রঙধনু দাদু কিংবা এক ৯৭ বছর বয়সী বুড়োর অতিমানবীয় আখ্যান

এখন থেকে ১০ বছরের একটু বেশি সময় আগের কথা। ৮৬ বছর বয়সী হুয়াঙ ইউঙ-ফু বড্ড ঝামেলায় পড়ে গেলেন। যে গ্রামটায় থাকতেন, তাইওয়ান সরকার সেটাকে ভেঙে আরো বেশি অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স নির্মানের উদ্যোগ নিলো। হুয়াঙের তখন মাথায় হাত, তিনি নিজেই যে গ্রামটির শেষ বাসিন্দা।

সরকারের পক্ষ থেকে তাঁকে বড় অংকের অর্থ কড়ির বিনিময়ে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয়। কিন্তু, নিজের বাড়ি ছাড়ার কথা কোনো ভাবেই ভাবতে পারছিলেন না তিনি।  তাই তিনি কি করা শুরু করলেন জানেন? না, বড় কিছু না। স্রেফ পেইন্টিং করা শুরু করলেন।

সেই করতে গিয়েই তিনি এখন তাইওয়ানের ‘রঙধনু দাদু’ নামে পরিচিত। কিভাবে তিনি এই তকমা পেলেন, এখন তারই গল্প শোনাতে চলেছি।

এই বুড়ো আসলে চীনের মানুষ। ওখানেই জন্ম। তিনি দ্বিতীয় চীন-জাপান যুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। এমনকি জাতীয়তাবাদীদের হয়ে মাও সেতুংয়ের কমিউনিস্ট সরকারের বিরুদ্ধেও লড়েছিলেন।

জাতীয়তাবাদীরা পরাজিত হয়েছিল। ২০ লাখ জাতীয়তাবাদী পালিয়ে চলে এসেছিল তাইওয়ানে। এসেছিলেন হুয়াঙও। তাইচুঙ শহরের একটা গ্রামে তাদের শরণার্থী শিবির গড়ে ওঠে। কালক্রমে এই গ্রামটাতেই স্থায়ী হয়ে যান অনেকে।

৪০ বছর পর সেই বাড়ি থেকেই উচ্ছেদ খবরটা হুয়াঙের কাছে প্রথম দফায় ছিল যারপরনাই বিস্ময়কর। বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘যখন আমি এখানে আসি, গ্রামে ১২০০ লোক থাকতো। সবাই ছিল একটা পরিবারের মত। তবে, এখন প্রায় সবাই নানা জায়গায় চলে গেছে। কেউ বা মারা গেছে। আমি একা হয়ে গেছি।’

হুয়াঙের কোনো যাওয়ার জায়গা ছিল না। তাই, তিনি শিল্পকেই নিজের বাঁচার অবলম্বনে ভেবে নিয়েছিলেন। প্রথমে তিনি একটা বাঙলোতে ছোট একটা পাখি আনেন। কাজটা পছন্দ হয়। এরপর একে একে নানা রকম জীবজন্তু ও নকশার ছবি আঁকতে থাকেন পুরো গ্রামজুড়ে।

২০১০ সালে স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র হুয়াঙের গল্প শুনে গ্রামে আসে, হুয়াঙকে সাহায্য করে। তাঁর তোলা ছবিগুলো গ্রামের জন্য তহবিল সংগ্রমে কাজে আসে। একটা পিটিশনও দাখিল হয়ে যায়, যার ফলে গ্রামটি ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়।

ব্যাপারটা খুব দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়। এভাবেই ‘রঙধনু দাদু’র জন্ম হয়। তিনি পুরো তাইওয়ানিজ জাতির মত জয় করে ফেলেছেন। এই গ্রামটি শুধু তাইওয়ানেই নয়, বাইরে থেকে আসা ট্যুরিস্টদের জন্যও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়ে। প্রতিবছর এখন লাখ লাখ লোক গ্রামটা ঘুরে দেখতে হাজির হয়। কাগজে কলমে প্রতিবছর এই গ্রামে ঘুরতে আসা ট্যুরিস্টের সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ।

সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল, হুয়াঙ নিজের বাড়িটা ধরে রাখতে পেরেছেন। ৯৭ বছর বয়সী এই বুড়োর সৌজন্যে গ্রামটি এখন ‘রঙধনু গ্রাম’ নামে পরিচিত। হুয়াঙও তাই তৃপ্ত। বললেন, ‘সরকার তাঁদের কথা রেখেছে। ওরা গ্রামের কোনো বাড়িই ভাঙেনি। আমি আনন্দিত ও কৃতজ্ঞ।’

মাই মডার্ন মেট অবলম্বনে

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।