রক্ষণশীলতার ছবি, প্রগতিশীলতার ছবি

মাটির প্রজার দেশে ছবিটির গল্প জামাল নামের এক কিশোরের জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। তবে জামালকে কেন্দ্র করে গল্প গড়ে উঠলেও এটা কেবলই জামালের গল্প নয়। জামালের জীবনের সাথে সম্পর্কযুক্ত দুই নারীর গল্পও।

ছবির শুরুতে জামাল এবং তার খেলার সাথী লক্ষ্মীকে দেখি। অকৃত্রিম বন্ধুত্ব তাদের। হঠাৎই কিশোরী লক্ষীর বিয়ে হয়ে যায়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কুৎসিত রূপটি প্রতিনিয়ত দেখে দেখে বড় হওয়া লক্ষ্মী সমাজের অন্য দশটা মেয়ের মতই স্বাভাবিক ভাবে বউ সেজে শ্বশুর বাড়িতে যায়। একবার যেন বাল্যবন্ধুর টানে সে সামাজিকতার বেড়া ডিঙিয়ে ছোটে। তবে তা তো তার সাময়িক আবেগ। বাস্তবতার কাছে এইটুকুন মেয়ের অপরিণত আবেগের মূল্য কি ?

দ্বিতীয় গল্পটি জামালের মায়ের গল্প। তাঁর একটা কুৎসিত অতীত আছে। যে অতীত তিনি ভুলে যেতে চান। কিন্তু ছেলের পরিচয় সংকট তাকে আবার অতীতের দিকে টানে।

গল্প দুটোর ডিটেইলস্‌ রিভিউতে বললে স্পয়লার হয়। তবে এইটুকু বলবো- দুটি গল্পই অসম্ভব সুন্দর। বিশেষ করে দুটি গল্পের এন্ডিং-ই মুগ্ধ হওয়ার মতো। এই দুই ভিন্ন দর্শনের গল্প আবার ছবির মূল গল্পকে একটা আলাদা দার্শনিক রুপ দিয়েছে। রক্ষনশীলতার মধ্যেও যেন কত রুপ। রক্ষনশীলতা আর প্রগতিশীলতার দ্বন্দ মানবিকতার স্পর্শে এসে যেন ঘুচে গেছে।

শুধুমাত্র দার্শনিক দিক থেকে দেখলেও এ ছবির মূল্য অপরিসীম। বিশেষ করে আমাদের বর্তমান সমাজে রক্ষনশীলতা আর প্রগতিশীলতা যেভাবে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেছে তাতে এ ছবির দার্শনিক মূল্য বর্তমান সমাজের প্রেক্ষিতে খুব বেশিই বটে।

তবে সবচেয়ে মুগ্ধকরা বিষয় হচ্ছে নির্মাতা সিনেমার নামে দর্শকদের দর্শন গেলাতে চাননি। ছবির প্রতিটি দৃশ্যের আলাদা বিনোদন মূল্য আছে। অর্থাৎ কোন কিছু চিন্তা না করেও আপনি ছবিটা উপভোগ করতে পারবেন। উপভোগ করতে পারবেন ছবির প্রত্যেকটা দৃশ্য। আবেগ তাড়িত হবেন নিজের দেশের রুপ, গন্ধ, শব্দ পর্দায় জীবন্ত অনুভব করে।

চরিত্র গুলোর সাথে রিলেট করতে পারবেন। কারণ প্রত্যেকটা চরিত্রের সাথে কোন না কোন ভাবে আমরা পরিচিত বা সম্পর্কযুক্ত। যেমন জামাল এবং লক্ষ্মীর গল্প আমাকে আবেগ তাড়িত করতে সক্ষম হয়েছে কারন আমিও ছেলেবেলা আমার কোন এক বন্ধুর সাথে এভাবেই ঘুরে বেড়িয়েছি। বাগানে, ধানক্ষেতে সর্বত্র। সমবয়সীরা টিটকারী মেরেছে। মুরুব্বীরা বকা-ঝকা করেছে। তবু বন্ধুত্বের আবেগের কাছে সব হার মেনেছে।

জামাল আর লক্ষীর গল্প তাই আমাকে শিহরিত করেছে। চোখে মুগ্ধতার অশ্রু নিয়ে এসেছে। অন্যদিকে আমার বন্ধু জামাল আর তার মায়ের খুনসুটিতে নিজের ছোট বেলাকে খুঁজে পেয়েছে আর মুগ্ধ হয়েছে।

ছবির গল্প যেমন অত্যন্ত সুন্দর তেমনি সুন্দর এর চিত্রনাট্য। দেড় ঘন্টায় কোথাও সামান্য বোর হওয়ার সূযোগ নেই। খুব সরল সব দৃশ্য। আর সরলতার চেয়ে সুন্দর কিছু কি হতে পারে?

