পুতুলের মত সেই মিষ্টি মেয়েটি

২০০৭ সালের কথা। তখনও বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে ধারাবাহিক নাটকের জয়জয়কার চলছে। অতি বিজ্ঞাপনের মাঝেও দর্শকরা আগ্রহ সহকারে দেখতো। তেমনি একটি ধারাবাহিক নাটক ছিল ‘স্বপ্নচূড়া’।

গল্পের দিক দিয়ে বিশেষ কিছু না হলেও এই নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘অপর্ণা’র কাণ্ডকারখানা দেখার জন্য দর্শকরা অপেক্ষায় থাকতেন। অপর্ণার বাংলা-হিন্দি’র মিশেলে বলা সংলাপগুলো দর্শকরা উপভোগ করতেন। অপর্ণা চরিত্রে অভিনয় করা সেই অভিনেত্রীটি রাতারাতি হয়ে যান দর্শক নন্দিত তারকা।

অভিনয়ের পাশাপাশি তাঁর মিষ্টি হাসির ভক্ত ছিলেন অনেকেই। স্বপ্নচূড়ার গৃহবধূ অপর্ণা থেকে অভাবের মাঝেও স্বপ্নে বিভোর ললিতা কিংবা হাউজফুলের বড় মেয়ে শিমু সব চরিত্রেই নিজেকে সমাদৃত করা এই জনপ্রিয় অভিনেত্রী হলেন আমাদের সবার প্রিয় সুমাইয়া শিমু।

‘এই মেয়েটি তো একেবারে পুতুলের মত’ – প্রথম অভিনয়ের দিনই তাঁকে দেখে এমন মন্তব্য করেছিলেন গুণী অভিনেত্রী ডলি জহুর। ১৯৯৯ সালে চ্যানেল আইয়ের প্রথম নাটক অরণ্য আনোয়ারের ‘এখানে আতর পাওয়া যায়’-তে প্রথম অভিনয় করেন সুমাইয়া শিমু।

টিভি নাটকের তখন যেমন স্বর্ণযুগ ছিল, তেমনি জনপ্রিয় অভিনেত্রী ও ছিলো বেশ। তাই নাটকে শুরুতেই জনপ্রিয়তা পাওয়া বেশ কষ্টসাধ্য। তবে, সততার সাথে লেগে ছিলেন শিমু।

‘আজ তোমার মন খারাপ মেয়ে’ – বাপ্পা মজুমদারের এই ‘পরী’ গানের মডেল হয়ে আলোচনায় চলে আসেন সুমাইয়া শিমু। এর সাথে চিত্রনায়ক রিয়াজের সঙ্গে ইউরো অরেঞ্জের বিজ্ঞাপন ও টেলিফিল্ম ‘কুড়িয়ে পাওয়া সুখ’ও দারুন জনপ্রিয়তা পায়। এছাড়া তিব্বত পমেডের বিজ্ঞাপন, অরুণ চৌধুরীর ‘গোলাপ কেন কালো’-সহ বেশ কিছু আলোচিত ছিল। ইত্যাদিতে সেলিম চৌধুরীর গাওয়া ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর’ গানেও মডেল হয়েছিলেন।

অবশেষে মাহেন্দ্রক্ষণ আসে ‘স্বপ্নচূড়া’ দিয়ে। এটাই তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে জনপ্রিয় কাজ হিসেবে বিবেচিত। এই নাটকের তুমুল জনপ্রিয়তার পর সুমাইয়া শিমুর ব্যস্ততা বেড়ে যায় দ্বিগুণ। টিভি নাটকে নতুন করে উচ্চারিত হতে লাগলো তাঁর নাম। সুমাইয়া শিমুর বেশ কয়েকটি ধারাবাহিক নাটকগুলো জনপ্রিয় হয়েছিল এর মধ্যে ‘ললিতা’ ও ‘মহানগর’ অন্যতম।

জনপ্রিয়তার দিক থেকে ‘হাউজফুল’-ও পিছিয়ে নেই। বাড়ির বড় মেয়ে ‘শিমু’ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি। মোশাররফ করিম ও রেদোয়ান রনির সাথে তাঁর জুটি ছিল দারুণ জনপ্রিয়। যদিও হাউজফুলে মোশাররফ ও শিমু মামা-ভাগ্নীর চরিত্র করেছিলেন। এই জুটির ‘হ্যালো’ নাটকটি ভীষণ দর্শকপ্রিয় হয়েছিল। এছাড়া এই জুটির এফএনএফ, রেডিও চকলেট, বিহাইন্ড দ্য সিন, জিম্মি’র কথা না বললেই নয়।

মোশাররফ করিমের বিপরীতে সুমাইয়া শিমুকেই সবচেয়ে ভাল মানায়। এছাড়া মাহফুজ আহমেদের সঙ্গেও মানিয়ে যেতেন। ক্যারিয়ারে অন্যান্য নাটকের মধ্যে ‘ফুল একা একা ফোটে’, ‘প্রজাপতি মন’, ‘ঢং’, ‘খেলা’, ‘তৃতীয় নয়ন’ অন্যতম। একক নাটক ‘তক্ষক’-এও অভিনয় করেছেন।

স্বপ্নচূড়ায় দুর্দান্ত অভিনয়ের জন্য দর্শক জরিপে মেরিল প্রথম আলো পুরস্কার পেয়েছিলেন। ২০০৯ সালে পুরস্কার পান সেই ‘স্বপ্নচূড়া’ নাটকের জন্য। এর বাইরে ২০১০ থেকে ২০১২’র মধ্যে আরো পাঁচ বার মনোনয়ন পান।

অভিনয় জীবনের পাশাপাশি ব্যক্তিজীবনেও তিনি খুব উজ্জ্বল। ব্যস্ততার মাঝেও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করেছেন। পড়াশোনায় তিনি বেশ সিরিয়াস ছিলেন। নাটকল্যায় পিএইচডিও করা আছে তাঁর।

শিমুর জন্ম ১৯৮০ সালের ৩০ এপ্রিল। শৈশব কেটেছে নড়াইলে। বাবা হলেন সরকারী কর্মকর্তা আতিয়ার রহমান। মা লায়লা রহমান। শিমু ২০১৫ সালে বিয়ে করেন নজরুল ইসলামকে। বিয়ের পর থেকেই অভিনয়ে অনিয়মিত হয়ে যান তিনি।

খুব কম দর্শকই জানেন যে তাঁর সত্যিকারের নাম হল সুমাইয়া রহমান শিমুল। কাজ শুরু করার সময় কয়েকজন নির্মাতার পরামর্শে নামটা ছোট করে ‘শিমু’ রাখেন। তখন থেকেই দর্শকদের মনে তিনি ‘মিষ্টি হাসির শিমু’ নামে ঠাই পেয়ে গেছেন।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।