‘আমি এখানে নাচতে আসিনি!’

এটা আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ রাতের গল্প। এটা ব্যালন ডি’ অর-এর জমকালো অনুষ্ঠানের গল্প। সেদিনের সুখস্মৃতি আমার হৃদয়ের মাঝে আজীবন অনির্বাণ শিখার মত জ্বলবে, এমনকি দুইশ বছর বাঁচলেও তা এতটুকু ম্লান হবে না!

এই স্মৃতির সাথে নাচের কোন সম্পর্ক নেই।

শুধুই শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে সম্পর্কিত।

এবং অবশ্যই রবার্তো কার্লোস, কিলিয়ান এমবাপে এবং মারিও বালোতেলি!

অবশ্য, গল্পের শুরুটা হয়েছে ব্যালন ডি’ওর অনুষ্ঠানের ঠিক দুই সপ্তাহ আগে। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত অতি সাধারণ একটি বাক্য দিয়ে ঘটনার সূত্রপাত!

‘এডা, তুমি কি একটি কথা গোপন রাখতে পারবে?’

সেদিন অলিম্পিক লিঁও’র একজন সহকারী কোচ আমাকে তাঁর অফিসে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। ট্রেনিং শেষে আমি তাঁর সাথে দেখা করতে গেলাম।

তিনি বললেন, ‘শোন, কথাটা কিন্তু কাউকে বলতে পারবে না!’

আমি বললাম, ‘ঠিক আছে!’

তিনি আবার বললেন, ‘সত্যি বলছ তো কাউকে বলবে না?’

আমি কথা দিলাম, ‘হ্যাঁ, আমি কাউকে কিচ্ছু বলবো না!’

ঠিক তখনই সেই জীবন বদলে দেয়া বাক্যটি বললেন, ‘তুমি ব্যালন ডি’ অর জিততে চলেছ!’

কথাটা শোনার পর আমার চোখের সামনে সিনেমার স্লাইডের মত যেন হাজার হাজার ছবি ভেসে উঠতে লাগল! এটা শুধুই একটি ব্যালন ডি’অর নয়, ফুটবলের ইতিহাসে প্রথমবারের মত মেয়েদের জন্য ব্যালন ডি’ওর! কী একটা অবস্থা! কী করব বুঝতে না পেরে আমি একই সাথে হাসতে এবং কাঁদতে লাগলাম!

কোচ শেষবারের মত জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কথাটা গোপন রাখবে, হ্যাঁ?’

আমিও বললাম, ‘অবশ্যই কোচ! অবশ্যই!

ঠিক দশ মিনিট গোপন রাখতে পেরেছিলাম! গাড়িতে চড়েই বাবা-মা এর সাথে ভিডিও কল শুরু করলাম। তাঁরা আমার বড় বোন এন্ড্রিন এর সাথে দেখা করতে প্যারিস গিয়েছেন। সে মুহূর্তে তাঁরা প্যারিসের রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করছিলেন। ফোনের ক্যামেরা ঘুরিয়ে আমাকে কোন এক বুলেভার্দ দেখাচ্ছিলেন। যেন বলতে চাইছিলেন – ‘দেখেছো সোনা, প্যারিস কত সুন্দর!’

আমি বাঁধা দিয়ে বললাম, ‘মা, কী হয়েছে শুনলে বিশ্বাস করবে না!’

মা সাথে সাথে ক্যামেরা ঘুরিয়ে নিজের দিকে নিলেন। দেখলাম তাঁর মুখে দুশ্চিন্তায় ছাপ দেখা দিয়েছে। জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী হয়েছে?! তুমি ঠিক আছো তো, মা!’

আমি কোন ভূমিকা না করে সরাসরি বললাম, ‘মা, আমি ব্যালন ডি’ অর জিততে চলেছি!’

কথাটা শুনেই মা কান্না শুরু করলেন! ওদিকে বাবাকে দেখলাম অবিশ্বাসে মাথা নাড়ছেন!

