গর্বের ক্রন্দনধ্বনি

মঞ্চ থেকে নাম ঘোষণা হল। গোল্ডেন বল পেলেন লুকা মড্রিচ। অথচ ঠোঁটে এক চিলতে হাসিও নেই। থাকবে কি করে, ভাল খেলার পরও যে বিশ্বকাপ স্বপ্নকে জলাঞ্জলি দিতে হয়েছে একটু আগেই।

স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী কোলিন্ডা গ্রাবার কিতারোভিচ জড়িয়ে ধরলেন, কানে কানে কি যেন বললেন। চোখ দুটো ছলছল। ঠোটে হাসি, কি আজব মেল বন্ধন। এক দিকে বিশ্বকাপ হারানোর বেদনা, অন্যদিকে বুক চিতিয়ে লড়াই করার গর্ব – সব যেন মিলে মিশে একাকার।

মড্রিচ তখনও নির্বিকার, ভাবলেশহীন তাঁর চাহনী। তখনও যেন ঠাউর করতে পারছিলেন না কিছু। শিশু বয়সে বলকান যুদ্ধ সামলে ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখেছেন, সেই তিনি কি না এক পরাজয়ে কাবু হয়ে গেলেন।

কে জানে, ফাইনাল হারের অভ্যাস নেই বলেই কি না! এর আগের ১০টা ফাইনালের কোনোটাই যে হারতে হয়নি। যদিও সবগুলোই ছিল ক্লাব ফুটবলে। আন্তর্জাতিক ফুটবলটা যে আলাদা, এসবই হয়তো ভাবছিলেন সময়ের অন্যতম সেরা এই মিডফিল্ডার।

তবে, ফাইনালের ফলাফল আর যাই হোক – এই বিশ্বকাপ মড্রিচের, এই বিশ্বকাপ এক ঝাঁক ক্রোয়াট বীরের। বিশ্বকাপ শুরুর আগে কজনাই বা ভাবতে পেরেছিল যে এই দলটাই চলে যাবে ফাইনালে। কে ভেবেছিল যে বছরখানেক আগেও যিনি মধ্যপ্রাচ্যের এক ক্লাবের কোচ ছিলেন, সেই জ্লাটকো ডেলিচ থাকবেন বিশ্বকাপ ফাইনালের ডাগ আউটে।

কিংবা একবার ওই ডেভর সুকারের কথাই ভাবুন না। ২০ বছর আগে যিনি প্রথমবার বিশ্বকাপে দলকে নিয়ে গিয়েছিলেন সেমিফাইনালে, তিনি কি সেদিন জানতেন, কোনো এক বর্ষনমুখর রাতে রাশিয়ার মস্কোতে দাঁড়িয়ে অধুনা সভাপতির বেশে তিনি বিশ্বকাপ হারানোর আক্ষেপ করবেন!

এমন অনেক কিছুই হয়েছে যা আগে কেউ ভাবতেও পারেনি। ক্রোয়াটরা এতটাই চমকে দেওয়া ফুটবল খেলেছে যে, ফাইনালে ফ্রান্স যোগ্য দল হিসেবে জিতেছে – এমনটা বলার লোকও খুব বেশি খুজে পাওয়া যাচ্ছে না।

বিশ্বকাপটা ফ্রান্স জিতেছে ঠিকই, সবটুকু ভালবাসা নিয়ে গেছে ক্রোয়েশিয়া। আর কোনো বিশ্বকাপ শেষেই সে সম্ভবত পরাজিতদের নিয়ে এতটা আলোচনা হয়নি। এবার আলোচনা হতে বাধ্য করেছেন ক্রোয়েশিয়ান তারকারা।

তাইতো, মঞ্চে যখন উঠছিলেন, তখন রীতিমত দু’পাশ থেকে গার্ড অব অনার দিল ফরাসি শিবির। ফুটবলটা শেষ অবধি সবচেয়ে মানবিক, সবচেয়ে আবেগের খেলা। আবেগটা যেন ধরে রাখতে পারল না মস্কোর আকাশও।

ক্রোয়াটদের গলায় যখন রানার আপের মেডেল মস্কোর ক্রন্দনধারা তখন মুষলধারে বয়ে চলেছে। জলধারা ছিল প্রতিটা ক্রোয়াটের চোখেও। শোকের নয়, গর্বের, প্রাপ্তির, উত্থানের।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।