মেসি ছাড়া বিশ্বকাপ মানায় না

‘জাতীয় দলের হয়ে একটা শিরোপার বিনিময়ে বার্সেলোনার সব ফিরিয়ে দিতে রাজি আছি’ – মাস দুয়েক আগে লিওনেল মেসির মুখ থেকেই কথাগুলো এসেছিল। দু’বছর আগে আগে সব ব্যালন ডি অর ট্রফির বিনিময়ে বিশ্বকাপ নিতে দু’বার ভাববেন না বলে জানিয়েছিলেন। কারণ হিসেবে বলেছেন একজন খেলোয়াড়ের জন্য বিশ্বকাপের চেয়ে দামি কিছু আর হতে পারেনা।

মেসির এই উপলব্ধিগুলোর সাথে হয়তো আমরা অনেকেই বা সবাই একমত। মেসিকে পাঁচটা ব্যালন ডি অর এর চেয়ে একটা বিশ্বকাপ হাতেই বেশি মানাবে। ব্যালন ডি অর তো প্রতি বছরই কেউ না কেউ জিতে, কিন্তু বিশ্বকাপ জিততে চার বছর অপেক্ষা করতে।

এটা শুধু অপেক্ষা না, অপেক্ষার সাথে জড়িয়ে আছে আকাঙখা, ইচ্ছাশক্তি, একাগ্রতা, পরিশ্রম, সংগ্রাম। কিন্তু বছর ঘুরে যখন বিশ্বকাপ আরো একবার কড়া নাড়লো মেসির দড়জায় তখন নিয়তি বাধ সাধলো – ‘আর কতো সুযোগ দিব? এবার এমন কিছু করো যেন কারো মুখ দিয়ে আর টু-শব্দ বের না হয় তোমাকে নিয়ে।’

এমন কিছু আবার কেমন? সেটার মানদন্ড ৩২ বছর আগেই তৈরি করে দিয়ে গেছেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা। কিন্তু সেই রেফারেন্স পয়েন্টের উচ্চতা এতো বেশি যে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচের সামনে এসেও দাঁড়িয়ে লিওনেল মেসিকে তাকিয়ে থাকতে হয়েছিল ক্রোয়েশিয়ার দিকে। সাথে নাইজেরিকে তো হারাতে হতই।

না, মেসির ক্রোয়েশিয়ার দিকে শেষ মেশ না তাকিয়ে থাকলেও চলেছে। নাইজেরিয়াকে হারিয়ে দিয়েই আর্জেন্টিনা যে চলে গেছে দ্বিতীয় পর্বে। ম্যাচের ১৪ মিনিটে গোলের সূচনা করেন মেসিই। এরপর অন্তিম মুহূর্তে স্কোরশিটে নাম লেখান মার্কোস রোহো।

এসব না হলে আর্জেন্টিনাকে সাথে নিয়ে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হয় লিওনেল মেসিকে। দেখতে দেখতে বিশ্বকাপ শেষ হত, মেসির কথা ভুলে তখন সবাই বিশ্ব চ্যাম্পিয়নকে নিয়ে মেতে থাকতো। বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়দের পিছনে ছুটতো ক্লাবের মালিকরা। মেসি বার্সায় আবার খেলা শুরু করতেন এবং যথারীতি মেসির পা থেকে গোল উৎসব শুরু হত আবার। তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বীপূর্ণ ক্লাব মৌসুম শেষে মেসির হাতে উঠবে ষষ্ঠ ব্যালন ডি অর, আরো একটি হয়তো পিচিচি ট্রফি। তবে, আবারো একটা দুর্নাম রটতো – মেসি বার্সার, আর্জেন্টিনার নয়।

এই বিশ্বকাপে মেসি খেলতে এসেছিলেন ইউরোপের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে। দুর্দান্ত ফর্মে থেকে বিশ্বকাপ শুরু করাটা ছিল আর্জেন্টিনার জন্য প্লাস পয়েন্ট। বাছাই পর্বের শেষ ম্যাচে মেসির হ্যাট্রিকে বিশ্বকাপে উঠে আলবিসেলেস্তেরা। সেই মেসিই যেহেতু দলে আছে, আর কোন চিন্তা নাই। মেসি অন্তত নিজের শেষ বিশ্বকাপ না জিতে বিদায় নিবেনা।