ফোন রাখার পর আমি বেশ খানিকক্ষণ গাড়িতেই চুপচাপ বসে রইলাম! এটা কি সত্যি, নাকি স্বপ্ন?! এটা অবশ্যই কোন স্বপ্ন!

অনেকটা ঘোরের মধ্যেই পরবর্তী দুই সপ্তাহ কাটল। আমি রাতে ঠিকমত ঘুমাতেও পারতাম না! অবশ্য, অনুশীলন করার সময় মাথায় এসব কিছুই থাকত না। এটাই ফুটবলের মাহাত্ম্য! আপনার জীবনে যাই ঘটুক না কেন- পায়ে বল নিলে আপনি সব ভুলে যাবেন! তবে, অনুশীলন শেষে নিজের গাড়িতে বসার পর আবার সবকিছু ফিরে আসত!

তুমি ব্যালন ডি’অর জিতেছ! এ হতেই পারে না! তুমি তো নরওয়ের ছোট্ট একটা গ্রামের অতি সাধারণ এক মেয়ে! এটা নির্ঘাত কোন স্বপ্ন!

বাবা প্রায়শই একটি গল্প মজা করে সবাইকে শোনান। আবার ছেলেবেলার গল্প।

আমাদের পরিবার ফুটবল পরিবার বললে এতটুকু ভুল হবে না। আমার বাবা-মা দুজনই ফুটবল কোচ, আর আমার বড় বোন অসাধারণ একজন খেলোয়াড়। আমি ওর চেয়ে দুই বছরের ছোট। ছোট বেলায় দেখতাম ও ফুটবল নিয়ে খেলছে, আর আমি হয়ত তখন বারান্দার সিঁড়িতে বসে বই পড়তাম। ফুটবলের প্রতি আমার কোন আগ্রহই ছিল না।

আমার বোন ছেলেদের দলে খেলত, শুধু তাই নয়, ও ছিল দলের অধিনায়ক! কোচ কে ছিলেন জানেন? আমার মা! আসলে মাত্র ৭ হাজার মানুষের আমাদের ছোট্ট মফস্বল শহরটি এতটাই অসাধারণ ছিল। কেউ ছেলে-মেয়ের ভেদাভেদ করত না। এজন্যই আমার বোনের অধিনায়ক হওয়া বা আমার মায়ের কোচ হওয়া ছিল খুবই সাধারণ ঘটনা।

ফুটবল খেলাটি ছেলে বা মেয়েদের খেলা ছিল না। এটা ছিল শুধুই ফুটবল।

যাই হোক, একদিন মাঠের পাশের ঘাসে বসে বোনের খেলা দেখছিলাম। কোন এক খেলোয়াড়ের অভিভাবক আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কি বড় হয়ে তোমার বোনের মত ফুটবলার হতে চাও?’

আমি সম্ভবত কোন বই পড়ছিলাম। তাই প্রথমে খেয়াল করি নি। কিছুক্ষণ ভেবে বিরক্তি সাথে উত্তর দিয়েছিলাম, ‘নাহ! বড় হয়ে আমি সত্যিকারের কোন কাজ করতে চাই!’

আমার বাবা এখনও এই গল্প বলে আমাকে খোঁচান। অথচ, এটা কিন্তু খুবই যুক্তিসঙ্গত উত্তর ছিল। কেননা, আমরা নরওয়ের মানুষজন অন্যদের তুলনায় একটি বেশিই বাস্তববাদী!

