সেবা প্রকাশনীর কাছে খোলা চিঠি

প্রিয় সেবা,

আমি পাঠক নার্সারিতে পড়ার সময় থেকে, আর সেবার পাঠক ক্লাস ওয়ান থেকে।

ক্লাস ওয়ানে থাকার সময় একদিন ছোটফুপির বাসায় গিয়েছি। সমবয়সী কেউ নেই। নিজের স্বভাবমত গল্পের বই খুঁজতে খুঁজতে ছোট একটা র্যা কে ছেঁড়া কতগুলি বই পেয়ে গেলাম। চেহারা দেখে পছন্দ হল না। তাও একটা খুলে পড়া শুরু করলাম। অনেক কিছুই বুঝতে পারছি না, ঘটনা ঘটছে বাংলাদেশেও নয়, আমেরিকায়। তবু কি এক জাদুতে আটকে গেলাম। পুরো বইটা শেষ করার আগেই বাবা-মা বলল বাসায় যেতে হবে। চেয়ে নিয়ে এলাম বইটা। শেষ করলাম। করেই মনে হল- আরেকটা দরকার, এমন আরেকটা পড়তে চাই।

বইটা ছিল তিন গোয়েন্দার পুরনো ভূত।

তিন গোয়েন্দা সিরিজ নিয়ে জানতে শুরু করলাম। মামাত বোনরা পড়ে, ওদের কাছ থেকে চেয়ে আনলাম। মা-বাবার কাছে ঘ্যানঘ্যান করে কেনালাম। স্কুলের যে বান্ধবীর বাসায় আছে তার কাছ থেকে ধার করে পড়লাম। জন্মদিনের গিফট হিসাবে সবার কাছে চাইলাম। পড়লাম, মুগ্ধ হলাম, ভক্ত হলাম।

তিন গোয়েন্দার কাহিনী মৌলিক নয় সেটা জানি। থ্রি ইনভেস্টিগেটরস, হার্ডি বয়েজ, ফেমাস ফাইভ, সিক্রেট সেভেন, গুজবাম্পস- নানান বিদেশী কাহিনী থেকে রূপান্তর। কিন্তু মুন্সিয়ানার সাথে রূপান্তর করা ছাড়াও রকিব হাসানের শক্তিশালী দিক ছিল চরিত্র আঁকার ক্ষমতা, তাদের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার ক্ষমতা। তাই নানান বই থেকে কাহিনী তুলে আনলেও কিশোর তীক্ষ্ণধী কিশোরই, মুসা শক্তিমান, সরল কিন্তু সাহসী মুসাই, রবিন বইপোকা আর পাহাড়পাগল রবিনই। আর তারা যখন বদলেছে তখনও অন্য মানুষ হয়ে যায় নি কখনওই। গ্রিনহিলসের তিন গোয়েন্দা বয়সে কম হলেও রকি বীচের তিন গোয়েন্দা থেকে বুদ্ধি-বিবেচনায় কোনো অংশে কম নয়, গাড়ির জাদুকর, গোরস্থানে আতংক, অবাক কাণ্ড-এর তিন গোয়েন্দাও গাড়ি, বিপরীত লিংগ আর মিউজিকে যতই আগ্রহ দেখাক, দিনের শেষে বুদ্ধি, পরিশ্রম আর বন্ধুত্ব দিয়ে শক্ত রহস্য সমাধান করা এককাট্টা এক দলই।

আগের বইগুলি আমি কতবার পড়েছি তার হিসাব নেই। কোন ভলিউমে কী কী আছে সেটা মুখস্থ বলে দিতে পারব এখনও। সহজ রসিকতা, সহযোগিতা আর পরিণত বুদ্ধির কোনো কমতি ছিল না তিন গোয়েন্দার গোয়েন্দাগিরিতে, কাহিনী ছিল টানটান, ভিলেনরা বুদ্ধিমান, অভিযান ছিল উত্তেজনায় ভরা। তারপর রকিব হাসান লেখা বন্ধ করে দিলেন। ‘শামসুদ্দিন নওয়াব’ নামের আড়ালে অনেক লেখক কলম ধরলেন। তারপর কী হল সেটা ছবিতে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। প্রথমটা ‘রেলগাড়িতে খুন’, ভলিউম ১৪৪. পরেরটা তো দেখাই যাচ্ছে।

