অরুণ গাওলি: কারখানার শ্রমিক থেকে মুম্বাইয়ের ‘ড্যাডি’

অর্জুন রামপালের ‘ড্যাডি’ সিনেমাটা দেখেছেন? সিনেমাটি বলিউড বক্স অফিসে খুব সুনাম কুড়াতে পারেননি। তাই হয়তো অনেকের দেখাও হয়নি। না দেখলেও নাম তো শুনেছেন।  অরুণ গাওলি ভাল কি মন্দ লোক – সিনেমাটি দেখলে খটকা লাগতে পারে। চলুন এবার আসল গাওলিকে চিনে নেই।

রিয়েল লাইফ বনাম রিল লাইফ
  • কে এই অরুণ গাওলি

অরুণ গাওলি বা অরুণ গুলাব আহির হলেন ভারতীয় পলিটিশিয়ান, আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন ও সাবেক গ্যাঙস্টার। জন্ম ১৯৫৫ সালের ১৭ জুলাই। অরুণ আর তাঁর বড় ভাই কিশোর পাপ্পা ১৯৭০-এর দশকে মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডে যোগ দেন। তাঁদের গ্যাঙ ‘বাইকুলা কোম্পানির মূল হোতা ছিলেন রামা নায়েক ও বাবু রেশিম। মধ্য-মুম্বাইয়ের বাইকুলা, প্যারেল ও সাত রাস্তা এলাকায় চলতো তাঁদের অপরাধ জগতের কারবার।

অরুণ গাওলির জন্ম আহমেদনগরে হলেও তাঁর জীবনের বড় একটা অংশ কেটেছে বাইকুলা ও ডঙলি চওলে। তাঁর স্ত্রী হলেন মহারাষ্ট্রের এমএলএ (মেম্বার অব লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি) আশা গাওলি। তাঁদের দুই সন্তান – মহেশা ও গীতা।

  • কারখানার শ্রমিক থেকে আন্ডারওয়ার্ল্ডে

গাওলি মুম্বাইয়ের টেক্সটাইল মিলে কাজ করতেন। প্যালে, চিঞ্চপোকলি, বাইকুলা ও কটন গ্রিন – নানা জায়গায় কাজ করতেন। বাড়তি আয়ের জন্য দুধের ব্যবসা করতেন। ৭০ ও ৮০’র দশকে মুম্বাইয়ের টেক্সটাইল মিল গুলোতে বড় ধস নামে। শুরু হয় শ্রমিকদের আন্দোলন। এতে অরুণ গাওলি সহ অনেক তরুণ বেকার হয়ে যায়।

সহজে অর্থ আয়ের জন্য তখন আন্ডারওয়ার্ল্ডে যোগদানকেই একমাত্র পথ মনে হয় গাওলির। সেই সুবাদেই গাওলির সাথে যোগাযোগ হয় বাইকুলা কোম্পানির।

  • দাউদ ইব্রাহিম বনাম অরুণ গাওলি

১৯৮৪ সালে বাইকুলা কোম্পানির সাথে যোগাযোগ হয় দাউদ ইব্রাহিমের। প্রতিদ্বন্দ্বী পাঠান গ্যাঙয়ের সামাদ খানকে রাস্তা থেকে সরানোর জন্য বাইকুলার সাহায্য চান দাউদ।  এক সময় দাউদ ইব্রাহিমের সাথে খুব দহরম মহরম থাকলেও এক সময় এই সম্পর্ক সাপে-নেউলে পরিণত হয়।

১৯৮৮ সালে রামা নায়েক এক পুলিশ এনকাউন্টারে মারা যান। যদিও এটি পুলিশ এনকাউন্টার ছিলো, কিন্তু অরুণ এবং ‘বাইকুলা কোম্পানি’র অনুসারীরা ধরেই নিয়েছিলো এটি দাউদ ইব্রাহীমের মদতেই হয়েছে। তখন গ্যাঙয়ের নিয়ন্ত্রন নেন অরুণ। ডঙলি চওলে নিজের বাসা থেকে তিনি গ্যাঙ নিয়ন্ত্রন করতেন।