অবধারিতভাবেই আমার বদলে যেতে খুব বেশি সময় লাগেনি! ফুটবল খেলা শুরু করা মাত্রই এর প্রেমে পড়ে গেলাম। বুঝে গেলাম এটি আমার জন্য স্রেফ বিনোদন নয়, একেবারে জীবন-মরণ টাইপ কিছু! আমি থিয়েরি অঁরি’র মত হতে চেয়েছিলাম-সবদিক দিয়ে একজন পরিপূর্ণ ফুটবলার। আমি চেয়েছিলাম ঘর ছেড়ে দেশ এবং দেশের বাইরে ফুটবল খেলব। একজন গ্রেট ফুটবলার হওয়াটাই হয়ে উঠল আমার একমাত্র স্বপ্ন।

আমার বয়স ১১ বছর হবার পর একদিন বাবা আমাকে বললেন, ‘তুই যদি সত্যিই ফুটবল নিয়ে থাকতে চাও আমরা তোমাকে শতভাগ সমর্থন করব। তোমার জন্য আমরা যে কোন কিছু করতে রাজি আছি। তবে সবার আগে নিশ্চিত কর তুমি আসলেই এটা চাও কী না…’

আমি বাবাকে আশ্বস্ত করে বললাম যে কোন কিছুর বিনিময়ে আমি ফুটবলার-ই হতে চাই। শতভাগ নয়, একেবারে হাজার ভাগ (!) নিশ্চয়তা দিলাম!

নাহ, টাকা-পয়সার জন্য সিদ্ধান্তটি নিই নি। সত্যি কথা বলতে কী, মেয়েদের খেলায় কখনই টাকার ঝনঝনানি ছিল না। ফুটবল এবং ফুটবলের প্রতি নিখাদ ভালবাসাই আমাকে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছিল। কখনও কোন ম্যাচ হেরে গেলে সাইকেল চালিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরতাম। বাচ্চাদের খেলার ফলাফল নিয়ে নরওয়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কে-ই বা মাথা ঘামায়! কেউই তেমন গুরুত্বের সাথে নিত না।

কিন্তু আমার কাছে ওসব ম্যাচই ছিল মহা গুরুত্বপূর্ণ।

যেসব মেয়ে আমার এই লেখাটি পড়ছে তাদেরকে বলতে চাইঃ নিজের ভেতরের আগুনকে নিভতে দিও না। তোমার স্পৃহাকে কেউ যেন ছিনিয়ে নিতে না পারে। যদি তোমার কোন স্বপ্ন থাকে তাহলে এই আগুন, এই স্পৃহাই তোমাকে সেই স্বপ্ন পূরণে সহায়তা করবে।

শুধু প্রতিভা দিয়ে কিছু অর্জিত হয় না। এমনকি ধৈর্য দিয়েও সব পাওয়া যায় না। তোমাকে প্রতিটি পদে পদে পরীক্ষা দিতে হবে, সহ্যের শেষ সীমা পর্যন্ত কষ্ট করতে হবে। খেলাধুলার সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছতে ছেলেদের যেমন পরিশ্রম করতে হয়, তোমাকেও সেরকম পরিশ্রম করতে হবে। শুধু তাই নয়, বিনিময়ে পারিশ্রমিকও মিলবে তুলনামূলক-ভাবে অনেক কম!

তুমি কাঁদবে, কষ্টের চোটে বমি করবে, শরীরের প্রতিটি ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে ব্যথা করবে। ১৭ বছর বয়সে আমি দেশের বাইরে খেলতে যাই, পশ্চিম জার্মানির টারবাইন পোস্টড্যাম ক্লাবের হয়ে খেলতে। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম খেলার পাশাপাশি হাইস্কুলের পড়াও চালিয়ে যাব। এজন্য দুটোই একসাথে করতাম।

আমাদের দিনে তিনটি সেশন অনুশীলন করতে হত।

প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় বরফের মধ্যেও ট্রেনিং করতে হত, কোন মাফ ছিল না।

অত্যন্ত কঠিন জীবন। কোচরা আমাদেরকে সহ্যের শেষ সীমা পর্যন্ত খাটিয়ে মারতেন।

এত কষ্ট সত্ত্বেও আমরা বিন্দুমাত্র ফাঁকি দিই নি। নিজের সর্বস্ব উজাড় করে অনুশীলন করেছি। দিনের পর দিন। কোন অজুহাত নেই, কোন অভিযোগ নেই। আসলে অভিযোগ করার মত অবস্থাও ছিল না। রাতে নিজের ঘরে ফিরে এতটাই ক্লান্ত-শ্রান্ত থাকতাম যে সন্ধ্যে সাতটার মধ্যেই মরার মত ঘুমিয়ে পড়তাম! হোমওয়ার্ক, বই-খাতা চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকত!

