চ্যালেঞ্জ নিতে জানা একজন ‘চ্যালেঞ্জার’!

‘কি করতেছো? মাটি খাইতেছো? খিদা বেশি লাগছে? আহারে! মাটি খাইতে কেমন? হুদা মাটি খাইতেছো নাকি লবন দিছো?’

‘জিনের বাদশার চেহারা অলম্বুষ, বড় বড় চোখ, যখন কথা কয় সিসের মতো শব্দ হয়, দাঁত নাই জিব্রা কালা। জিনের বাদশার মেজাজ ভালো থাকলে হাসি তামাশাও করে।’

হুমায়ূন আহমেদের অন্যতম সেরা ধারাবাহিক নাটক ‘উড়ে যায় বকপক্ষী’-এর দোতরা চাচার কথা নিশ্চয়ই আমাদের মনে আছে। জ্বিনে ধরা পাগল প্রায় জল চিকিৎসা নেয়া এই মানুষটি মজার মজার সংলাপ বলে দর্শকদের যেমন আনন্দ চিত্তে হাসিয়েছেন তেমন একেবারে শেষ দৃশ্যে যখন বলেন ‘পুষ্প, মাগো ওস্তাদ জালাল খাঁ সাহেব মারা গেছেন’ তখন অজান্তেই চোখে জল চলে আসে। এই দ্যোতরা চাচার চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করে দর্শকদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন প্রথিতযশা অভিনেতা চ্যালেঞ্জার।

আসল নাম এ এস এম তোফাজ্জল হোসেন। তিনি ছিলেন মূলত প্রেস ব্যবসায়ী। হুমায়ূন আহমেদের সাথে তাঁর পরিচয় হয় বাংলাবাজারে, বইয়ের দোকানে। অভিনয় শেখানোর জন্যই হুমায়ূন আহমেদ তাঁকে নিয়ে আসেন।

তখনই ‘চ্যালেঞ্জার’ নামটির সূত্রপাত হয়। এই নামেই তিনি আমাদের কাছে পরিচিত। জন্ম ১৯৫৯ সালের ১০ আগস্ট। প্রথম নাটক হুমায়ূন আহমেদের ‘হাবলঙ্গের বাজারে’। নাপিত রামেশ্বরের চরিত্রে স্বল্প সময়ের জন্য অভিনয় করেছিলেন।

মধ্য বয়সে অভিনয় জগতে এসেছিলেন। এরপর উড়ে যায় বকপক্ষী, চোর, খোয়াব নামা, যমুনার জল দেখতে কালো, বৃক্ষমানব-সহ তখনকার হুমায়ূন আহমেদের প্রায় সব নাটকেই তিনি অভিনয় করেছিলেন, বিশেষ করে বলতে হয় ‘পিশাচ মকবুল’ নাটকের কথা।

প্রথম ছবি ‘শ্যামল ছায়া’। মুক্তিযুদ্ধের এই ছবিতে সন্তানহারা এক বয়স্ক বাবার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। রাশভারি কিন্তু মমতায় ভরা চরিত্রে নিজের সেরাটা দিয়েছিলেন। এছাড়া অভিনয় করেছেন কাল সকালে, লাল সবুজ, নয় নম্বর মহা বিপদ সংকেত সিনেমায়।

বিশেষ করে বলতে হয় ‘দারুচিনি দ্বীপ’-এর কথা না বললেই নয়। অসাড় দেহ নিয়ে বিছানায় পড়ে থাকা দারিদ্র‍্যের কপাঘাতে পড়ে থাকা জরীর বাবার চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় করেছিলেন। প্রথমদিকে শুধু হুমায়ূন আহমেদের নাটকে অভিনয় করলেও পরবর্তীতে সবার নাটকেই অভিনয় করতে থাকেন। যেমন সালাউদ্দিন লাভলু, মাহফুজ আহমেদ বা ছবিয়ালের নাটকে। তার মধ্যে অন্যতম খেলা, চোরফাঁদ, বউ, এইম ইন লাইফ অন্যতম।

প্রথিতযশা এই অভিনেতা বড্ড অকালেই চলে গিয়েছিলেন। ২০১০ সালে মাত্র ৫১ বছর বয়সে মারা গিয়েছিলেন। অভিনয় করেছেন মাত্র আট বছর। এই স্বল্প সময়েই নিজের অভিনয় গুনে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে বাবা চরিত্রের যে ভালো অভিনেতার আকাল চলছে। তিনি বেঁচে থাকলে সেটা অনেকটাই পূরণ হতো। বাবার চরিত্রে তিনি দারুণ ভাবে মিশে যেতেন। অভিনেত্রী মনিরা মিঠু সম্পর্কে আপন বোন হন।

তাঁর অভিনয় দক্ষতা ছিল দারুণ। হুমায়ূন আহমেদ অভিনযের জন্য সঠিক লোকটিকেই খুঁজে বের করেছিলেন। সত্যিই, যেকোনো চরিত্র করার চ্যালেঞ্জ নিতে জানতেন এই চ্যালেঞ্জার!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।