ফেলে আসা দিন, মুছে যাওয়া ব্যান্ড-স্বর্গ

১৯৯৮ সালে আমি ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ারে। পড়ি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে। চকবাজারে মেসে থাকি। তিন দিকে তিনটা একতলা বাড়ি, অন্যপাশে উঁচু একটা ভবনের পিছনের দিকের দেয়াল। মাঝখানে ছোট একটু ফাঁকা জায়গা। অনেকটা উঠোনের মতো।

মেসে যারা থাকে, তারা সবাই একে অপরের চেনা। অধিকাংশই সহপাঠী, বাকিরা খানিকটা সিনিয়র। সারা বিকেল সন্ধ্যা রাত তাসের আসর বসে! আর আড্ডা। আমি তাস খেলতে পারি না। আমি দর্শক। খেলোয়াড়দেরকে ‘এটা সেটা’ এগিয়ে দেই। তাঁরা সারা রাত ধরে তাস খেলে। দিনে পড়ে পড়ে ঘুমায়। যখন তাস খেলে, ব্যাকগাউন্ডে মিউজিক বাজতে থাকে৷ অবশ্যই সেটা ব্যান্ড মিউজিক!

তখন একটা নতুন অ্যালবাম রিলিজ হলো। সম্ভবত নাম ‘শেষ দেখা’। মিক্সড অ্যালবাম। তার আগে আলাদা আলাদা করে ফিলিংস, মাইলস, সোলস, আর্ক কিংবা এলআরবি’র অ্যালবাম এসেছে৷ কিন্তু অ্যালবামে আমাদের সময়ের সব হার্টথ্রব একসাথে। মনে হচ্ছিল ওটা বাস্তব নয়, স্বপ্ন!

সেই এলবাম কেনা হলো। এক বড়ভাই কিনলেন। অ্যালবাম মানে, ফিতাওয়ালা ক্যাসেট। একদিন সন্ধ্যায় সেই এলবাম বাজানো হবে। আমরা সবাই গোল হয়ে বসলাম।

এলবাম চালানো হল। আমরা উত্তেজনায় কাঁপছি। শুরু হল গান। একে একে আসতো লাগলো জেমস, আইয়ুব বাচ্চু, হাসানেরা। ‘হতেও পারে’, ‘এই দেখা শেষ দেখা’, ‘এত কষ্ট কেন ভালবাসায়’, ইত্যাদি।

আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনি। ঘরে পিনপতন নিরবতা। কেউ কথা বলছে না। একেকটা গানের কথা যেন আলাদা আলাদাভাবে কারো না কারো মনের কথা। কারো মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। ওই অ্যালবাম কত লাখ কপি বিক্রি হয়েছে আমার জানা নাই। কিন্তু যেদিকে যেতাম, কান না পাতলেও সেই অ্যালবামের গান। সবক’টা গানের সবগুলো লাইন আমাদের মুখস্ত। এখনো বলতে পারবো।

কিন্তু আমরা বোধহয় সেই প্রজন্ম; যারা একটা দেশের ব্যান্ড সঙ্গীতের উত্থান দেখলো সাথে পতনও!

একের পর এক ব্যান্ড ভাঙার খবর শুনতে থাকলাম। আর্ক ভেঙে গেল, হাসান বেরিয়ে গেল, আবার ফিরলো। ফিলিংস থেকে জেমস বেরিয়ে গেলেন, হলো নগর বাউল। ওয়ারফেজ নামের একমাত্র হেভি মেটাল ব্যান্ডটা হারিয়ে গেল কোথায় যেন। অবসকিউর নেই বললেই চলে।

ফিডব্যাকে গাইছেন মাকসুদ

এখনকার প্রজন্ম এটাও বিশ্বাস করবে কী না জানি না, তখন বিটিভি নামের একটাই চ্যানেল ছিল দেশে, মাত্র কুড়ি বছর আগে, আর সেই চ্যানেলে একটা ডেডিকেটেড প্রোগ্রাম হতো শুধু ব্যান্ড তারকাদের নিয়ে। যে কোন বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের শেষে থাকতো একটা ব্যান্ডের গান। বাকি অনুষ্ঠানটুকু আমরা দেখতাম শুধুমাত্র সেই ব্যান্ড সংগীতের অপেক্ষায়! হোক সেটা ‘ইত্যাদি’ অথবা ‘শুভেচ্ছা’।

