের সাথে যদি বাজে ফিল্ডিং কপালে জোটে, তাহলে আফগানদের কপালে এটি বড় দুঃখ বয়ে আনবে।

  • প্রেডিকশন

যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশের মানুষেরা যেখানে প্রতিটি দিন আতংকের মধ্য দিয়ে কাটাতো, আজ সেখানে তারা এই ব্যাট-বলের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ এবং আনন্দ খুজেঁ পেয়েছে। ক্রিকেটে তাদের উথানের পটভুমি যেন রূপকথার গল্পকেও হার মানায়! মাত্র দশ বছরের ব্যবধানে তারা এমন এক পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে, এমনটি কেউ কল্পনাও করেনি। এখন প্রতিনিয়ত বড় দলগুলোকে তারা বিপদে ফেলে, চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়।

আফগানদের আত্মবিশ্বাস রীতিমত আকাশ ছুয়েছে। বড় বড় দলগুলোকে উড়িয়ে দিবে, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, উইন্ডিজ, শ্রীলঙ্কাকে পাত্তাই দিবে না – এমন সব কথাবার্তা তারা বলে বেড়াচ্ছে। আফগান উইকেট কিপার ব্যাটসম্যান তো সরাসরি বলেই ফেললেন, কোহলিকে বাদ দিকে আফগানিস্তান এবং ভারত একই মাপের দল!

এখানে সেরকম কোনো মাপকাঠি ধরছি না। কথা বলছি বিশ্বকাপে আফগানদের সম্ভাবনা নিয়ে। তাদের প্রথম ম্যাচ অস্ট্রেলিয়ার সাথে, দুই জুন। হয়তো তারা ধারাবাহিক ভালো খেলতে পারবে না, তারা যে একটি অঘটন ঘটাবে, এ ব্যাপারে বেশ আশাবাদী। নিজেরা হয়তো সেরা চারে এ জায়গা পাবে না, তবে যে কোনো ফেবারিটকে টক্কর দেওয়ার সামর্থ্য তাদের আছে। তাই প্রতিভায় ভরা এই দল থেকে এ আসরের সবগুলো দলকেই সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। হেলায় উড়িয়ে দিলে এই আফগানেরা আপনার সাজানো বাগান নষ্ট করতে মোটেও সময় নিবে না!

  • আফগানিস্তানের বিশ্বকাপ স্কোয়াড

মোহাম্মদ শাহজাদ (উইকেটরক্ষক), হযরতুল্লাহ জাজাই, হাসমতুল্লাহ শাহিদি, আসগর আফগান, নাজিবুল্লাহ জাদরান, নূর আলি জাদরান, মোহাম্মদ নবী, সামিউল্লাহ শিনওয়ারী, গুলবাদিন নাইব (অধিনায়ক), রশিদ খান, রহমত শাহ, হামিদ হাসান, দৌলত জাদরান, মুজিব উর রহমান, আফতাব আলম।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।