আবুল হায়াত: ট্রল নয়, শ্রদ্ধা

এই প্রজন্মের অনেক অদ্ভুত ঘটনার মধ্যে একটি হচ্ছে আমরা আবুল হায়াতের মত ব্যক্তিত্বকে নিয়ে খুব বাজে ভাবে ট্রল করি! অথচ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বাবা চরিত্রে অভিনয় করা এই লোকটি আমাদের মতন বিটিভির নাটক দেখে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের কাছে খুবই পছন্দের, শ্রদ্ধার। বিশেষ করে নাটকে বাবা মানেই যেন তিনি।

সেই ‘শঙ্খনীল কারাগার’-এ তিনি তার প্রায় সমসাময়িক ডলি জহুরের বাবা হয়েছিলেন। তারপরে থেকে শমী কায়সার, আফসানা মিমি, বিপাশা হায়াত হয়ে ঈশিতা, তারিন, অপি করিম, জয়া আহসান, তিশার প্রজন্ম পাড়ি দিয়ে এই প্রজন্মের সাফা কবিরের ও বাবা হয়েছেন তিনি।

‘আগুনের পরশমনি’ সিনেমায় ১৯৭১ সালে অবরুদ্ধ ঢাকার এক বাড়িতে দুই মেয়ে এবং স্ত্রীকে নিয়ে তীব্র হতাশা এবং ভীত সন্ত্রস্ত এক পরিবারের কর্তা মতিন সাহেব। যে মনে প্রাণে চায় দেশ স্বাধীন হোক, কিন্তু যখন মিলিটারির ভয়ে এবং প্রচন্ড অনিচ্ছা নিয়ে ভুট্টোর ছবি ঘরে টাঙিয়ে রাখে, তখন তার চোখে মুখে স্পষ্ট বিষন্নতার ছাপ, সেই বিষন্নতা আপনাকেও মন খারাপ করে দিতে পারে।

‘বহুব্রীহি’ নাটকের সোবহান সাহেব। যার সব কিছুতেই অনেক কৌতুহল। নাটকে ভাড়াটিয়া আসদুজ্জামান নুরের সাথে কথার পিঠে কথা শুনে প্রথম দিকে যতটা রাগান্বিত হন তিনি ঠিক ততটাই তাঁর যুক্তি শুনে এক পর্যায়ে তার সাথে ঢাকার রাস্তায় বের হয়ে গরীব মানুষের দুঃখ কষ্ট দেখে অশ্রুসিক্ত হন।

‘নক্ষত্রের রাত’ নাটকে একজন রিটায়ার্ড করা পুলিশ অফিসার। বয়সের কারণে সব কিছুতেই তার প্রচন্ড রাগ। আবার কিছুক্ষণ পরেই সেই রাগের ছিটে ফোটাও যেন নেই। মেয়ে মনীষার সাথে (শমী কায়সার) এই বাবার অংশটুক এত জীবন্ত যেন মনে হয় আমাদের পরিবারের গল্প। ঠিক একই ঘটনা দেখা যায় ‘আজ রবিবার’ নাটকে, দুই মেয়ে কে নিয়ে বাড়িতে গানের আসর বসান তিনি।

‘জোৎস্নার ফুল’ নাটকের দুষ্টলোক থেকে ‘হাউজফুল’ একরামুল হক সাহেব। এখানেও দুই মেয়ে এক ছেলে সাথে নিজের ছোট ভাই এবং ছোট শালা কে নিয়ে সুখেই ছিলেন। সেখানে বিভ্রাট ঘটলো যখন পাশের ফ্ল্যাটে আর একজন একই নামের একরামুল সাহেব এলেন।

‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমায় সালমান শাহর বড় চাচা তিনি। সালমান শাহ’র বাবা রাজীব জেলে যাবার পর তার বড় চাচ্চুই তাকে বড় করে তুলেন। ‘স্বপ্নের ঠিকানা’ সিনেমাতেও ছিলেন সালমান শাহর বাবার চরিত্রে।

‘জয়যাত্রা’য় একজন গোড়া হিন্দু তিনি, যে সব সময় হাতে একটি পিতলের মুর্তি রেখে দেয়। কিন্তু ঘটনা চক্রে যখন তার শিশু নাতি এক মুসলমান মায়ের মাতৃদুগ্ধ পান করে তৃষ্ণা মিটায়, তিনি তখন মূর্তিটা পানিতে ফেলে দেয় এবং বলে, ‘তুমি যা দিলা তার কাছে ঐ পিতলের মুর্তি হাইরা গেল। তুমিই তো দেবী।’