এই কষ্টের মুহূর্তগুলো, এই ত্যাগ কেউ খেয়াল করে না।

নারী-পুরুষের সমতা নিয়ে আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতে পারি। ফুটবলের বা আমাদের সামাজিক উন্নয়নের জন্য কী কী করা দরকার সেই বিষয়েও কথা বলতে পারি। কিন্তু সবার আগে যা প্রয়োজন তা হল আমাদের প্রতি, আমাদের কাজের প্রতি সম্মান।

হ্যাঁ, সম্মান।

আমি নিজেকে কখনোই নারী ফুটবলার মনে করি না। এমনকি যখন নরওয়ের ছোট্ট গ্রামে ছিলাম তখনও না। জার্মানি প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় যখন কঠোর পরিশ্রম করতাম তখনও না। এমনকি লিঁও’তে যোগ দেয়ার পরও নয়।

আমি সবসময়ই নিজেকে ফুটবলার ভাবতাম। শুধুই ফুটবলার। ব্যাস! ছেলে-মেয়ে সবাইকে একই অভিজ্ঞতা, কষ্ট এবং পরিশ্রম করতে হয়। একই রকম ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। স্বপ্নের পেছনে ছুটতে গিয়ে পরিবার-বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজন দূরে রেখে এগিয়ে যেতে হয়।

তা,ই সবার আগে আমাদের দরকার যোগ্য সম্মান।

আমি অনেক সৌভাগ্যবান যে অলিম্পিক লিঁও’র মত বিশ্বের অন্যতম সেরা ক্লাবের হয়ে খেলার সুযোগ পেয়েছি। এখানে সবাই তার কাজের প্রাপ্য সম্মান পায়। ছেলে বা মেয়েদের দল বলে আলাদা কেউ কিছু ভাবে না। আসলে মেয়েদের ক্রীড়াঙ্গনের সার্বিক উন্নতির জন্য জন মাইকেল অলাস এর মত দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ বেশি বেশি দরকার। তিনি জানেন মেয়েদের জন্য বিনিয়োগ করলে সেটি ক্লাব তো বটেই, সেই শহর এবং সকল খেলোয়াড়ের জন্যও মঙ্গলজনক।

আপনি যদি বিশ্বমানের বিনিয়োগ করেন, তাহলে বিশ্বমানের ফলও পাবেন!

ব্যালন ডি’ অর-এর মনোনীত প্রার্থীদের প্রাথমিক তালিকা যখন প্রকাশ করা হল তখন দেখা গিয়েছিল আমাদের ক্লাব থেকেই ৭ জন ছিল! ১৫ জনের মধ্যে ৭ জনই লিঁও’র! এটা শুনে আমার যে কী গর্ব হচ্ছিল তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়! এই স্বীকৃতিই প্রমাণ করে জনাব অলাস কী অসাধারণ দক্ষতার সাথে তাঁর ক্লাব পরিচালনা করছেন! আমার ফুটবল নৈপুণ্য পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হয়েছে লিঁও’র পেশাদার পরিবেশের কারণেই।

ক্লাবের ছেলে খেলোয়াড়দের পরিচয় ছিল আমাদের সতীর্থ হিসেবে। এর চেয়ে কম বা বেশি কিছু নয়। আসলে জীবনের সর্বস্তরেই তো এমনটিই হওয়া উচিত, তাই না? প্রতিটি নারীই অন্য যে কোন পুরুষ খেলোয়াড়ের মত সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকার রাখে।

পৃথিবীর সকল ফুটবল ফেডারেশনকে লক্ষ্য করে বলছি, আপনার শুনছেন কি?

