বাংলাদেশ-ভারত: বিতর্কিত এক নো-বল ও ফুলে ফেঁপে ওঠা এক দ্বৈরথ

বাংলাদেশ ও ভারত গত কয়েক বছর ধরেই ক্রিকেটে দারুণ এক লড়াই তৈরি করে ফেলেছে।  বছর পাঁচেক আগে বিতর্কিত এক ‘নো বল’ থেকে এই আগুনে ঘি পড়েছিল। একেঅন্যের বিপক্ষে খেপে উঠেছিল দু’দেশেরই জনতা।

২০১৫ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল, মেলবোর্নে বাংলাদেশ তাঁদের ক্রিকেট ইতিহাসেরই সবচেয়ে বড় ম্যাচে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ভারতের বিপক্ষে মাঠে নেমেছিল।

শক্তিশালী ভারতীয় ব্যাটিং লাইন আপকে চেপে ধরা মাশরাফিদের বোলিং লাইনআপ আম্পায়ারদের এক ভুল সিদ্ধান্তের পর খেই হারিয়ে ফেলে। পরে আর ম্যাচেই ফিরতে পারেনি।

রোহিত শর্মা ৯০ রানে ব্যাট করছিলেন। তখন তিনি ব্যাটিং পাওয়ার প্লে-কে ব্যাবহার করতে আক্রমণ করার দিকে ঝুঁকছিলেন, তবে রুবেল হোসেনের ফুল টস বলে মিস টাইমড এক পুল শট আকাশে উড়ে ধরা পড়ে মিড উইকেটে ইমরুল কায়েসের হাতে।

কিন্তু, বাংলাদেশিদের উল্লাস হতাশায় পরিণত হয় লেগ-আম্পায়ার আলিম দারের নো বল ডাকার পর, অনেকেই এটা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। কয়েক মিলিয়ন মানুষ তা ঘরে বসে দেখছিলেন, এবং অবিশ্বাস্য এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদও জানিয়েছেন।

স্ট্রাইক করার মুহূর্তে বলটি রোহিতের কোমরের কাছে ছিল,  তবে তিনি বলটি ঠিকভাবে নেমে আসার আগেই তিনি হিট করেন, তাই বলটি কোমরের নিচে থাকলেও বোঝা যায় নি।

তবে আম্পায়াররা টিভি আম্পায়ারের কাছে সিদ্ধান্ত না পাঠানোয় সবাই সমালোচনা করেন, মাঠের আম্পায়াররা প্রায়ই এমন পরিস্থিতিতে পড়ে ঠিকই, কিন্তু তাঁদের আচরণ অনেক বাংলাদেশি ভক্তের সন্দেহজনক বলে মনে হয়েছিল।

এই ভক্তদের মধ্যে একজন ছিলেন তৎকালীন আইসিসি সভাপতি আ হ ম মোস্তফা কামাল। তিনি বিশ্ব মিডিয়াতে ক্ষোভ জানিয়েছিলেন,  কর্মকর্তাদের আহবান জানিয়েছিলেন তদন্ত করতে এবং আম্পায়ারদের বিরুদ্ধে একটি দলের পক্ষে থাকার অভিযোগ তুলেছেন।

বলা বাহুল্য, আইসিসি তাঁর বক্তব্যে খুশি ছিল না,  কারণ উনাকে চ্যাম্পিয়নদেরকে ট্রফি হাতে তুলে দিতে দেওয়া হয়নি,
যা আইসিসির সভাপতিই দিয়ে থাকেন সাধারণত।  কিন্তু, সেবারে এটি দেন আইসিসির চেয়ারম্যান এন শ্রীনিবাসন। ভাগ্যের কি পরিহাস, এই শ্রীনিবাসনের প্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়া সিমেন্টের দল চেন্নাই সুপার কিংস পরে আইপিএলের দুর্নীতি বিষয়ক মামলায় ফেঁসে যায়।

