বিশ্বজয়ী দেশের সন্তান এবং অত:পর তাহারা

হরিষে কী করে বিষাদ উপহার দিতে হয়, তা আমাদের বড় কর্তারা খুব ভালো জানেন!

এ ক্ষণে আপনি বিষাদের কথা শুনতে চান না, এটা হতেই পারে। কিন্তু, আনন্দ পর্ব শেষ হওয়া মাত্র যখন আপনি ঘুম থেকে উঠে চিন্তা করবেন, এর পর এই যুবাদের ভবিষ্যত কী, তখন মনটা বিষাদময় হবে কি না আপনার?

বস্তত, আমরা এটা মেনে নিলে অবস্থা বুঝতে সুবিধা যে, বাংলাদেশ হলো সেই জায়গা, যেখানে পুকুর-নদীতে সাঁতারানোর কায়দাটা আমরা নিজ গুণে করায়ত্ত করে নেই বটে, কিন্তু সমুদ্রে ঘটে প্রতিভার সলিল সমাধি!

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকান। বিশ্ববিদ্যালয়ের কী করার কথা ছিল? কী করছে?

কোনদিন এই প্রশ্নটা করেছেন, দেশের সেরা সেরা মহাবিদ্যালয় থেকে দারুণ ফলাফল নিয়ে এইচএসসি পাস করে বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাওয়া প্রতিভাবান শিক্ষার্থীরা কী করে অস্ত্রবাজ হয়, সন্ত্রাসী হয়, মাদকাসক্ত হয়, চাঁদাবাজ হয়, যৌন নিপীড়ক হয়, জুবায়ের-বিশ্বজিৎ-আবরারের খুনি হয়?

এর জবাবে আপনার হাতে দু’টি উত্তর আছে।

  • মহাবিদ্যালয়ে আমরা সবাই অনুর্ধ্ব-১৮ থাকি। বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে হই ১৮+। ফলে, এসবের দায় প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির একক।
  • বিশ্ববিদ্যালয়ে তো শুধু এই খারাপরাই তৈরি হয় না। অনেক কীর্তিমানও তৈরি হয়।

এবার, আপনার এই উত্তর দু’টির প্রত্যুত্তরগুলোও পড়ে নিন।

  • দায় ব্যক্তির না। দায় সিস্টেমের। সিস্টেমের দায় না হলে স্কুল-কলেজেই এরা তৈরি হতো এবং বিশ্ববিদ্যালয় অব্দি এদের আসারই কথা ছিল না।
  • বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ ওই কীর্তিমান তৈরি করাই। বদমাশ তৈরি করা নয়।

তো, এই হলো ব্যাপার। বিশ্ববিদ্যালয় নামক মহাসমুদ্রে আমরা অসংখ্য প্রতিভার জলাঞ্জলি এভাবে দিয়ে আসছি দিনের পর।

মূল কথায় ফিরি।

এই যে আকবর আলীরা যুব বিশ্বকাপ জিতল, এর পর এদের লক্ষ্য কী হওয়া উচিত বলে মনে হয় আপনার? বাংলাদেশ জাতীয় দলে খেলা? নিশ্চয়ই!

বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গে মহাসমুদ্রের কথা বলছিলাম। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট হলো সেই মহাসমুদ্রের আরেকটা রূপ। নদী আর সমুদ্রের যা পার্থক্য, কলেজের দ্বিতীয় বর্ষ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের মধ্যে যে যোজন পার্থক্য, যুব ক্রিকেট ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পার্থক্যটা একদম তা-ই৷ তো এই মহাসমুদ্রে আমরা আমাদের সদ্য সাঁতরাতে শেখা বাচ্চাদের ছেড়ে দিয়ে স্রেফ তাদের সঙ্গে মজা নেই!