আমরা কিন্তু আরও ভাল করতে পারি।

ঠিক এই কারণেই ২০১৮ সালের ব্যালন ডি’ অর অনুষ্ঠানটি ব্যক্তি এডার চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আসলে এটা আমার নিজের কোন মুহূর্ত নয়। এটা আমাদের মুহূর্ত! পৃথিবীর সকল নারী খেলোয়াড়ের মুহূর্ত।

এসব চিন্তা করেই আমি দুই সপ্তাহ ঘুমাতে পারতাম না।

এই কারণেই আমি যখন অনুষ্ঠানে পৌঁছলাম উত্তেজনায় আমার হৃদপিণ্ড যেন লাফাচ্ছিল! কিন্তু সেই মুহূর্তেই এক অভাবনীয় ঘটনা ঘটল। যা আমি আগামী ২০০ বছর ধরে মনে রাখব!

নিজের আসনে মাত্র বসেছি, বসার পরপরই চেয়ারের পেছনে মৃদু টোকার শব্দ কানে এলো। পাশাপাশি আরও শুনতে পেলাম, ‘এডা, এই এডা!’

আপনাদের মনে আছে প্রাইমারি স্কুলে থাকতে সামনের বা পাশের বন্ধুর চেয়ারে টোকার মেরে তাকে ডেকে নিচু গলায় গোপন কথা বলতাম?! এটা অনেকটা সেরকমই মনে হচ্ছিল!

আমি পেছনে ঘুরে তাকালাম। দেখতে পেলাম রবার্তো কার্লোসকে! গাল ভর্তি হাসি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, ‘এডা! আবার দেখা হয়ে গেল!’

আমি ২০১৬ সালের উয়েফা উইমেন’স প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার জিতেছিলাম। সেই পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানেও রবার্তো আমার ঠিক পেছনের চেয়ারে বসেছিল। সেই রাতে আমরা অনেক আলাপ করেছিলাম। দারুণ মজার এক অভিজ্ঞতা হয়েছিল, কেননা আমরা কথা বলেছিলাম ইংরেজি, স্প্যানিশ, পর্তুগিজ মিশিয়ে। এমনকি মাঝে মাঝে হাতের ইশারাতেও আলাপ চালিয়েছি!

ওই টুকু সময়েই আমাদের মধ্যে দারুণ বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। মেয়েদের ফুটবলের প্রতি ওঁর গভীর শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে। পাশাপাশি ও একজন অসাধারণ মজার মানুষ। এজন্য ওকে দেখেই আমি সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কথা শুরু করলাম। আমার ভেতরের সকল ভয়, আশঙ্কা দূর হয়ে গেল। অনেকটাই রিল্যাক্সড বোধ করতে লাগলাম।

বুঝতে পারলাম আমি ভালবাসা এবং সম্মানে পরিবেষ্টিতে হয়ে রয়েছি। আমি আমার মতই অসংখ্য ফুটবলার দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে রয়েছি, যাদের অনেকেই আবার একেকজন লিজেন্ড! যাঁরা ফুটবলের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন এবং অন্যের ত্যাগের মর্ম বোঝেন।

আমি খুশির চোটে হাসি থামাতেই পারছিলাম না!

শেষ পর্যন্ত পুরস্কার গ্রহণ করার জন্য যখন মঞ্চে উঠলাম তখনও আমি শান্ত-সমাহিত বোধ করছিলাম। সবকিছু একেবারে নিখুঁত ও সুন্দরভাবে হয়ে গেল। দর্শকের সারিতে তাকিয়ে দেখলাম অসাধারণ সব ফুটবলারের সমন্বয়ে যেন চাঁদের হাট বসেছে! ছেলে, মেয়ে সবাই পাশাপাশি বসে রয়েছে।

কী অসাধারণ সুন্দর একটি মুহূর্ত!

