জীবনের একটি হৃদয়গ্রাহী উদযাপন

একেবারেই অভিনব আর সতেজ একটা ধারণাই হল ‘১০২ নট আউট’ সিনেমার শক্তিমত্তা। আর দশটা গৎবাঁধা হিন্দি সিনেমার মত এটাও সম্পর্কের গল্প। তবে, সৌভাগ্যক্রমে গল্পটি আবর্তিত হয়েছে ১০২ ও ৭৫ বছর বয়সী দুই বাপ-বেটার সম্পর্ককে কেন্দ্র করে।

স্টোরি টেলিংটা কখনোই ‍খুব বেশি জটিল, দুর্বোধ্য কিংবা কাটখোট্টা হওয়ার সুযোগ ছিল না। কারণ, গল্পটায় আছেন মূলত তিন জন – ১০২ বছর বয়সী বাবা দাত্তারেয়া ভাখারিয়া (অমিতাভ বচ্চন), ৭৫ বছর বয়সী ছেলে বাবু লাল (ঋষি কাপুর) ও তাঁদের নিত্যদিনের সহকারী ধিরু (জিমিত ত্রিবেদী)।

মুম্বাইয়ের গুটিকয়েক জায়গায় সিনেমাটির শ্যুটিং হয়েছে। ভাখারিয়া হাউজের চার দেয়ালের ভিতরেই অধিকাংশ শ্যুটিং হয়েছে। পরিচালক উমেষ শুকলা নিজের সীমাবদ্ধতাকে শক্তিমত্তায় পরিণত করেছেন। ছবিটিতে রোমাঞ্চকর থ্রিলিং অনুভূতি এনে দেওয়া কোনো দৃশ্য নেই, নেই কোনো অননুমেয় টুইস্ট, অকারণে খুব বেশি চালাক সাজার চেষ্টা করা হয়নি।  এত কিছুর পরও দর্শকদের সবচেয়ে ভাল যে বিনোদন দেওয়া সম্ভব সেটাই দিয়েছে ‘১০২ নট আউট’। একই সাথে খুবই প্রেডিক্টেবল, অভাবনীয় ও হৃদয়গ্রাহী।

অমিতাভ ও ঋষি – দু’জনেই যে দারুণ অভিনেতা সেটা আবারো প্রমাণ করেছেন। দু’জনেরই কমিক সেন্স আর টাইমিং ছিল অসাধারণ। ঋষি খিটখিটে এক বুড়োর চরিত্রে কাজ করলেও অমিতাভ ছিলেন পুরো উল্টো। চিরতরুণ, আমোদপ্রিয় এই সেঞ্চুরিয়ান নি:সন্দেহে সবার মন জয় করেছেন।  দু’জনের এই যুগলবন্দী ৭০-৮০ দশকের দর্শকদের নস্টালজিয়ায় নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।

থিয়েটার করে আসা জিমিত এই দু’জনের সাথে শতভাগ মানিয়ে নিয়েছেন। বিশেষ করে তাঁর গুজরাটি ভাষায় ডায়লোগ ডেলিভারিতে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই।

উজ্জ্বল ফ্রেম, প্রোডাকশন ডিজাইন, অভিনব তবে মানানসই আবহসঙ্গীত সিনেমাটিকে দৃষ্টিসুখকর করে তুলেছে। ‘জিন্দেগি মেরে ঘার আনা’ কিংবা ‘ওয়াক্ত নে কিয়া’র মত চিরসবুজ পুরনো গানগুলো সিনেমার আবহের সাথে খুব দারুণভাবে মানিয়ে নিয়েছেন পরিচালক। আর যে সিনেমার সঙ্গীতে এ আর রহমান, সেলিম-সুলায়মানের নাম আছে সেখান থেকে বাড়তি কিছু চমক আসা তো খুবই স্বাভাবিক।

শাম্য যোশির লেখা একই নামের একটি গুজরাটি নাটককে রুপালি পর্দায় নিয়ে এসেছেন পরিচালক। তবে, গল্পটার গভীরতা একটু কম। যদিও মাত্র ১০১ মিনিট লম্বা সিনেমাটিকেও কখনোই বেশি লম্বা মনে হবে না অভিনয় নৈপুণ্যের কারণে।

সহজ কথায় ‘১০২ নট আউট’ একটা সহজ, সুন্দর, সামাজিক – পারিবারিক বিনোদন নির্ভর সিনেমা। যেভাবে সম্পর্কগুলোর টানাপোড়েন ও বন্ধনগুলো দেখানো হয়েছে সেগুলো অসাধারণ। সিনেমাটা অনেকটা একটা ছুটির দিনের বিকেল কিংবা একটা কুলফি আইসক্রিমের মত। এটা দেখে আপনার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি খেলে যেতে বাধ্য।

এই সিনেমায় আবেগ আছে। তবে, সেটা কখনোই মাত্রা ছাড়িয়ে যায়নি। দৈনন্দিন জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী নিয়েই এই ছবি।  আর অবশ্যই এই সিনেমার মূল কথা হল – বয়স স্রেফ একটা সংখ্যা। সাথে এই কথাও বলে যে, বাবা সব সময়ই বেশি বোঝেন, এমনকি তাঁর বয়সে ১০০’র বেশি হলেও।

জীবন মানেই উপভোগের একটা সময়। যত বুড়ো হবেন, তত উপভোগ করবেন। মৃত্যুর আগে যেন মরণ না আসে। এটাই সিনেমায় বারবার বলার চেষ্টা করা হয়েছে। অমিতাভ যেমন দাত্তারেয়ার চরিত্র ধারণ করে বলেন, ‘আমি মৃত্যুর চুড়ান্ত বিরোধী।’ কিংবা যখন বলেন, ‘যতদিন বেঁচে আছো, ততদিন যেন না মরো।’ – এগুলোই জীবনের মূল কথা হওয়া উচিৎ।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।