এই মজা আমরা এক কালে আশরাফুল-মাশরাফি-অলক-আফতাব-নাফিস-রাসেল-তালহাদের সঙ্গে নিয়েছি। সাকিব-মুশফিক-তামিম-রকিবুল-শাহাদাত-এনামুলদের সঙ্গে নিয়েছি। শুভ-নাসির-মুমিনুল-সাব্বির-বিজয়-সৌম্য-তাসকিন-লিটন-লিখন-মোসাদ্দেকদের সঙ্গে নিয়েছি। হাল আমলের মুস্তাফিজ-মিরাজ-সাইফউদ্দিন-শান্ত-সাইফদের সঙ্গেও নিয়েছি। এবং এটা চলতেই থাকবে। চলতেই থাকবে যতদিন আমরা স্বশিক্ষিত না হব, কাঠামো না বদলাব৷

এ কথা আজ পরিষ্কার যে বয়সভিত্তিক পর্যায়ে আমরা যে ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলছি, তার পেছনে অন্তত একটা হাঁটুভাঙা কাঠামো দাঁড় করানোরও বিশেষ কৃতিত্ব আছে। বিসিবি সবচেয়ে মোটা বুদ্ধি নিয়েও সবচেয়ে ভালো যদি কোন কাজ করে থাকে তা হলো, `গেম ডেভেলপমেন্ট’ বিভাগটাকে দারুণভাবে বহু বছর ধরে ফলবতী করে রাখা। আরেকটা হলো ‘হাই পারফরম্যান্স’ (এইচপি)। এই দুটির ভরসাতেই বিসিবির এতো বাহাদুরি।

অথচ, আমাদের স্কুল ক্রিকেট/ফুটবল বলতে যা হয়, তা একদম উদ্দেশ্যহীন। বাচ্চাগুলো নিজেরা নিজেরা তৈরি হয়ে ওঠে মাঠে নেমে পড়ে আসলে। যে কারণে, এদের দিকে চোখ কম পড়ে। আজও তাই বড় ভরসা বিকেএসপি। বিকেএসপি বানিয়ে দেয়, আর বিসিবির মতো জাতীয় প্রতিষ্ঠান এদের নষ্ট করে!

এতো সংকটের পরও বাংলাদেশের বয়সভিত্তিক দলগুলো যে কত দুর্দান্ত তার প্রমাণ এই বিশ্বজয়। কিন্তু, যে ক্যারিয়ারের বয়স সাফল্যের সঙ্গে হওয়া উচিত ২০ বছর, সে ক্যারিয়ার আমরা শুরুর ২-৪ বছরের সাফল্যেই আটকে ফেলেছি!

সহজভাবে বললে, সঠিক পরিচর্যার অভাবে কতজন সম্ভাবনাময় ক্রিকেটার চোরাবালিতে হারিয়ে গেছেন, তার হিসাব নেই। যে কারণে, তাদের অনেকেই আন্তর্জাতিক পর্যায় তো দূরে থাক, প্রথম শ্রেণির পর্যায়েও টিকতে পারবেন না। এদেশে বয়সভিত্তিক দল থেকে উঠে এসে শুধু টিকে থাকার মতো প্রবলভাবে টিকে থাকলেন মাশরাফি-সাকিব-মুশফিক-তামিম-রিয়াদ। মুস্তাফিজ-সৌম্য-লিটন-সৈকত-তাসকিন-মিরাজদের হাতে যে দল নিরাপদ, তাও বলা যাচ্ছে না। দারুণ শুরুর পর আজ প্রত্যেকেই ধুঁকছেন! অথচ, তাঁদের সমসাময়িক যারা, তাদের নামগুলো ‘ওয়ার্ল্ডক্লাস’ কাতারে উঠে গেছে।

এক সময় এই যুব দলের অধিনায়ক ছিলেন সোহরাওয়ার্দী শুভ, মাহমুদুল হাসান লিমন। এই নামগুলো আজ হারিয়ে গেছে। আরও এমন নাম আছে যারা, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটেও নিজের জায়গা পাকা করতে পারেননি।

নাহ, একটা জাতীয় দলে সবাই সুযোগ পাবে না। এটা সম্ভব না। আবার সবাই বয়সভিত্তিক বিশ্বকাপ দল থেকেও জাতীয় দলে আসবে না। বাইরে থেকেও অনেকে আসবে। কিন্তু, সবাই মিলে একটি শক্তিশালী জাতীয় দল গড়ে তোলা সম্ভব। একদম বিশ্বজয়ী জাতীয় দল। খেলবে ১১-১৪ জন, কিন্তু তাদের কমপ্লিমেন্ট করবে একটা শক্তিশালী কাঠামোতে বেড়ে ওঠা পোড় খাওয়া ক্রিকেটাররা।

অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট এমন পর্যায়ের যে তাদের রাজ্য বা কাউন্টি দলে সুযোগ পেতেই ঘুম তল্লাটে উঠবে৷ জাতীয় দল তো দূরাস্ত! এতোটাই দূরাস্ত যে তাঁর সময়ের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান হয়েও মাইক হাসিকে ১০ হাজার ফার্স্টক্লাস রান করে অস্ট্রেলিয়া দলে ঢুকতে হয়েছে। আরেকজন ম্যাথু হেইডেন, দু’ একবার অসি দলে সুযোগ পেয়েও কাজে লাগাতে না-পারা ব্যাটসম্যান ৩০ বছর বয়সে দলে জায়গা পাকা করে বনে গেছেন সর্বকালের অন্যতম সেরা টেস্ট ওপেনার!

অথচ, আমাদের এখানে বয়স ৩০-৩১ মানেই ক্যারিয়ারের অগস্ত্য যাত্রা! কতগুলো প্রজন্মকে আমরা ৩১-৩২-৩৩ বছরেই শেষ করে দিয়েছি তার হিসাব করতে গেলে হতাশা বাড়বে। বিনিময়ে জায়গা দিয়েছি একদমই অপ্রস্তুত আনকোড়া ১৮-১৯-২০ বছর বয়সী এমনই কোন আকবর-শরিফুল-সাকিব-তামিম-জয়-হৃদয়দের। ফল যা হওয়ার তা-ই হয়েছে!

ভারত আজ বিশ্বমানের কাঠামোর ওই ইঙ্গ-অসি পর্যায়ে চলে গেছে বলেই ওদের পাইপলাইনটা এতো শক্তিশালী। বিশ্বকাপ হেরে যাওয়া এই ক্রিকেটাররাই এরপর রাজ্য দলে সুযোগ পাওয়ার জন্য ঝাঁপাবে। রঞ্জি, দুলীপ, মুশতাক, বিজয় হাজারে ট্রফিগুলো খেলে খেলে তৈরি হবে৷ ছিটকে গেলে তুলে টানার জন্য এনসিএ আছে। আর আছে আইপিএল। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ঠিক নিচে আছে ‘এ’ দল। আছে ‘বি’ দল। তার পর বাছাধনের যদি দম থাকে, তাহলে জাতীয় দলের টিকির দেখা মিলবে!

দেখা না মিললেও সমস্যা নেই। ঘরোয়া ক্রিকেট খেলেও রুটি-রুজির জোগাড় তো হবেই, বসে বসে দুই পুরুষ খেতেও পারবে। আর বোর্ড প্রেসিডেন্ট যদি সৌরভ গাঙ্গুলী নামের কেউ হন, তাহলে তো প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলেই কেউ ক্যারিয়ার শেষ করে হয়ে যাবেন কোটিপতি! আইপিএলও লাগবে না। ক্যারিয়ারের চিন্তা নেই। তুমি শুধু প্রক্রিয়াটা ঠিক রেখে খেলে যাও।

এই যে ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট হওয়া যশস্বী জয়সওয়াল ছেলেটা, ম্যাচ হেরে কষ্ট পাওয়ার পরও ইয়ান বিশপকে নিজের ভবিষ্যত বিষয়ে বলে গেলেন, ‘আমি আমার খেলার প্রসেসটা (প্রক্রিয়া) ঠিক রাখতে চাই। প্রসেস ইজ ইম্পর্ট্যান্ট।’ একটা ছোট্ট ছেলে, তিনিও জানেন, বড় কথা বলে লাভ নেই। এই তিনি কিছুই না। কিছু একটা হতে গেলে ওই প্রক্রিয়াটা ঠিক রাখাটাই জরুরি। এই ছেলেটা এজন্যই অনেক দূর যাবেন।