এই দারুণ মুহূর্তটি আমি উপস্থাপকের ফালতু কৌতুকের কারণে ম্লান হতে দেবো না! বিশ্বাস করুন, ওই কারণে আমার মুহূর্তটি নষ্ট হয় নি। আমার স্মৃতিতে কোন নোংরা দাগও পড়ে নি।

সবচেয়ে দারুণ ঘটনাটি হয়েছিল নিজের আসনে ফেরার পর। আমি বুঝতে পারছিলাম না ট্রফিটি কোথায় রাখবো! এটা আকারে বেশ বড়, ফলে পুরোটা সময় কোলে নিয়ে বসে থাকতে চাইছিলাম না।

বেশি চিন্তা না করে একেবারে নরওয়েজিয়ান স্টাইলে সিদ্ধান্ত নিলাম। চট করে ট্রফিটি চেয়ারে নিচে মেঝের উপর রেখে দিলাম!

সাথে সাথে আবার চেয়ারে টোকা!

-এডা! এডা! করছ কী তুমি?!

-কেন কি হয়েছে, রবার্তো?

-আরে! তুমি ঐটা মেঝের উপর রাখলে?! ওটা তো ব্যালন ডি’অর!

-রবার্তো, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না ওটাকে কোথায় রাখবো!

-আচ্ছা ঠিক আছে, আমাকে দাও। আমি ওটাকে নিরাপদে রেখে দিচ্ছি।

তিনি দুই হাত বাড়িয়ে দিলেন। মনে হল যেন বলছেন, ‘বাচ্চাটিকে আমার কাছে দাও, আমি কোলে নিয়ে নিয়ে বসে থাকবো!’

ওঁর ভাবসাব দেখে আমি হাসতে হাসতে প্রায় গড়িয়ে পড়েই যাচ্ছিলাম! চেয়ারের নিচে থেকে ব্যালন ডি’ওর’ টি রবার্তোর হাতে দিলাম। পুরো অনুষ্ঠান তিনি সেটাকে হাতে নিয়ে বসে রইলেন। আগলে রাখলেন!

রবার্তো কার্লোস!

তখনও মাঝে মাঝে ভাবছিলাম, এটা কী সত্যি? নাকি কোন স্বপ্ন!

অনুষ্ঠানের একেবারে শেষে সকল বিজয়ীকে একসাথে স্টেজে ডেকে নেয়া হল, ছবি তোলার জন্য। আমি, লুকা মড্রিচ এবং কিলিয়ান এমবাপে। এমবাপে পেয়েছে অনূর্ধ্ব-২১ শিরোপা, অসাধারণ একটি ছেলে। আমি এসময় হালকা কৌতুক করে বললাম, ‘কিলিয়ান, ভাল করে ইংরেজি চর্চা করবে। আগামী বছর আসল ট্রফি জিতে বক্তৃতা দিতে হবে কিন্তু!’

সবাই হেসে উঠেছিল। আমার মন্তব্যে সবাই মজা পেয়েছিল।

আহ! কী অসাধারণ মুহূর্ত! একই মঞ্চে মড্রিচ এবং এমবাপের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছি আর সামনে অনবরত ক্যামেরার ফ্ল্যাশ জ্বলছে! আমরা হাসছি! এর চেয়ে সুন্দর মুহূর্ত আর কী-ই বা হতে পারে! নিঃসন্দেহে আমার জীবনের সেরা রাত! শুধু পুরস্কারের জন্য নয়, যে সম্মান আমি পেয়েছি সেটার জন্য। যে সম্মান পাওয়ার স্বপ্ন আমি সারাজীবন দেখে এসেছি!