তিন গোয়েন্দা সিরিজ নিয়ে ভেবে আমার সবচেয়ে মুগ্ধ করার মত যে ব্যপারটা মনে হয়েছিল সেটা ছিল- প্রকাশক এমন মনে করেন নি যে ‘এইসব বিদেশের এত কঠিন কাহিনী পোলাপান বুঝবে না।’ প্রথম যে বই, ওটার টুইস্টই হচ্ছে- পাইপ অর্গান নামের বাদ্যযন্ত্রকে শব্দেতর তরংগে বাজালে সেটা নার্ভাস সিস্টেমে অস্বস্তি সৃষ্টি করে, শেষে আতংক লাগে। এই জিনিস বাংলাদেশের সব প্রান্তের কিশোর তরুণদের মাথায় ঢুকবে না, এই রকম আশংকা করে প্রকাশক জিনিসটাকে সোজা, ডাম্ব ডাউন করতে যান নি। রূপালি মাকড়শা, কাকাতুয়া রহস্য, বুদ্ধির ঝিলিক, ইন্দ্রজাল, ঘড়ির গোলমাল, নকল কিশোর-এর মত দারুণ গল্প, অথৈ সাগর, ভীষণ অরণ্য-এর মত দুর্দান্ত এ্যাডভেঞ্চার কতশত পাঠকের ধূসর দুনিয়া রঙিন করেছে তার ইয়ত্তা নেই, বাইরের পৃথিবীর কতকিছু জানতে পেরেছে বইগুলি থেকে।

এমন বুদ্ধিমান, সাহসী, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন তিন গোয়েন্দাকে এই রকম ফালতু চরিত্রে বদলে ফেলতে তোমার খারাপ লাগল না, সেবা? এই বস্তাপচা ‘গল্প’ নামের আধা-প্যারানরমাল, আধা-উদ্ভট আবর্জনা ওদের ‘রহস্যের’ নামে ছেপে বের করতে খারাপ লাগল না? একটুও খারাপ লাগল না?

শামসুদ্দিন নওয়াবের নামে লেখা শুরুর দিকের বই তবু এতটা খারাপ ছিল না। ঝড়ের দ্বীপ, ব্রাউন্সভিলে গণ্ডগোলের মত কয়েকটা বই ভালই ছিল। তবে চরিত্রের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল তখনই, যেমন স্বভাব-আচরণ-সংলাপ কিশোর, মুসা আর রবিনের হওয়ার কথা ছিল, সেটা ছিল না। তবু গল্প ভাল ছিল। তারপর কিছু জঘন্য গল্প বের হতে শুরু করায় (গবলিনের কবলে, আরো কি কি যেন, এত বাজে যে মনে থাকে নি) কেনা আর পড়া বাদ দিয়েছিলাম। এখন অবস্থা তার চেয়েও খারাপ হয়েছে। কিউপিড। অনেস্টলি।

সেবা, তুমি তিন গোয়েন্দাকে মেরে ফেল। রকিব হাসান এখন আলাদাভাবে লিখছেন, সেটাও পড়েছি, এবং সেটাও খারাপ। শামসুদ্দিন নওয়াবের নামে যা বের হচ্ছে সেটা তিন গোয়েন্দা হিসাবে তো দূরের কথা, এমনি বাচ্চাদের বই হিসাবেও ফালতুর নিচে। শুধুমাত্র তিন গোয়েন্দার নাম ভাঙানোর জন্য, বই বিক্রির জন্য এই অসাধারণ চরিত্রগুলিকে হাস্যকর, অপরিণত সং-এ রূপান্তর না করলেও তো তোমার চলে যাবে। যাবে না?

ওদের মেরে ফেল। মরে যাক জিনিয়াস কিশোর পাশা, দিলদরিয়া মুসা আমান, জ্ঞানী-পড়ুয়া রবিন মিলফোর্ড। মরে যাক জিনা, ফারিহা, রাফি, টিটু, মেরিচাচী, রাশেদ চাচা, বোরিস, রোভার, ভিক্টর সাইমন, ডেভিড ক্রিস্টোফার, শুঁটকি টেরি। সবাই মরে যাক। এর চেয়ে ভাল হবে তবু।

ঠিক বলেছি, বলো?

ইতি,

নিখোঁজ ‘তিন গোয়েন্দা’র একজন একনিষ্ঠ পাঠক

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।