আরেকজন অনেক দূর যাবেন এই প্রক্রিয়া আর তাঁর প্রতিভার গুণে। রবি বিষ্ণোই! ওইটুকু রান করে তাঁর কল্যাণেই তো ভারত চোখ রাঙাতে শুরু করে দিয়েছিল। কী দুর্দান্ত আক্রমণাত্মক লেগ স্পিনার! যতটা না লেগ স্পিনার, তার চেয়েও বেশি গতিশীল গুগলিম্যান। খুব বেশি দিন হয়তো লাগবে না, এই ছেলেটা মেইনস্ট্রিম ক্রিকেট কাঁপাতে চলে আসবে রশিদ খানের মতো। বলটা ছাড়েও পেছন থেকে। তবে, তাঁকে ওরা ঘষে-মেজে আরও শান দেবে। শুরুতেই পাচ্ছে অনিল কুম্বলকে। ভাবা যায়! ভারতের ওই প্রক্রিয়াটার কারণেই ওদের বেঞ্চ এতো শক্তিশালী, আর জায়গা পাওয়াও এতো কঠিন!

আমাদের ক্ষেত্রে কী হয় তা তো আমরা জানিই। বোর্ড প্রেসিডেন্ট তো সংবাদ সম্মেলনেই বলে ফেললেন, সময় হয়ে গেছে কঠোর হওয়ার, পাইপলাইনে অনেক খেলোয়াড় আছে, নাক গলাতে চাননি, কিন্তু তিনি কথা না বললে কাজ হবে না… ব্লা ব্লা… হয়তো কাগজ-কলম নিয়ে বসে গেছেন ছোটদের কাকে জাতীয় দলে এখনই নেওয়া যায় সে তালিকা করতে। তাই হয়তো লিটনের বদলে আকবর, মুস্তাফিজের বদলে শরিফুল, মাশরাফির বদলে সাকিব, সাইফউদ্দিনের বদলে অভিষেক, মিরাজের বদলে রকিবুল… তালিকা শেষ হবে না।

এর পর আছে পুরস্কার৷ গাড়ি-বাড়ি প্রদান। গণসম্বর্ধনা। গণভবন দর্শন। না, পুরস্কার দেন ওদের। কিছু প্রেরণার দরকার আছে। তবু, যুবা মনে যেন একটা অপ্রাপ্তি থাকে আর সবচেয়ে বেশি থাকে ক্রিকেটীয় প্রাপ্তির আলোকচ্ছটা, সে ব্যবস্থাটাও করেন।

ভবিষ্যত ভাবনাটা যেন এমন হয় যে এদের মধ্য থেকেই উঠে আসে সেই ব্যাটসম্যান টেস্ট ক্রিকেটে যার গড় হবে ধারাবাহিকভাবে পঞ্চাশের উপরে, বোলিং গড় অন্তত পঁচিশ-ছাব্বিশ। ২০ বছরেও আমরা সেটা পেলাম না, এই লজ্জাবোধটাই আমাকে ক্রিকেট নিয়ে মৌসুমী আবেগাক্রান্ত হতে বাধা দেয়।

যে নিউজিল্যান্ডকে ‘বাংলাওয়াশ’ করেছিলাম, তারা আজ কোথায় আর আমরা কোথায়? যে আমরা ইংল্যান্ডকে স্পিনিং ট্র্যাকে কাবু বানিয়ে ‘মিরাজের সিরিজ’ তৈরি করে মনে করেছিলাম টেস্টেও আমরা বড় জাত হয়ে গেছি, সেই আমরা যেন মনে রাখি ইংল্যান্ডে টেস্ট ক্রিকেটের এখন এক নম্বর দল।

প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট, ঘরোয়া ক্রিকেট যদি এমন নড়বড়েই থাকে, তাহলে কী হবে সেটা জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের সদ্যই জাতীয় লীগে মারাত্মক পারফরম্যান্সের পরও পাকিস্তানের বিপক্ষে এমন লেজেগোবরে দশা দেখেই বুঝে ফেলার কথা।

এজন্যই বলছিলাম, সবাই মিলেই একটা শক্তিশালী জাতীয় দল গড়ে তুলতে হয়। যিনি কোনদিনও জাতীয় দলে সুযোগ পাবেন না, তাকেও এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যেন তিনি ঘরোয়া ক্রিকেটে তামিম ইকবালের একটা রান তুলতে কিংবা মাশরাফি মুর্তোজার একটা উইকেট পেতে ঘাম ছুটিয়ে দেবেন। অথচ, কদাচ এমন হয়!

এদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের উইকেটগুলো স্পোর্টিং নয়। ক্রিকেট সেন্টারগুলোর বিকেন্দ্রীকরণ নেই৷ লজিস্টিকস যাচ্ছেতাই। আম্পায়ারিং পক্ষপাতমূলক। ফিটনেস ঠিক রাখার সুযোগ কম। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ধুঁকলে সবাই এই প্রেসক্রিপশনটাই দেন যে ‘গো টু ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট, কারেক্ট ইউরসেলফ, দেন কাম।’ এটা অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। কিন্তু, আমাদের কেউ একবার জাতীয় দল থেকে বের হয়ে গেলে, তার ফিটনেসের এমন হাল হয় যে, তথৈবচ! আমাদের জাতীয় পর্যায় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ফিটনেস শুধু নয়, খেলার মানেরও পার্থক্য এতোটাই।

আর কম্পিটিশন! আমাদের ছিল একটা সারা বিশ্বে নামওয়ালা ক্লাব ক্রিকেট প্রতিযোগিতা। ওয়াসিম আকরাম, অর্জুনা রানাতুঙ্গা, সনৎ জয়সুরিয়ার মতো কিংবদন্তিরা খেলতে আসতেন। ফ্রাঞ্চাইজি ক্রিকেটের দাবানল আর রাজনীতির যূপকাষ্ঠে ওটাকে আমরা পুড়িয়ে মেরেছি। সে এক কাল ছিল, যখন ক্লাবের খেলায় গ্যালারি ভরে যেত৷ আজ বিপিএলেও দর্শক খড়া! আর দর্শক হিসেবে তো আমরা আজও টেস্ট ঘরানার হতেই পারলাম না। আমাদের যত মাতামাতি রঙিন পোশাকের ক্রিকেট নিয়ে। একটা টেস্ট জাতির দুর্দশার একদম প্রতীকী চিত্র! অন্যভাবে বললে অবশ্য এটাও বলতে হবে, দর্শক যাবেন কেন? টেস্ট ক্রিকেটটা বাংলাদেশ খেলতে শিখলে না যাবে!

টেস্টে খারাপ খেললে, চার দিনের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ফিরে যেতে হয়। সেটা যত নিচু মানেরই হোক না কেন। অথচ, যারা তাও কিছুটা মানটা বাড়াতে পারতেন, জাতীয় দলের সেই নামি ক্রিকেটাররা পারলে ক্ষেত্র বিশেষে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলতেই চান না! এদেশের সবচেয়ে বড় ক্রিকেটিং আইকন সাকিব আল হাসান সর্বশেষ কবে জাতীয় লীগের ম্যাচ খেলেছেন জিজ্ঞেস করুন। তিনি নিজেও উত্তর দিতে পারবেন কি না কে জানে! আপনাদের মনে পড়বে, সাকিব দ. আফ্রিকা সফরের টেস্ট সিরিজ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন। একটা দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটার রঙিন পোশাকে খেললেন, অথচ টেস্ট থেকে ছুটি নিলেন – এটা ক্রিকেটে একটা বিস্ময়!

গিলক্রিস্ট বা ধোনির কথা এখানে আসছে না। কেননা, তাঁরা নিজেদের ফিটনেসকে আর টেস্ট ক্রিকেটের যোগ্য মনে করেননি বলেই শুধু রঙিন পোশাকে খেলে গেছেন।

যাই হোক, আবার আনন্দের কথায় ফিরি।

বহুদিন পর বাংলাদেশের একটা দল দেখা গেল, যারা সত্যিকারের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মানসিকতা নিয়ে মাঠে নেমেছে একদম প্রথম বল থেকে। কী দারুণ শারীরিক ভাষা! কী আক্রমণাত্মক! বিশ্বকাপের ফাইনাল একটা ম্যাচ শুধু ব্যাট-বলের ভরসায় জেতা মুশকিল। বাংলাদেশের যুবারা যে সেখানেই আটকে থাকেনি, এটাই বড় ব্যাপার। কিন্তু, যে বোলিং আর ফিল্ডিং টানা করে গেল দল হিসেবে, এটাই ম্যাচের পার্থক্য গড়ে দিল। শরিফুল-সাকিব-রকিবুলের বোলিং, হৃদয়-শরিফুলের ফিল্ডিং হৃদয়ে গাঁথা থাকবে বহু বহু কাল।