‘দারুচীনি দ্বীপ’-এ তিনি খুব কম সময় উপস্থিত ছিলেন। সেই চিরায়ত মধ্যবিত্ত বাবা যিনি ছেলে মেয়ের আবদার রক্ষার জন্য মুখ বুঝে লড়ে গেছেন একাই। এই সিনেমায় স্বল্প সময়ে অনবদ্য অভিনয় করে তিনি পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার।

তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনয় তিনি করেছেন ‘খেলা’ নাটকে যেখানে তিনি একজন স্কুল শিক্ষকের ভুমিকায় ছিলেন। তিনি এক খুব ভালো দাবা খেলোয়াড় যাকে দাবা খেলায় আজ পর্যন্ত কেউ হারাতে পারে নি। কিন্তু জীবনের খেলায় তিনি হেরে যান। তাকে ঘিরেই নাটকের গল্প। এই নাটকে তার অভিনয় দেখে বিষন্নতা আসে নি এমন লোক খুজে পাওয়া দায়।

তার অভিনিত নেগেটিভ চরিত্র ও আছে যা অনেকেই বিশ্বাস করতে চাইবে না। ‘অয়োময়’ নাটকে একজন সাধারন জেলে কাশেম থেকে কিছু পয়সা পাতি কামাই করে বজরা নৌকা কিনে মির্জা সাহেব (আসাদুজ্জামান নুর) কে টক্কর দেয়ার মাধ্যমে তার মধ্যে নেতিবাচক চরিত্র ই ফুটে উঠে। আবার ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’ সিনেমাতেও স্বল্প সময়ে নেতিবাচক চরিত্রেই তাকে পাওয়া যায়। কিন্তু সেখানেও তিনি ছিলেন সাবলীল।

তিনি যেই মানের অভিনেতা সেই হিসেবে তাকে একমাত্র হুমায়ুন আহমেদ ছাড়া আর কেউই সেভাবে কাজে লাগাতে পারেননি। হুমায়ূন আহমেদ নিজে তার ‘ছবি বানানোর গল্পে’ এই কথা স্বীকার করেছেন। আবুল হায়াত যে মানের অভিনয় করতে পারেন তার কাছ থেকে কোন পরিচালক এমনকি হুমায়ূন আহমেদ নিজেও সেই অভিনয় বের করতে পারেনি বলে আফসোস করেছেন।

নাটক থেকে আসতে আসতে পরিবারের বিভিন্ন চরিত্র হারিয়ে গেছে। সেখানে অনেক বছর পর এবার ঈদের নাটকে বেশির ভাগই ছিলো পারিবারিক গল্প কেন্দ্রিক। নায়ক নায়িকা আর মোবাইল ফোন, নাটকের এই তিন শিল্পীর ফরম্যাট থেকে বের হয়ে পরিবার কেন্দ্রিক গল্প গুলো মন ছুয়ে গেছে সবার। ‘অক্সিজেন’, ‘অযান্ত্রিক’, ‘করোনা বলে কিছু নাই’ – এগুলো ছিলো বাবা মেয়ের গল্প। ‘ইতি, মা..’ গল্পে বাবার স্বল্প উপস্থিতি, কিংবা ‘লাস্ট অর্ডার’ গল্পে পরিবারের জন্য বাবার লাস্ট অর্ডার নেওয়া সব গুলোতেই বাবার চরিত্রে অভিনয় ছিল অসাধারণ।

এত কিছুর ভিড়েও আমি এই মানুষটি কে বাবা চরিত্রে মিস করেছি। যারা ছিলেন তারা যে যার চরিত্রে সর্বোচ্চ টুক দিতে একটু ও ছাড় দেন নি যদিও। তবুও নাটক গুলোতে তার অনুপস্থিতি অবচেতন মনে কিছুটা আশংকার ও জন্ম দেয়। মানুষটি কি আসলেই বুড়ো হয়ে গেল? বয়স ও আশি ছুইছুই! তাইতো ‘ফাগুন হাওয়া’ সিনেমায় আমাদের পরিচিত সেই বাবা কে পেলাম ‘দাদা’ হিসেবে!

হঠাৎ ইচ্ছা জাগলো। তার সাথে একদিন সারাবেলা থেকে তার অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে কিছু গল্প শুনতে পারতাম! তার জন্মস্থান এর কথা, অয়োময়ের সময়ের কথা, নক্ষত্রের রাত কিংবা বহুব্রীহি কিংবা আজ রবিবারের সময়ের কথা, হাইজফুল তো সেদিন হলো। হুমায়ূন আহমেদ এর কথা, সালমান শাহ এর কথা।  বাবা হয়েই আরো অনেক বছর বেঁচে থাকুন তিনি আমাদের মাঝে, এই কামনা করি।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।