দুর্যোগের ঘনঘটায় যিনি দিয়েছিলেন আশা

‘বাংলার আকাশে আজ দুর্যোগের ঘনঘটা, কে দেবে আশা কে দেবে ভরসা!’

বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এর চেয়ে ‘আইকনিক’ সংলাপ সম্ভবত নেই। এই সংলাপেই মনে পড়ে যায় বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার কথা। আর চরিত্রটিতে অভিনয় করে যিনি দর্শকদের মধ্যে চিরতরে ঠাঁই করে নিয়েছেন তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের মুকুটহীন নবাব খ্যাত কিংবদন্তি অভিনেতা আনোয়ার হোসেন।

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অভিনেতা হিসেবে তিনি অগ্রগণ্য। নিজের অভিনয়ে প্রতিভায় সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন নিজেকে। পার্শ্ব চরিত্র করেও নিজেকে কখনো ম্লান হতে দেননি। প্রথমদিকে অবশ্য বেশ কয়েকটি সিনেমায় নায়ক চরিত্রে অভিনয় করেছেন।

নবাব সিরাজউদ্দৌলা সিনেমার একটি দৃশ্য

প্রথম সিনেমা ‘তোমার আমার’। ১৯৬১ সালেরে এই সিনেমায় তিনি অবশ্য ছিলেন ভিলেন। নায়ক হিসেবে প্রথম সিনেমা ‘সূর্যস্নান’ বর্নাঢ্য ক্যারিয়ারে তাঁর সেরা সিনেমা হিসেবে বিবেচিত ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’তে অভিনয় করেছেন ১৯৬৭ সালে। এই সিনেমার পরপরই তিনি দর্শকদের মনে স্বাতন্ত্র্য ভাবে আসন পেতে নেন।

বাংলা চলচ্চিত্রের বেশকিছু ‘প্রথম’ এর সঙ্গে তিনি জড়িত আছেন।

স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা ‘মানুষের মন’ এর অন্যতম অভিনেতা তিনি। এমনকি স্বাধীনতার পর প্রথম যৌথ প্রযোজনার সিনেমা আলমগীর কবিরের বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘ধীরে বহে মেঘনা’ তেও তিনি অভিনয় করেছেন। প্রথম অ্যাকশনধর্মী সিনেমা ‘রংবাজ’-এরও অন্যতম অভিনেতা তিনি।

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জয়ী প্রথম সিনেমা নারায়ন ঘোষ মিতার ‘লাঠিয়াল’ এর প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেই উনিই প্রথম সেরা অভিনেতা হিসেবে ১৯৭৫ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। এছাড়া চলচ্চিত্র অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে প্রথম ব্যক্তিত্ব হিসেবে ১৯৮৮ সালে একুশে পদক অর্জন করেন। দেশের অন্যতম সেরা প্রেক্ষাগৃহ বলাকা সিনেওয়ার্ল্ড প্রদর্শিত প্রথম সিনেমা হল আনোয়ার হোসেন অভিনীত ‘দুই দিগন্ত’।

বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে জহির রায়হানের পরিচালনায় অভিনয় করেছেন ‘কাঁচের দেয়াল’ ও ‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমা। একজন স্বাধীনতাকামী চরিত্রে অভিনয় করে সমুজ্জ্বল হয়ে আছেন ‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমায় অভিনয় করে। মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’ তে তিনি নিজ চরিত্রেই অভিনয় করেন।

সরকারী অনুদান প্রাপ্ত সিনেমা ‘পেনশন’ এ একজন অবসর প্রাপ্ত সরকারী কর্মকর্তার চরিত্রে অভিনয় করে সবার চোখ ভিজিয়ে এনেছিলেন। নবাব সিরাজউদ্দৌলা ছাড়াও ঐতিহাসিক চলচ্চিত্র ‘শহীদ তিতুমীর’, ‘ঈশা খাঁ’তে অভিনয় করেছেন। ঐতিহাসিক সিনেমাতে নিজের আলাদা একটা স্থান গড়ে তুলেছিলেন তিনি।

‘আছেন আমার মোক্তার,আছেন আমার ব্যারিস্টার’ – সৈয়দ আব্দুল হাদীর গাওয়া এই গানটি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম সেরা একটি গান। বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ ব্যবহৃত জাতীয় পুরস্কারজয়ী এই গানে আনোয়ার হোসেনই ঠোঁট মিলিয়েছিলেন। পাশাপাশি অর্জন করে নেন সেরা সহ-অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।

জীবন থেকে নেয়া সিনেমার একটি দৃশ্য

পরবর্তীতে ‘দায়ী কে’ সিনেমার জন্যও তিনি একই পুরস্কারে ভূষিত হন। সর্বশেষ ২০১০ সালে পান আজীবন সম্মাননা পুরস্কার। বাংলা চলচ্চিত্রে আরেক যুগান্তকারী গান ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুশ’ও তাঁর কণ্ঠে পর্দায় ব্যবহৃত হয়।

এছাড়া ষাট, সত্তর ও আশির দশকে মুক্তিপাওয়া অন্যান্য চলচ্চিত্রের মধ্যে ‘অরুণ বরুণ কিরনমালা’, ‘এতটুকু আশা’, ‘আরাধনা’, ‘পালঙ্ক’, ‘নয়ন মনি’, ‘ভাত দে’, ‘রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত’, ‘দ্বীপ নেভে নাই’, ‘নীল আকাশের নিচে’ অন্যতম। দীর্ঘ পাঁচ দশক তিনি বাংলাদেশের সিনেমাকে সার্ভিস দিয়েছিলেন।

পরিতাপের বিষয় নব্বই দশক থেকেই তিনি ম্লান হতে থাকেন। একেবারেই ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করতে থাকেন, হয়তো সেটা আর্থিক দিক বিবেচনা করেই। তাঁর অভিনীত সর্বশেষ চলচ্চিত্র ‘ঘানি’। কাজী মোরশেদ পরিচালিত ২০০৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই সিনেমাটিও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়।

আনোয়ার হোসেনের জন্ম জন্ম ১৯৩১ সালের ৬ নভেম্বর জামালপুর জেলার মুরুলিয়া গ্রামের মিয়াবাড়িতে। বাবা এ কে এম নাজির হোসেন, তিনি ছিলেন সাব-রেজিস্টার। স্কুল জীবন থেকেই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে জড়ান আনোয়ার হোসেন। ১৯৫১ সালে ম্যাট্রিক পাশ করেন, ভর্তি হন ময়মনসিংহ কলেজে।

তিনি যখন কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র, তখনই আসকার ইবনে শাইখের ‘পদক্ষেপ’ নাটকে অভিনয় করেন। এই কাজের সুবাদেই অভিনয়কেই ধ্যান-জ্ঞান মেনে নেন আনোয়ার হোসেন। একটা ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মে সামান্য সুপার ভাইজারের চাকরি করতেন। সেখান থেকেই যুক্ত হন থিয়েটারে। সুভাষ দত্ত, সৈয়দ হাসান ইমাম ও ফতেহ লোহানীদের সান্নিধ্যে আসেন। সেখান থেকে সিনেমায়।

শেষ জীবনে অসুখ-বিসুখ বাসা বেঁধেছিল শরীরে। ২০১৩ সালের ১৮ আগস্ট অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে ভর্তি হন। এরপর আর বাসায় ফিরতে পারেননি। ১৩ সেপ্টেম্বর তিনি মারা যান। ৮২ বছর বয়সে বিদায় নেন বাংলা সিনেমার এক প্রবাদপুরুষ।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।