নির্মাতা বিজন ইমতিয়াজ গল্প ও চিত্রনাট্য লিখেছেন এবং তিনি নির্মাতা হিসেবে যতখানি মুগ্ধ করেছেন ঠিক ততখানিই মুগ্ধ করেছেন তার গল্প এবং চিত্রনাট্য দিয়ে।

টেকনোলজির দিক থেকে ছবিটি আমার দেখা বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা কাজ। তারেক মাসুদ স্যারের মাটির ময়নার পর এমন রিচ একটা বাংলাদেশি প্রডাকশন দেখলাম। লোকেশন এবং সিনেমাটোগ্রাফী চোখ জুড়ানো। এডিটিং পিচ পারফেক্ট। লাইটিং ন্যাচারাল এবং শৈল্পিক আর সাউন্ড ডিজাইন এবং ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বেষ্ট অফ দ্যা বেষ্ট। হাঁসের ডাক, শুকনো পাতার মচমচ শব্দ, পাখির কুহুকুহু কলতান, বাতাসে ধানক্ষেতের শন শন শব্দ এগুলো সব অন লোকেশন থেকে রেকর্ড করা; ফলে সব কিছু যেমন দেখতে সুন্দর, তেমনি শুনতে জীবন্ত।

অভিনয়ে সবাই দারুন। জামাল আমার মনে হয় সবার মন জয় করেছে। তবে আমার ব্যাক্তিগত ভাবে লক্ষ্মী চরিত্রে শিউলীকে খুব খুব বেশি ন্যাচারাল লেগেছে। এবং সত্যিকথা বলতে চরিত্র হিসেবেও লক্ষীকে আমার সবচেয়ে বেশী ভাল লেগেছে। মায়ের চরিত্রে চিন্ময়ী গুপ্ত দারুণ। জয়ন্ত চট্রোপাধ্যায়, রোকেয়া প্রাচী এবং আরো যারা আছেন সবাই খুব গুনী শিল্পী। সুতরাং চরিত্রানুযায়ী সবাই খুব ভাল করেছেন।

সবমিলিয়ে, মাটির প্রজার দেশে কোন সাধারণ ছবি না। নির্মাতা ইমতিয়াজ বিজন যদি আর কোন ছবি নাও বানান তবু এই একটি ছবি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তাকে ঠাঁই করে দিবে। কারন এ ধরনের ছবি বাংলাদেশে কালে ভদ্রেই হয়। মাটির প্রজার দেশে সেই কালে ভদ্রে আসা অল্প কিছু ভাল ছবির লিষ্টে উপরের দিকেই থাকবে।

আমি ছবিটিকে দিচ্ছি ৫ এ ৪.৫*। অর্থাৎ ৯০% মার্কস্‌ বা গ্রেড আউটস্টান্ডিং।

ছবিটিকে কেন ১০০% অর্থাৎ ৫ এ ৫* দিলাম না? কারণ পারফেকশন ইজ বোরিং। এ ছবি যেহেতু একেবারেই বোরিং না সেহেতু হয়তো এ ছবি পারফেক্টও না। ছবির কোথাও কোন ভুল ত্রুটি থাকলে বিজ্ঞজনরা নিশ্চয়ই খুঁজে খুঁজে বের করবেন। তবে আমি ছবিতে বুঁদ হয়ে ছিলাম। তাই ভুল ত্রুটি নিয়ে কিছু লিখতে পারলাম না বলে দুঃখিত।

এই ছবি কোন সিনেমাপ্রেমী নিশ্চয়ই মিস করবেন না বলে আমার বিশ্বাস। আর যারা সিনেমাপ্রেমী না কিন্তু সিনেমা সামনে পড়লে দেখেন তাদেরও ছবিটি অবশ্যই দেখা উচিৎ। এতো ভাল একটি ছবি দেখার মধ্যেও গর্ব আছে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।