আমি আপনি না হয় ক্লাবে মেসির খেলা দেখতে দেখতে ওর সব মুভগুলো মুখস্ত। কিন্তু চার বছর পর যারা শুধু বিশ্বকাপের টানে টানটান উত্তেজনাপূর্ণ টক শো আর চিরন্তন চলতে থাকা টিভি সিরিয়াল বাদ দিয়ে খেলার চ্যানেলে ঢুঁ মারে তখন তারা এতদিন শুনে আসা মেসির পায়ের সেই ঝলকই দেখতে চায়। মেসি কি আসলেই পাঁচজন কে কাটিয়ে গোল দিতে পারবেন? ওর ফ্রি-কিক নাকি দেখার মতো, বিশ্বকাপেও একটা হলে মন্দ হয়না। এই দর্শকরা যতটা না মেসির ফ্যান, তার চেয়ে বেশি আর্জেন্টিনার।

মেসির কাঁধে ভর করে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতলে তাদের স্বপ্নপূরণ হবে। ম্যারাডোনার পরে আর কেউ পারেনি, এখন মেসি না পারলে আর কে পারবে।

আচ্ছা, মেসির জন্য কি বিশ্বকাপ জেতা এতটাই জরুরি?

খেলোয়াড় হিসেবে মেসির যোগ্যতা নিয়ে কোন প্রশ্ন তোলার সুযোগ নাই। যেকোন দিন মেসি ইতিহাসের যেকোন খেলোয়াড়কে হারাতে সক্ষম। একজন প্লে- মেকার, একজন স্ট্রাইকার, তর্কযোগ্যভাবে ইতিহাসের সেরা ড্রিবলার এবং ক্লাবের হয়ে অসংখ্য ঐতিহাসিক মুহূর্তের জন্মদাতা। তাহলে কেন এতো আক্ষেপ? কেন চাই একটা বিশ্বকাপ?

কারণ একটাই, মেসির মতো মহান ফুটবল শিল্পির গায়ে সামান্য অপ্রাপ্তির ছোঁয়াও কেউ দেখতে চায়না। আরে, বিশ্বকাপ না জিতলে যে পেলে ম্যারাডোনার কাতারে যেতে চাইলে বার বার প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে মেসিকে। মেসির আগেতো অনেক গ্রেট ফুটবলারই ছিলেন যারা বিশ্বকাপ জিতেনি, তাদের কি মানুষ ভুলে গেছে কিংবা তারা কি সম্মান এততটুকুও কম পাচ্ছে?

না, তা না। কিন্তু যখন পেলে আর ম্যারাডোনার কথা উঠে তখন তারা আলোচনায় আসেননা। কেন আসেননা সেটা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে দিস্তা দিস্তা কাগজ শেষ হবে, তবু লেখা শেষ হবেনা। অন্তত এতটুকুতে আশ্বস্ত হোন যে পেলে কিংবা ম্যারাডোনা এমন কিছুই দেখিয়েছে বিশ্বকে যার জন্য সমসাময়িক অন্য গ্রেট খেলোয়াড়রা তাদের দুজনকে নিয়ে আলোচনার মাঝে আসেন না। আর এই দুইজনই নিজ নিজ দেশকে বিশ্বকাপ উপহার দিয়েছেন।

যদি দিতে না পারতেন তাহলে এই আলোচনায় তারাও থাকতেন না। কারণ এটাই একজন খেলোয়াড়ের চূড়ান্ত অর্জন। গ্রেটদের জন্য একই সাথে স্বীকৃতিও বটে, ইতিহাস সেরার স্বীকৃতি। আর সেই স্বীকৃতিতে প্রশ্নাতীতভাবে ভাগ বসাতে কিংবা পুরোটাই নিজের করে নিতে মেসির একটি বিশ্বকাপই দরকার।

মেসি নিজেও জানেন সেটা; যেজন্য তিনি এতদিন যা অর্জন করেছেন, যা তাকে আজকের মেসি হিসেবে তৈরি করেছে তার সবই ছুড়ে ফেলতে প্রস্তুত – বিনিময়ে বিশ্বকাপটা দাও।

বিশ্বকাপ ছাড়া মেসিকে মানায় না। মেসিকে মাঠে বিমর্ষ চেহারায় দেখতেও ভাল লাগেনা। মেসি মানে বল আঠার মতো পায়ে লেগে থাকা, ধারাভাষ্যের মুখে ‘মেসি! মেসি!! মেসি!!!’ বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলার পরও বলটা তার পায়েই বেধে থাকা। মেসি মানে ফুটবল শিল্পের চূড়ান্ত প্রদর্শনী। আমরা বিশ্বকাপ দেখতে বসেছি আনন্দের জন্য। সেরা খেলোয়াড়দের সেরা ফুটবল নৈপুণ্য দেখার জন্য। আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতুক আর না জিতুক, আমরা মেসির সেরা খেলাটাই দেখতে চাই। মেসিকে মাথা নিচু করে মাঠ ছাড়তে দেখতে চাইনা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।