বেলাশেষে’র পদক্ষেপ

১৯৫৬ সাল, ‘নীলাচলে মহাপ্রভু’র অডিশনে ২১ বছরের যুবকটি হেরে গেলেন অসীম কুমারের কাছে। ১৯৫৭ সালে মুক্তি পাওয়া এই জনপ্রিয় ছবিতে শ্রীচৈতন্য রূপে অসীম কুমারের নাম তখন বাঙালির মুখে মুখে। সেই সঙ্গে দর্শক হৃদয় জয় করছেন বসন্ত চৌধুরী, নির্মলকুমার, অনিল চট্টোপাধ্যায়, বিশ্বজিৎ কিন্তু সকলের চেয়েই এক ধাপ এগিয়ে উত্তম কুমার!

১৯৫৯ সালে সেই হেরে যাওয়া যুবকটিই বিশ্বখ্যাত পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের ‘অপূর্ব’ হয়ে পদার্পণ করলেন বাংলা সিনেমার জগতে। চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লো, বাংলা চলচ্চিত্রে এসেছেন আরেক অপ্রতিদ্বন্দ্বী নায়ক, সেই ষাটের দশক থেকে আজ অবধি নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য পর্যায়ে, শেষ বয়স অবধি তিনি তরুণ নায়কদের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে থেকেছেন। তিনি ভারতীয় উপমহাদেশের কিংবদন্তি অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

তিনি সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ হতে পারেন নি, উত্তম হয়েও  ‘মহানায়ক’ খেতাব পান নি। কিন্তু হয়েছিলেন জীবনের নায়ক। নিয়মিত কফি হাউসে যেতেন, স্যুটবুট ছেড়ে ধুতি পাঞ্জাবি পরতেন স্বচ্ছন্দে। সত্যজিৎ রায়ের মধ্যমণি ক্রমান্বয়ে তপন সিংহ, মৃণাল সেন, তরুণ মজুমদার, অজয় কর, অসিত সেন, অপর্ণা সেন, ঋতুপর্ণ ঘোষ, গৌতম ঘোষ থেকে শিবু-নন্দিতা  সকল খ্যাতনামা পরিচালকদের অপরিহার্য নির্বাচন হয়ে উঠলেন।

বাঙালির আইকনিক ফেলুদা উটের পিঠে চেপে চোর ধরতে যান, এই ফেলুদা চরিত্র করে তিনি নিজেও পরিনত হয়েছেন আইকনে। বাংলা ছবিতে ‘সোনার কেল্লা’ ও ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ এক অনন্য সৃষ্টি। কাজ করেছেন সত্যজিতের ১৪ টি চলচ্চিত্রে, অপুর সংসার থেকে গনশত্রু-তে। মাঝে অশনী সংকেত, তিন কন্যা, দেবী, হীরক রাজার দেশে, অরণ্যের দিনরাত্রি, ঘরে বাইরে, শাখা প্রশাখা-সহ আরো বেশ কিছু চলচ্চিত্র।

উত্তম কুমারের সাথে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন ‘ঝিন্দের বন্দী’ চলচ্চিত্রে। সূচিত্রা সেনের রুপের মোহে তিনি কখনোই আটকা পড়েননি, কিন্তু ‘সাত পাকে বাঁধা’য় এই জুটির রসায়নে দর্শক ঠিকই মোহে আটকা পড়েছিল। উত্তম-সুচিত্রার বাইরে সৌমিত্র-অপর্ণা জুটিও দর্শকদের হৃদয়ে স্থান নিয়েছিল।

মাধবী, শর্মিলা, সাবিত্রী সবাই সাচ্ছন্দ্যে কাজ করেছেন তাঁর সাথে। এছাড়া তাঁর ক্যারিয়ারে আছে ক্ষুধিত পাষান, সংসার সীমান্তে, কোনি, উত্তরণ, দেবদাস, কাঁচ কাটা হীরে, অসুখ, পারমিতার একদিন, তাহাদের কথা, পদক্ষেপের মত চলচ্চিত্র। ২০১৭ সালের সর্বোচ্চ বাণিজ্যিক সফল সিনেমা ‘পোস্ত’র প্রধান অভিনেতা তিনি,’ময়ূরাক্ষী’তেও ছিলেন সমুজ্জ্বল। চলচ্চিত্র অভিনেতার বাইরেও রয়েছে তাঁর গুণ, তিনি একজন মঞ্চকর্মী, আবৃত্তিকার। তিনি নিজেও একজন কবি ছিলেন, তাঁর লেখা কবিতার বইও বের হয়েছে একাধিক।

সত্তরের দশকেই অর্জন করেছিলেন ‘পদ্মশ্রী’ সম্মাননা। কিন্তু তিনি তা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, পরবর্তীতে ২০০৪ সালে পান ‘পদ্মভূষণ’ আর ২০১২ সালে চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সম্মানজনক পুরস্কার ‘দাদা সাহেব ফালকে’-তে ভূষিত হন, পেয়েছেন ফ্রান্সের অন্যতম  সম্মানজনক পুরস্কার।

জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন তিনবার, অন্তধার্ন ও দেখা এর জন্য পেয়েছেন বিশেষ জুরি পুরস্কার,আর সবশেষে অধরা সেরা অভিনেতার পুরস্কারটি আসে ‘পদক্ষেপ’ এর মাধ্যমে। প্রখ্যাত এই অভিনেতাকে জুরি বোর্ড প্রায়শই এড়িয়ে গেছেন। ফিল্মফেয়ার পুরস্কার জিতেছেন চারবার। শেষটা এসেছে ২০১৭ সারের ছবি ‘ময়ুরাক্ষী’র জন্য।

হাসপাতালে যাওয়ার আগ পর্যন্ত দাপটের সাথে শ্যুটিং করে যাচ্ছিলেন। সেখান থেকে আর ফেরা হল না। ৪০ দিনের লড়াই শেষে তিনি ইতি টানলেন জীবন ক্যারিযারের। ১৯৩৫ সালে কৃষ্ণনগরে উকিল বাবা মোহিত কুমার চট্টোপাধ্যায়ের ঘরে জন্ম সৌমিত্রর। ২০২০-এ এসে তিনি ৮৫ বছর বয়সে বিদায় নিলেন কোটি ভক্তের ভালবাসার ভিড়ে।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।