নেটফ্লিক্স নামের অতিমানবীয় জাদুকর

বিনোদনের জগতে সময়ের সাথে বদলাতে পারাটা খুব জরুরী। তাই তো, ‘নেটফ্লিক্স’-এর নাম আজ কারোই আর অজানা নয়। কারণ, তাঁরা সময় ও প্রযুক্তি ও মানুষের রুচির পরিবর্তনের সাথে সাথে নিজেদের ব্যবসার ধরণ পাল্টাতে পেরেছে। মজার ব্যাপার হল নেটফ্লিক্স নামটা একালে মানুষের মুখেমুখে ছড়িয়ে পড়লেও কিন্তু তারা ব্যবসা করছে সেই ১৯৯৭ সাল থেকে।

  • শুরুর কথা

শুরুতে তাঁদের ব্যবসার ধরণটা ছিল ভিন্ন। তখর তাঁরা স্রেফ ছিল ডিভিডি ব্যবসায়ী। ডিভিডি ভাড়া দিতো। মাসিক একটা ফি-এর বিনিময়ে চাইলে কেউ তাঁদের কাছ থেকে ডিভিডি নিয়ে ছবি দেখতে পারতো। ১৯৯৭ সালের আগস্টে আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ায় এই প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু করেন মার্ক রুডলফ ও রিড হেস্টিংস।

চাইলে ঘরে বসেই ডিভিডির অর্ডার করা যেত। কেউ চাইলে একটা ডিভিডির নির্ধারিত ভাড়ায় দিতে পারতো। চাইলে মাসিক সাবস্ক্রিপশনেও চলে যেতে পারতো। এটা ডিভিডি স্টোর থেকে কিনে দেখার চেয়ে বেশ স্বস্তা একটা পদ্ধতি। ফলে, আমেরিকানরা নেটফ্লিক্সকে স্বানন্দে গ্রহন করেছিল।

  • ব্লকবাস্টারের সাথে মার্জারের সুযোগ

২০০০ সালের দিকে নেটফ্লিক্সের সাবস্ক্রাইবার ছিল মাত্র তিন লাখ। এখনকার তুলনায় সংখ্যাটা খুবই সামান্য। ওই সময় তাঁদের প্রতিযোগিতা হত ‘ব্লকবাস্টার’-এর সাথে। ব্লকবাস্টার প্রতিদ্বন্দ্বীতায় না গিয়ে ৫০ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে নেটফ্লিক্সকে কিনে নিতে চেয়েছিল। নেটফ্লিক্স তখন এখনকার মত লাভজনক নয়, বরং টানাপোড়েনই ছিল কিছুটা। তারপরও বিশাল অংকের এই আর্থিক লাভের হাতছানি এড়িয়ে গিয়েছিল নেটফ্লিক্স।

নেটফ্লিক্সের পুরনো লোগো

কালক্রমে ব্লকবাস্টারের ব্যবসায় ধস নামে। বিশ্বজুড়ে এখন ব্লকবাস্টারের ১০টার মত শো-রুম টিকে আছে। বড় একটা অংশ আগেই কিনে নিয়েছে ‘ডিশ নেটওয়ার্ক’। অন্যদিকে নেটফ্লিক্সের মূল্যমান এখন দুই বিলিয়ন ডলার। আর যত দিন যাচ্ছে ততই ফুলে ফেঁপে উঠছে এই প্রতিষ্ঠানটি। ঘুমাতে যাওয়ার আগে ব্লকবাস্টারের কর্তারা আজো নিশ্চয়ই নাতী-নাতনীদের কাছে এই গল্পটা করেন!

  • বর্তমান চিত্র ও ভবিষ্যৎ

নেটফ্লিক্স এখনো তাঁদের আগের কাজটাই করে, কিন্তু সেটা আধুনিক কায়দায়। এখন নেটফ্লিক্সের পুরো ব্যাপারটাই হয় ইন্টারনেটে। ঘরে বসে নেটফ্লিক্সে মাসে মাসে কিছু অর্থ খরচ করে বিশ্বের নানা প্রান্তের দারুণ সব ওয়েব সিরিজ ও সিনেমা দেখা যায়। বলা যায়, নেটফ্লিক্সের মধ্য দিয়েই ওয়েব সিরিজের আলাদা একটা জগৎ তৈরি হয়েছে। কালক্রমে ওয়েবের এই জগৎ বিনোদনের মূল স্রোতে পরিণত হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকছে না।

নেটফ্লিক্স নিজেদেরকে এত ওপরে নিয়ে যাওয়ার আরেকটা কারণ হল নিজস্ব কনটেন্ট। প্রতিষ্ঠানটি কেবল অন্যের কাছ থেকে ছবি কিনেই নেয় না, নিজেরাও কিছু ছবি বা সিরিজ বানায়। এর মধ্যে ২০১৮ সালে কনটেন্ট বানানোর পেছনে তাঁরা খরচ করে ১২ বিলিয়ন ডলার। আর প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রিড হেস্টিংস জানিয়েছেন ২০১৯ সালে এই বিনিয়োগটা বেড়ে ১৯ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে পৌঁছাবে। এর মধ্যে কেবল ভারতেই আগের চেয়ে দ্বিগুণ পরিমান অর্থ বিনিয়োগ করবে তাঁরা।

বোঝাই যাচ্ছে, কনটেন্ট নিয়ে কোনো ছেলেখেলা করতে রাজি নয় নেটফ্লিক্স। এসব করতে গিয়ে নেটফ্লিক্স আর্থিকভাবে কতটা লাভবান হয়ে গেছে সেটা বোঝাতে একটা সামান্য পরিসংখ্যান দিলেই যথেষ্ট। ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠানটিতে কেউ যদি এক হাজার টাকা বিনিয়োগ করতো, এই সময় এসে সেটা পরিণত হত নয় লাখ টাকায়। ভাবা যায়!

  • আসন্ন আশঙ্কা

এত সাফল্যের সাথে ছোট্ট একটা আশঙ্কাও আছে। নেটফ্লিক্সের ব্যবসা এত যে লাভজনক হচ্ছে, তাঁর একটা বড় কারণ হল এই মুহূর্তে বাজারে তাঁদের কাছাকাছি মানের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। তবে অদূর ভবিষ্যতে কেউ বড় বাজেট নিয়ে মাঠে নামলে সেটা বিপদের কারণ হলেও হতে পারে। ইনভেস্ট ব্যাংকিং ও অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট অ্যানালিস্ট লরা মার্টিন তাই সতর্কই করে দিয়েছেন নেটফ্লিক্সকে, ‘আমার মনে হয় যখন বড় প্রতিষ্ঠান গুলো মাঠে নামবে তখন নেটফ্লিক্সের আধিপত্ব ঝুঁকির ‍মুখে পড়বে।

সিএনএন, ইন্ডিওয়্যার, ডেলিবারেট ম্যাগাজিনসিএনবিসি অবলম্বনে

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।