বিষয় সুচিত্রা: আবেদন, অন্তর্ধান ও অন্যায়

সুচিত্রা সেন যখন মারা গেলেন, সেই সময় তাঁকে নিয়ে সবার অনেক লেখা, মতামত, মূল্যায়ন, স্মৃতিচারণ পড়েছিলাম। বিশিষ্ট, অবিশিষ্ট সবাই লিখেছেন। সুচিত্রা সেন স্বপ্ন কন্যা, উঠতি বয়স থেকেই তিনি স্বপ্নের প্রেমিকা এই সব।

সেই সব লেখা মন দিয়ে পড়েছিলাম। অনেক বড় বড় অভিনেতা, অভিনেত্রী, সংষ্কৃতি জগতের অনেক সূধী, বোদ্ধা, বিদ্বৎকুল তাদের মন্তব্যে সুচিত্রা সেনের বন্দনা করে যে মন্তব্য করেছিলেন তাকে কম্পাইল করলে এরকম দাড়ায় –

  • এত বড় মাপের অভিনেত্রী আগামী ১০০ বছরেও আসবে কিনা সন্দেহ।
  • তিনি ছিলেন স্নিগ্ধ সৌন্দর্যের প্রতিমূর্তি।
  • অসাধারণ ব্যক্তিত্ব।
  • শিল্পের জন্য নিবেদিত।
  • জাত অভিনেত্রী।
  • শিল্পের জন্য তার ত্যাগ অনুকরণীয়। তিনি তার ইমেজ ধরে রাখার জন্য, দর্শকের কাছে তার চির তরুণ স্বপ্নের নায়িকার ইমেজটি ধরে রাখবার জন্য তিনি অভিনয় ছেড়ে দিয়েছেন জনপ্রিয় থাকা অবস্থায় এবং আর কখনই জনসম্মুখে আসেননি।

শেষের বাক্যটি বলতে গিয়ে ওপার বাংলার এক গুনী প্রবীন অভিনেত্রী এক টিভি চ্যানেলের স্বাক্ষাৎকারে চোখের পানি ছেড়ে দিয়েছিলেন। তিনি আবেগ মথিত গলায় এও বলেছেন, ‘আমরা কি পেরেছি?’

আমি এই স্বাক্ষাৎকার শুনে শিওরে উঠেছিলাম। সব অভিনেতা অভিনেত্রীরা যদি এই কাজ করতেন তাহলে অভিনয় জগতের কি হত? অমিতাভ বচ্চন কি তবে ভুলই করে যাচ্ছেন? সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় কি কোনো ত্যাগই করতে পারলেন না। খালি ভোগই করে গেলেন?

২ নং মন্তব্যটি ছাড়া বাকি সব মন্তব্যে আমার আপত্তি আছে। ৬ নং মন্তব্যে তীব্র আপত্তি।

সুচিত্রা সেন বড় নায়িকা ছিলেন। বড় তারকা ছিলেন। কিন্তু খুব ভাল অভিনেত্রী হিসেবে তিনি নিজেকে প্রমান করতে পেরেছেন কি?

উত্তম কুমার ছাড়া আর কোন নায়কের সাথে তিনি সেই অর্থে সফল হতে পেরেছেন কি? একজন সত্যিকারের অভিনেত্রীর জন্য এটা অনেক বড় চ্যলেঞ্জ। সুচিত্রা সেন এই চ্যলেঞ্জে খুব ভালভাবে উতরেছেন বলে আমার মনে হয়নি। তিনি খুব বেশি উত্তম নির্ভর ছিলেন।

সুচিত্রা সেন সম্ভবত নিজেও এটা অনুভব করেছেন। তাই উত্তম কুমারকে খুব ভালভাবে নিতে পারেননি। এক পরযায়ে সুচিত্রা সেনের ইগো চরমে পৌঁছালে ঘোষণা দিয়ে উত্তমের সাথে অভিনয় বন্ধ করে দেন। এবং বলা বাহুল্য ‘দীপ জেলে যাই’ ছাড়া বিশেষ কোন সাফল্য আসেনি। তিনিও তাঁর ইগো বেশি দিন ধরে রাখেননি।

চরিত্র চিত্রনে সুচিত্রা সেন খুব বেশি ভেরিয়েশন আনতে পেরেছেন কি? একইরকম রোমান্টিক গ্লামার নির্ভর চরিত্র, প্রোটোটাইপ অভিনয়। তার ম্যানারিজমগুলোও একইরকম। অভিনয়ে তিনি একটি ধারার বাইরে কখনোই হাঁটেননি। এই ধারাও তাঁর নিজস্ব সৃষ্টি নয়।


জাত অভিনেত্রীর বৈশিষ্ট্য এটা নয়।

অভিনয়ের জন্য তিনি নিবেদিত এটাও আমার কখনই মনে হয়নি। অভিনয়ের জন্য, অভিনয় শিল্পের উতকর্ষের জন্য তিনি তার নিজের অভিনয়ের বাইরে কিছুই করেননি। তাকে বরং তার স্টারডম টিকিয়ে রাখার ব্যপারে বেশি নিবেদিত মনে হয়েছে।

সবশেষে আসি আবারো তাঁর অন্তরাল প্রসঙ্গে। একটা পর্যায়ে তিনি অভিনয় ছেড়ে দিলেন। সেটা তিনি করতেই পারেন। কিন্তু লোক চক্ষুর অন্তরালে চলে গেলেন। কাউকেই দেখা দেন না। এটা কোন সুস্থ চিন্তার কাজ হতে পারে? এ তো রীতিমত সোশ্যাল উইথড্রল। এক প্রকার মানসিক বিকার।

সবাই বলেছেন দর্শক মনে নিজের চির যৌবনবতী স্বপ্নের নায়িকার ভাবমূর্তি ধরে রাখতে তিনি এই কাজ করেছেন। এটাও কোনো স্বাভাবিক চিন্তা হতে পারেনা। একজন অভিনেত্রী তার দর্শক মনে চির‍যৌবনা হয়ে থাকবেন তার কাজ দিয়ে, অভিনয় দিয়ে। অন্তর্ধানের রহস্য সৃষ্টি করে নয়। এটা একরকমের সস্তা চালাকি।

নানা রূপে সুচিত্রা সেন

সুচিত্রা সেন চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নে যুক্ত থাকতে পারলেন না। অভিনয় শিল্পের জন্য চির জীবন নিবেদিত থাকতে পারলেন না। উত্তর প্রজন্মের কেউ তাঁর সাথে দেখা করে দুটো শিখবে বা উৎসাহ নিবে সে পথও খোলা রাখলেন না। তিনি বেছে নিলেন চির অন্তরাল। কার্যত তিনি আত্মহত্যাই করলেন। তিনি কি ভেবেছিলেন এই সমাজকে তাঁর আর দেয়ার কিছুই নেই? যদি তা-ই হয় তবে খুবই দু:খ জনক।

এই অস্বাভাবিক জীবন বেছে নিয়ে তিনি কি দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন? তাঁর অন্তর্ধানের সস্তা রহস্যে মজে গিয়ে আমরাও বলতে শুরু করলাম – ‘আহা! কি ত্যাগ!’ একজনকেও বলতে দেখলাম না – ‘এটা অন্যায়, এটা অসুস্থতা, এই ত্যাগে মহিমা নাই।’ আমি খুব অপেক্ষায় ছিলাম।

_______________

সুচিত্রা সেন কিংবদন্তী। তাকে ছোট করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আরো অনেকের মত আমিও তাঁকে ভালবাসি। তাঁর সীমাবদ্ধতা সহই।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।