বাংলাদেশি মিডিয়া এবং অনুরাগীরা এই ঘটনাকে হারিয়ে যেতে দেয়নি, বরং সেই থেকে এক দুর্দান্ত লড়াই যেন শুরু হয়ে গেল। মাঠে কিংবা মাঠের বাইরে।

সেবছরই জুনে, ভারত এক উড়ন্ত বাংলাদেশ দলের মুখোমুখি হয়, যারা বিশ্বকাপে অমন সমাপ্তির পর পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করেছে। বাংলাদেশের মিডিয়া এই সিরিজকে রীতিমত প্রতিশোধের সিরিজ বানিয়ে ফেলেছিল।

তিন ম্যাচের সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে মাশরাফি বিন মুর্তজা চার পেসার মাঠে নামিয়ে সবাইকে চমকে দেন, মুস্তাফিজুর রহমান নামের অভিষিক্ত তরুণ দুর্দান্ত কাটার প্রদর্শনে ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের গুটিয়ে দিয়েছিলেন।

ভারতের অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি যখন রান নেবার সময় আগের ওভারে মুস্তাফিজকে ধাক্কা দেন। পরের ওভারে ধোনিকে আউট করার পর সাকিব আল হাসান মাঠে রীতিমত আগ্রাসী ক্রোধ দেখান। সেই প্রতিক্রিয়ায় বুঝিয়ে দেয় এই ম্যাচ আর দশটা সাধারণ ক্রিকেট ম্যাচ থেকে আলাদা।

ম্যাচ শেষে ধোনি ও মুস্তাফিজ উভয়কেই ম্যাচ রেফারি তিরস্কার করেন। তাদের ম্যাচ ফিয়ের যথাক্রমে ৭৫ ও ৫০ ভাগ কেটে রাখেন।

সিরিজের পরে, মুস্তাফিজের কাটার দারুণ আলোচনায় আসে। এবং বাংলাদেশি মিডিয়া ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের দুর্বলতা নিয়ে ব্যাঙ্গও করে যা ভারতীয়রা সমালোচনা করে। এর পর থেকে, ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচ তীব্র হাইভোল্টেজ ম্যাচ হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পায়।

পরিসংখ্যান অবশ্য একতরফা প্রতিদ্বন্দ্বিতাই দেখাবে,  ২০১৫ সাল থেকে বাংলাদেশ ভারতের বিপক্ষে মাত্র একটি জয় পেয়েছে, যা গত বছর দিল্লিতে টি-টোয়েন্টি ম্যাচে এসেছিল। তবে জয়-পরাজয়ের এই পরিসংখ্যান বোঝাতে পারছে না, বাংলাদেশ গত কয়েক বছরে ভারতের সাথে কতটা তীব্র লড়াই করেছে শেষ বল পর্যন্ত।

বাংলাদেশীদের হৃদয়ে রীতিমত রক্তক্ষরণ হয় যখন জয়ের কিনারে নিয়ে আসা ম্যাচটাতেও মুশফিক ও রিয়াদ শেষ ৩ বলে ২ রান নিতে পারেননি। সে ম্যাচ হারলে ভারত নিজেদের মাঠে দারুণ অপদস্থ হত।

এছাড়াও নিদহাস ট্রফির ফাইনাল, এশিয়া কাপ ফাইনালে ম্যাচের শেষ বল পর্যন্ত লড়েও ভারত অবিশ্বাস্যভাবে ম্যাচ ছিনিয়ে আনে।

শুধু পুরুষরাই নয়। প্রমীলা দল ভারতকে হারিয়ে প্রথমবারের মত এশিয়া কাপের ট্রফি ঘরে তোলে, এবং অনূর্ধ্ব-১৯ দল বিশ্বকাপ জিতে নেয়।  তবে ম্যাচ শেষে অপ্রীতিকর ঘটনা আমাদের বুঝিয়ে দেয়, এই লড়াই জমে গেছে!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।