অভিনেতা আবুল খায়ের: দ্য আনটোল্ড স্টোরি

– রোকেয়া একটু পান হবে?

– না! হবে না

এই বলে রোকেয়ার পাশে বসে থাকা রোকেয়ার স্বামী উত্তর দিয়েছিল পান খেতে চাওয়া লোকটিকে হুমায়ূন আহমেদের সমুদ্রবিলাস প্রাইভেট লিমিটেড নাটকে। সে পান খেতে চাওয়া লোকটিকে চিনতে কি কষ্ট হচ্ছে!

কিংবা ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকে বাকের ভাইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী কুত্তাওয়ালী রেবেকা ম্যাডামের পক্ষের উকিলের কথা মনে আছে, যার বুদ্ধির কারণে বদি বাকের ভাইয়ের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে রাজি হয়েছিল!

সেই পান খেতে চাওয়া লোকটি কিংবা শেষ পর্যন্ত বাকের ভাইয়ের ফাঁসি হয় যে উকিলের কারণে সে উকিল আর কেউ নয়, আশি নব্বই দশকের নাটক সিনেমার অতি পরিচিত মুখ অভিনেতা আবুল খায়ের।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অবিবাহিত। একজনকে পছন্দ করতেন, তাকে বিয়ে করতে পারেননি বলে থেকে গেছেন অকৃতদার হিসেবে। ‘আজ রবিবার’ নাটকে দাদার চরিত্রে অভিনয় করেও তিনি সবার মনের মনিকোঠায় জায়গা করে নিয়েছেন।

শক্তিমান অভিনেতা আবুল খায়ের মোট চারবার জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেন। পুরস্কার প্রাপ্ত ছবিগুলো হল – দহন (১৯৮৫), রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত (১৯৮৭), অন্য জীবন (১৯৯৫) ও দুখাই (১৯৯৭)।

আবুল খায়ের ১৯৭৩ সালে ঋত্বিক ঘটক পরিচালিত ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ছবির মাধ্যমে সিনেমায় পদার্পণ করেন। বিটিভির একটা জনসচেতনতামূলক নাটকে তিনি তার অর্জুন গাছ খুঁজে বেড়াচ্ছেন আর বলছেন ‘তাইলে আমি ওষুদ বানামু কি দিয়া মানুষ বাঁচবো ক্যামনে গাছ অইল অক্সিজেন ফ্যাক্টরি আল্লাহর দেয়া দান আমগো জীবন।’ সংলাপটা বেশ বিখ্যাত হয়।

যদিও বা এ লেখার উদ্দেশ্য আবুল খায়েরের অভিনয় জীবন বা ব্যক্তিজীবন নিয়ে নয়। এ লেখার উদ্দেশ্য অন্য আরেকটি, যেটিতে আবুল খায়েরের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

দুর্লভ এই ছবিতে আছেন অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামান, নৃত্য পরিচালক আজিজ রেজা ও আবুল খায়ের।

আমার ধারনা, অনেকেই হয়তো এ বিষয়টি জানেন না। আমি ও জানতাম না, অল্প কয়েকদিন আগে বিষয়টি জেনেছি!

৭ মার্চ, ১৯৭১ ঢাকার রমনায় অবস্থিত রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক ইতিহাস রচিত হয়েছিল। ওই দিন আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় ভাষণ প্রদান করেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৮ মিনিট ব্যাপ্তি এ ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়েই স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য ঝাপিয়ে পড়েছিলেন আপামর বাঙালি জাতি। এ ভাষণের জন্যেই বঙ্গবন্ধুকে ‘রাজনীতির কবি’ খেতাবে আখ্যায়িত করা হয়। গত ৩০ অক্টোবর, ২০১৭ ইউনেস্কো কর্তৃক এ ভাষণকে ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে স্বীকৃতি ও দেওয়া হয়েছে।