আরেকটা বিষয় বিজয়ের কারণে আড়ালে চলে গেছে। হারলে এটাই সবচেয়ে আলোচিত হতো। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের শট নির্বাচন। প্রতিটি আউট একদম বাজে শট আর অপ্রয়োজনীয়তায় ভরা ছিল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এগুলো বিশাল ফারাক হয়ে যেত এবং বড় ভাইদের কল্যাণে সেটাই হয়।

একবার মনে হচ্ছিল, ইতিহাস লেখা বোধহয় আর হলো না! মনে হচ্ছিল, এ এক হতভাগা দেশ, যার খোদ নিজের ‘ইতিহাস’ই ভুলভাবে পাঠ করা হয় সময়ে-অসময়ে, সে কী করে বদলাবে পরাজয়ের ইতিহাস!

আর ভারত যেভাবে আক্রমণ করে গেল, এই পর্যায়ের ক্রিকেটে তা এক কথায় দুর্দান্ত। ঠিক এ কারণেই একটা ইনিংস ‘আকবর দি গ্রেট’ হয়ে গেছে! কী অসামান্য ধৈর্য্য নিয়ে, ম্যাচের পরিস্থিতি মেনে, নিজের সীমার সবটুকু নিংড়ে দিয়ে বাংলাদেশের যুব অধিনায়ক ঠাণ্ডা মাথায় ম্যাচটা বের করে আনলেন! যে কাজটা বহুবার মুশফিক-রিয়াদরা করতে ব্যর্থ হয়েছেন, ঠিক সেই কাজটাই আকবর নিখুঁতভাবে করে পথ দেখালেন পুরো বাংলাদেশকে। চোটে পড়া ইমনের ইনিংসটাও অসাধারণ। ইমন না থাকলে আকবরের জন্য কাজটা কঠিন হতো আরও। তবে, আকবরের ইনিংসটা রূপকথার অংশ হয়ে গেল!

বাংলাদেশের ক্রিকেটকে বদলে দিয়েছিল ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি জয়। মনে পড়ে আমাদের সেই শৈশবে উঁকি দিয়েছিল বড় ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন। সেবার নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বে অধিনায়ক আকরাম খান ৬৮ রানের অপরাজিত ইনিংসটা না খেললে বাংলাদেশের টুর্নামেন্ট থেকেই বিদায় নিশ্চিত ছিল। যে কারণে বলা হয়ে থাকে যে, বাংলাদেশের ক্রিকেট আসলে আকরাম খানের একটা ইনিংসের ওপরে দাঁড়ানো!

আকরাম খানের কিংবদন্তিগাঁথার পাশে বসানোর মতো আরেকটা ইনিংস পাওয়া গেল ২৩ বছর পর। আকবরের অপরাজিত ৪৩! এই ইনিংসের ওপরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বহুদিন দাঁড়িয়ে থাকবে। বহুদিন!

এই বিশ্বজয় এমনই ঝড় বইয়ে দিবে ঘরে ঘরে, দেখবেন, আরও আরও নতুন ক্রিকেটার জন্মাচ্ছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই রূপকথা সঙ্গে নিয়ে বড় ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখবে, যতদিন বড়রা বিশ্বজয়ী না হয়।

বিজয়, বিশ্ববিজয় এমনই এক পাগলা ঘোড়ার নাম!

বাংলাদেশে কাঠামোগত প্রতিভা বিনাশের কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম। এ বিনাশ থামুক। থেমে যাক। গত ১৩ বছর ধরে যে দুটি মহাসমুদ্রকে খুব কাছ থেকে দেখেছি – বিশ্ববিদ্যালয় ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট – তাদের নিরিখেই প্রতিভানাশের বাস্তবচিত্রটি চিত্রিত করলাম। মন থেকে চাই, এই চিত্র বদলাক। বদলে যাক। আকবররা প্রকৃত অর্থেই ‘দি গ্রেট’ হয়ে উঠুক!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।