সেই থেকে অরুন এবং দাউদের সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে। নব্বই দশকে এই দু’জনের বিরোধ চূড়ান্ত রূপ ধারণ করেন। একটা সময় অরুণ এতটাই ক্ষমতাবান হয়ে ওঠেন যে দাউদ থেকে শুরু করে ছোটা রাজন, ছোটা শাকিল ও শরদ শেঠিরাও অরুণকে সমীহ করতো। এদের মুম্বাই ছেড়ে দুবাই চলে যাওয়ার পেছনেও অনেকে অরুণের হাত দেখেন। মুম্বাইয়ে তখন অরুণ গাওলি ‘ড্যাডি’ নামে পরিচিতি পান।

অরুণ ও দাউদের গ্যাং ওয়ারের পাঁকে পড়ে মারা যায় অরুণের ভাই বাপ্পা। এরপরই প্রতিশোধ নিতে ১৯৯১ সালে দাউদের বোন হাসিনার স্বামী ইসমাইল পার্কারকে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেয় অরুণের ভাড়াটে শুটার। এরপরই দুবাই চলে যান দাউদ।

  • রাজনৈতিক জীবন

বোনের জামাইয়ের মৃত্যু মেনে নিতে পারেনি দাউদ। শেষে মুম্বাইয়ে জেজে হাসপাতালে গ্যাঙ ওয়ারে অরুণ গাউলির সতীর্থদের মেরে ফেলে দাউদের লোক। অরুণ তখন একা হয়ে যান। তিনি গা ঢাকা দেন।

এরপর অনেক চেষ্টার পর পুলিশ অরুণ গাওলিকে গ্রেফতার করতে পেরেছিল। একবার না, কয়েকবার তিনি গ্রেফতার হন। কিন্তু, গোল বাঁধে অন্য জায়গায়। গাওলির বিরুদ্ধে কখনোই কেউ সাক্ষী দিতে রাজি ছিল না। ফলে, তাঁর অপকর্মের পরে তাঁকে শাস্তি দেওয়া যাচ্ছিল না।

১৯৮০’র দশকে অরুণ উগ্রবাদী রাজনৈতিক দল শিব সেনার ছায়াতলে আসেন। এক সভায় শিব সেনার প্রধান বাল থাকেরে অরুণকে ‘নিজেদের ছেলে’ বলে মন্তব্যও করেন। যদিও নব্বই দশকে তিনি শিব সেনার সাথেও গণ্ডগোল বাঁধান। বিরোধীতার জের ধরে তিনি শিব সেনার শীর্ষ সদস্য কামলেকার জামসানদেকারকে মেরে ফেলেন।

আরো পড়ুন

এরপর অরুণ নিজের আলাদা রাজনৈতিক দল ‘অখিল ভারতীয় সেনা’ গঠন করেন। ২০০৪ সালে মুম্বাইয়ে নির্বাচিত এমএলএ হন তিনি। যদিও, এর মধ্যে নিজের পরিবার থেকেও বাঁধার মুখে পড়েন তিনি। তারই ভাতিজা শচিন আহির পার্টি ছেড়ে যোগ দেন শরদ পাওয়ারের ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টিতে (এনসিপি)। চাচা-ভাতিজা একই নির্বাচনী এলাকা থেকে লোকসভা নির্বাচন করেন। যদিও, শেষ অবধি দু’জনকে হারিয়ে ১৯৯৯ সালে নির্বাচনে জিতে যান শিব সেনার মোহন রাওয়ালে।

  • যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

২০১২ সালের আগস্টে শিব সেনার নেতা কামলেকার জামসানদেকারকে হত্যার দায়ে অরুণ গাওলি এবং অন্য ১১ জনকে দোষী সাব্যস্ত করে আদালত যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। এরপর থেকে জেলেই কাটছে অরুণ গাওলির জীবন।

শুধু বলিউডে নয়, মারাঠি ভাষাতেও অরুণ গাওলিকে নিয়ে সিনেমা হয়েছে। ২০১৫ সালে মুক্তি পাওয়া সেই সিনেমাটির নাম ‘ডঙলি চওল’।

দ্য কোয়াইন্ট অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।