সাতই মার্চের ঐতিহাসিক এই ভাষণ নিয়ে ব্যাপক পূর্ব প্রস্তুতি থাকলেও, পরিকল্পনামাফিক ভাষণটির অডিও-ভিডিও তখন ধারণ করা সম্ভব হয়নি। ঢাকা বেতার থেকে এ ভাষণ প্রচার করার কথা ছিল, কিন্তু পাকিস্তান সরকারের নগ্ন হস্তক্ষেপের কারণে সেদিন রেডিওতে তা প্রচার করা যায়নি।

বঙ্গবন্ধু সেদিন গুরুত্বপূর্ণ কোনো বক্তব্য রাখতে পারেন, এ আশায় রেসকোর্সের ময়দান জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। আজকের মতো এত আধুনিক টেকনোলজি মজুদ না থাকলেও সেদিনের জনসভার ভাষণটি বেতারে প্রচার করার যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পূর্ণ ছিল, যদিও শেষ পর্যন্ত তা আর সম্ভব হয়নি।

তবে সরকারের নিষেধাজ্ঞাকে উপেক্ষা করে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র কর্পোরেশন এর চেয়ার‍ম্যান এ এইচ এম সালাহউদ্দিন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম আবুল খায়ের এমএনএ ভাষণটি ধারণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এম আবুল খায়ের এমএনএ ছিলেন তৎকালীন ফরিদপুর জেলার পাঁচ আসনের (বর্তমান গোপালগঞ্জ ১ আসন) নির্বাচিত সংসদ সদস্য।

আরেকটি দুর্লভ ছবি। আছেন হুমায়ূন আহমেদ, শাহ আবদুল করিম ও আবুল খায়ের।

তাদের এ কাজে সাহায্য করেন অভিনেতা আবুল খায়ের। তিনি তখন সরকারের ফিল্ম ডিভিশনের ডিএফপি কর্মকর্তার পাশাপাশি একজন অভিজ্ঞ সচল ক্যামেরা বিশেষজ্ঞও ছিলেন। তাদের সঙ্গে আরো যুক্ত হলেন অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ান এনএইচ খন্দকার।

বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতার সময় এমএনএ আবুল খায়েরের তত্ত্বাবধানে টেকনিশিয়ান এনএইচ খন্দকার মঞ্চের নিচ থেকে ভাষণটির অডিও ধারণের সিদ্ধান্ত নেন। অন্যদিকে অভিনেতা আবুল খায়ের মঞ্চের এক পাশ থেকে সচল ক্যামেরা নিয়ে ঐ ভাষণের চিত্রধারণ করেন।

কিন্তু ওই সময়ের ক্যামেরাগুলো বেশ বড় আকার হওয়ার কারণে আবুল খায়েরের একার পক্ষে সেটা নাড়াচাড়া করা বেশ কষ্টকর হয়ে পড়েছিল, ফলে এক জায়গায় স্থির থেকে তিনি যতটুকু পেরেছেন, ধারণ করেছিলেন। আর এ কারণেই সাতই মার্চের ১০ মিনিটের একটি ভিডিও চিত্র আমরা দেখে থাকি।

অন্যদিকে সরকারের হস্তক্ষেপের কারণে বেতার কর্মীরা সরাসরি ভাষণটি প্রচার করতে না পারলেও; রেকর্ডটি সম্পন্ন করতে পেরেছিলেন, যেটা পরদিন বাঙালি বেতারকর্মী ও আপামর জনতার দাবির প্রেক্ষিতে বেতারে প্রচার করা হয়।

সাত মার্চের সেই বিখ্যাত ভাষণ

পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে এ ধারণকৃত অডিও-ভিডিও তাকে উপহার দেওয়া হয়েছিল এবং যুদ্ধ চলাকালীন সময় এর কয়েকটি রেকর্ডেড কপি ভারতে পাঠানো হয়, সেখান থেকে বিশ্বখ্যাত রেকর্ড কোম্পানি এইচএমভির উদ্যোগে এ ভাষণের তিন হাজার কপি বিনামূল্যে বিভিন্ন জায়গায় বিতরণ করা হয়।

আজকে যে আমরা ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ১০ মিনিটের ভাষণ পর্দায় দেখতে পাই, সেটা শুধু অভিনেতা আবুল খায়েরের কারণেই। স্যালুট টু হিম!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।