অনুষ্ঠান শেষ হতে বেশ রাত হয়ে গিয়েছিল। সব কিছু শেষ হবার পর পরিবারের সকলে মিলে আমরা প্যারিসের নির্জন রাস্তায় হাঁটছিলাম। আমার হাতে ছিল ব্যালন ডি’ওর ট্রফি। আর্ক ডি ট্রায়াম্ফ এর কাছে থেমে অনেকগুলো ছবি তুললাম। ছবি তোলা শেষে বুঝতে পারলাম আমাদের সবারই ভয়ানক খিদে পেয়েছে।

তখন প্রায় মাঝরাত, ফলে বেশিরভাগ রেস্টুরেন্টই বন্ধ হয়ে গেছে। অনেকক্ষণ হাঁটার পর অবশেষে ছোট্ট একটি ইরানি রেস্টুরেন্ট খুঁজে পেলাম। খদ্দের কেউ ছিল না বললেই চলে, তবে একজন গায়ক সজোরে গান গাচ্ছিলেন।

আমরা একটি টেবিল বেছে নিয়ে বসলাম। কাবাব এবং রাইস অর্ডার করে গান শুনতে লাগলাম। পাশাপাশি চলল পুরনো দিনের হাজারো মুহূর্তের স্মৃতিচারণ। হঠাৎ ফোন চেক করে দেখি পাগলের মত অবস্থা! উপস্থাপকের ফালতু কথা বিষয়ক হাজারো বার্তা জমা হয়ে গেছে। আমি বুঝতেই পারিনি ওটা ভাইরাল হয়ে যাবে। সকলের কাছ থেকে সমর্থন এবং সহমর্মিতামূলক বার্তা পেয়েছি। এমনকি মারিও বালোতেলি পর্যন্ত মুঠো বার্তা পাঠিয়েছে! ওটা দারুণ একটি সারপ্রাইজ ছিল। তবে, সত্যি কথা বলতে সেই রাতে অত কিছু পড়ে দেখিনি। পরেরদিন পড়েছি।

সেই রাতে আমি অন্য কোন কিছু নিয়েই চিন্তা করতে চাই নি।

সবাই মিলে দারুণ সময় কাটিয়েছি।

যাই হোক, খাওয়া শেষে ওয়েটার এসে আমাদেরকে খাবারের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করল। আরও জানতে চাইলো আমার সাথের কালো বাক্সটিকে কী রয়েছে।

আমার মা অত্যন্ত সহজভঙ্গিতে বলল, ‘ওহ ওটা?! এমন কিছু নয়। ব্যালন ডি’অর ট্রফি!’

সবার অনুরোধে বাক্সটি খুলে সবাইকে ট্রফিটি দেখালাম। উপস্থিত সবাইকে নিয়ে ছবি তুললাম। দূর থেকে কেউ দেখলে নিশ্চয়ই অবাক হত। একদল নরওয়েজিয়ান, ইরানি, পার্সিয়ান…একজন হাসিখুশি গায়ক…এবং একটি ব্যালন ডি’ অর ট্রফি!

তো, যা বলছিলাম…আমি দুঃখিত যে আমি টোয়ার্ক (Twerk) করতে পারি না!

কিন্তু আপনি যদি কোন সুন্দর রাতে, আনন্দময় মুহূর্তে ইরানি পপ সঙ্গীত ছেড়ে দিয়ে আমাকে গলা মেলাতে বলেন…আমি হয়ত হেঁড়ে গলায় কণ্ঠ মিলিয়ে গানও ধরতে পারি!

ও হ্যাঁ, আর আমি কিছুটা ফুটবল খেলতেও জানি!

_______________

‘দ্য প্লেয়ার্স ট্রিবিউন’-এ কলামটি লিখেছেন এডা হেগেরবার্গ, ২০১৮ সালের ব্যালন ডি’অর জয়ী নরওয়ের নারী ফুটবলার।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।