মাত্র কুড়ি বছরের মাথায়, আমরা দেখলাম আইয়ুব বাচ্চু নামের মানুষটা হারিয়ে গেল। তার আগে গুরুখ্যাত আজম খান। তার ব্যান্ড ‘উচ্চারণ’। কোথায় এখন উচ্চারণ? উচ্চারণের গানগুলোর কথা কি এই প্রজন্ম বলতে পারবে? গাওয়া হয় কোথাও? আমরা হয়তো ইউটিউবে খুঁজে খুঁজে শুনি।

সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো, প্রত্যেকটা ব্যান্ডই দাঁড়িয়েছিল একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে। মেইন ভোকালিস্ট হল সেসব ব্যান্ডের প্রাণ। আপনারা নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন যে, আমি মেইল ভোকালিস্ট ছাড়া এই লেখায় আর কারো নাম বলতে পারিনি। কারণ আমার কারো নামই মনে নেই।

তার মানে ব্যক্তিকেন্দ্রিক দল। ব্যক্তি চলে গেলে দলও শেষ। হারিয়ে যায়। তাহলে সমস্যাটা কোথায়? সেই ব্যক্তির? তিনিই কি খুব কৌশলে আর কাউকে দাঁড়াতে দিতেন না? ভয় পেতেন? প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভয়? নিজের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার ভয়?

(বাঁ-থেকে) হামিন আহমেদ, জেমস ও আইয়ুব বাচ্চু

ফলে আইয়ুব বাচ্চু মারা যাওয়ার পর আমরা দেখি, তার ব্যান্ড এলআরবি মরে যাওয়ার পথে। কত টানাহেঁচড়া, জল ঘোলা হচ্ছে। অথচ তিনি অজস্র কালজয়ী গান রেখে গেছেন; কিন্তু একজন উত্তরসূরী তৈরি করে যান নি, যার মাধ্যমে অমর হয়ে থাকতেন। এটা আজম খান, জেমস কিংবা হাসানদের ক্ষেত্রেও সত্য। তারা চলে গেলেও একই ঘটনা ঘটবে। তাদের নাম আমরা মনে রাখবো হয়তো। কিন্তু তাদের ব্যান্ড?

এই ভাবনাটা এক ধরনের রক্তক্ষরণ তৈরি করে।

এটা কি আমাদের জাতীয় সমস্যা? আমাদের দেশের প্রতিষ্ঠান কিংবা রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে তাকালেও কিন্তু আমরা একই চিত্র দেখতে পারি। প্রত্যকেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক। একজন মানুষ সর্বস্ব প্রতিষ্ঠান। সেই মানুষটা তার প্রতিষ্ঠান কিংবা দলকে এমন জায়গায় নিয়ে যান, এতটা ভালনারেবল যে, তিনি মৃত্যুর আগ অব্দি ক্ষমতার শীর্ষ স্থানটা আঁকড়ে ধরে রাখেন; ফলে তিনি চলে যাওয়ার পর সেই প্রতিষ্ঠানেরও মৃত্যু ঘটে! একজন বাচ্চু না থাকলে এলআরবি’র মতো মহীরুহ বিপদাপন্ন হয়ে পড়ে!

অথচ এরা চাইলেই ‘লিডার’ হতে পারতেন। হয়ে গেলেন ‘বস’! ফলে বস হয়ে কালের গর্ভে হারিয়ে গেলেন। যার সবচেয়ে বড় খেসারত দিতে হল দেশকেই। নেতা হতে পারলেন না কেউ।

যারা এখনো আছেন, তারা কি একবার ভেবে দেখবেন? তারা সময় থাকতে বিকল্প তৈরির কথা ভাববেন? পরের সারির নেতা? তারা কি দয়া করে আমাদেরকে একটু দয়া করবেন? একবার ব্যক্তিস্বার্থের বাইরে গিয়ে চিন্তা করবেন? একজন আইয়ুব বাচ্চু কেনো দুইটা তিনটা বাচ্চু রেখে যেতে পারবে না?

আমাদের সম্পদ খুব সীমিত। কখনো সখনো আমরা দুচারটা প্রতিভার ঝলক দেখতে পাই। ফলে তাদের পতন আমাদের জন্য খুব কষ্টকর হয়ে পড়ে! এক বিশাল শূন্যতা! হোক সেটা সংগীত, কবিতা, থিয়েটার, এনজিও, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা অন্য যেকোনো কিছু।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।