ফেলে আসা দিন, মুছে যাওয়া ইতিহাস

১৯৭৬-১৯৭৭ সালের শীতের পর আবারো বাংলাদেশে খেলতে এসেছিল এমসিসি। সেটা ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বরের কথা। ট্যুর চলে ৭৯-এর মধ্য জানুয়ারি পর্যন্ত।

কাপ্তান টেড ক্লার্ক ও অ্যালান রবার্ট ডাফের ফিরতি সফরের সাথে বেশ কিছু উঁচু লম্বা ফাস্ট বোলার লম্বা রান-আপে বল করে বাঙালিদের প্রথমবারের মত ফাস্ট বোলিংয়ের ব্যপ্তি বুঝিয়ে দেন।

এ যাত্রা বাঙালিও কম যায়নি। জাহাঙ্গীর শাহ বাদশাহ’র ইন সুইং ও ইয়র্কারে হাততালি/হর্ষধ্বনি দেওয়ার মত সুযোগ পায় তারা। বাদশাহ, নাদির শাহর বড় ভাই। তবে নাদিরের মত সাদামাটা নয় বেশ ভারিক্কি খেলোয়াড় ছিলেন। পাশাপাশি ব্যাটিংও ভাল করতেন। ৬/৭ নং স্লটে ব্যাটিং করেছেন।

জাহাঙ্গীর শাহ বাদশাহ

ম্যাচে তাকে প্রথম দিকের দু/তিনটা উইকেট নিতে আমি দেখেছি এমনকি তা লাঞ্চের আগেই। না এবারের তিনদিনের ম্যাচগুলি ড্রই হইত কারণ রকিবুল নির্ভর টপ ব্যাটিং অর্ডার ফেল মারলেও সৈয়দ আশরাফুল হক, ইউসুফ বাবু, উইকেট কিপার শফিকুল হক হিরা এবং মজিবুল হক মন্টু ভাল ব্যাট চালাতেন।

প্রথমেই বলতে হয় মন্টুর কথা। কোনদিন আবাহনী, মোহামেডান বা ব্রাদার্সে খেলেন নি। সারা জীবন মহল্লার দল ইয়ং প্যাগাসাসে খেলেছেন। তার মধ্যে ‘জোড়াতালি’র জাতীয় দলে এসে গ্যালারীর দর্শকদের চারের সুখ দিতেন। অত্যন্ত সাদামাটা মানুষটাকে আবাহনী মাঠে খুব কাছ থেকে দেখেছি।

ইউসুফ বাবু

ইউসুফ বাবু এখন আমেরিকা প্রবাসী। প্রথম এমসিসি ট্যুরেই সে সর্বোচ্চ রান করে। ন্যাচারাল স্ট্রোক-মেকার প্লাস এফেক্টিভ মিডিয়াম পেসার। উইকেট পেতেন, ব্যাটে গ্যালারিকে শুধু মাতিয়েই রাখতে না, সে যুগে তিনি রীতিমত একজন সেলিব্রিটিই ছিলেন। টি-টোয়েন্টি বা ওডিআই-এর এই যুগে তাঁকে দরকার ছিল।

নাজমুন নূর রবিন নামে এক ব্যাটসম্যান কাম ফিল্ডার ছিল। তিনিও এখন প্রবাসী। তাঁর ফিল্ডিং চোখে ধরার মত ছিল। আজ আমরা জন্টি, মহানামা, পন্টিং বা ইন্ডিয়ানদের ফিল্ডিং নিয়ে মাতি। রবিনের মাঠে থাকা চোখে পড়ত, সাথে সে ভাল ব্যাটিংও করত।

নাজমুন নূর রবিন: সেকাল বনাম একাল

শফিকুল হক হীরা সপাটে ব্যাট চালাতে পারতেন। রকিবুলরা যখন প্রথম দিকে অসহায় আত্মসমর্পণ করতেন, পড়ন্ত বিকেলে হীরার ব্যাট কথা বলত। আর সে কারণেই বিরাশির এসোসিয়েটদের আসরে হীরা ক্যাপ্টেন্সি পায়।

সে আসরে সৈয়দ আশরাফুল হকের ফিঙ্গার স্পিনে (৬ উইকেট) ফিজির বিরুদ্ধে বাংলাদেশ জয় পায়। ‘ফিজিও একটা দল আর ডাইলও একটা শালুন’। তারপরও ক্রিকেটকে এগিয়ে নিতে ওই জয়ের দরকার ছিল।

ফিজির বিপক্ষে সেই জয়ের পর

সেবার জিম্বাবুয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে তিরাশিতে বিশ্বকাপ খেলে আর আমাদের এইরকম চ্যাম্পিয়নশিপ পেতে ১৯৯৭ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় কারণ ৯৪-তে কেনিয়ার মাঠে আমরা পারিনি। আর ৮৭ বিশ্বকাপের আগে আমিরাত ‘পিল্লার কিন্না কিরিকেট খেলে’।

আজ বাছারা কই? ক্রিকেট টিকাইয়া রাখতে হইলে চালান থাকতে হয়। দুই ক্ষেত্রেই অন্য দশজনের মত আমিও খুব কষ্ট পেয়েছিলাম।

নান্নু-নোবেল

চুরাশি পঁচাশির দিকেই চিটাগং থেকে নান্নু-নোবেল দের আগমন ঘটে সাথে আকরাম খান ও শহীদুর রহমানরা। খুব কষ্ট করে তারা ঢাকায় খেলতে আসত। শেষের দু’জন রেলওয়েতে খেলত, ব্যাটে তারা রেগুলার রান পেত আর আকরাম খানেরই ভাষায় ডেইলি খেলে ট্রেনে করেই তারা চিটাগং ফেরত যেতেন।

আর, একটু পাগলাটে ধরণের শহীদ ব্যাট চালাত নির্দ্বিধায়। ৮৭-তে শ্রীলঙ্কার মাটিতে এশিয়া কাপে পাকিস্তানের ওয়াসিম, ইমরান, আজিম হাফিজদের বিরুদ্ধে ৪/৬ হাঁকিয়ে ৩৭ করেন এই শহীদ।

জাহাঙ্গীর আলম তালুকদার

নান্নু নোবেলদের কথা কে না জানে? তবে এই সময়ে জাহাঙ্গীর আলম তালুকদার দুলুর নাম না বললেই নয়। উরাধুরা ছক্কার জন্য সবাই তাকে পাগলা বলত তবে তখনকার দিনে নিজে খেয়ে না খেয়ে যারা ক্রিকেটকে ধরে রেখেছেন, দুলু তাদেরই একজন।

ছবি কৃতজ্ঞতা: নাজমুল আমিন কিরণ

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।