৭ বছর তো হল, আর কবে?

বিসিসিআইয়ের সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার আগেই দু’টি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন সৌরভ গাঙ্গুলি। দায়িত্ব নিয়ে সবার আগে প্রাধান্য দেবেন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট ও ক্রিকেটারদের। তাঁদের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করবেন। আর জাতীয় দলের অন ফিল্ড ব্যাপারগুলোয় বিন্দুমাত্র হস্তক্ষেপ করবেন না।

এমন কোনো অমৃত বাণী নয়। একজন বোর্ড সভাপতির জন্য এসবই স্বাভাবিক। তবে আমাদের এই অঞ্চল বলেই এসব কথা প্রায় অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে। কতটা? একটি নমুনা দেখুন।

সৌরভ কথাগুলো বলার দিন দুয়েক পরই সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়েছিলেন বিসিবি সভাপতি। জাতীয় লিগে ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক নিয়ে প্রশ্নটাকে ঠিক পাত্তা দিলেন না। আর ভরা সংবাদ সম্মেলনে অবলীলায় বললেন, কোচ-নির্বাচকদের সঙ্গে কথা বলে ভারত সফরের দল ঠিক করে ফেলেছেন।

এছাড়াও মাঠের ক্রিকেট নিয়ে সরাসরি কথা বলা তো বরাবরের মতো আছেই। কাকে নেওয়া উচিত বা উচিত নয়, কার ছক্কা মারা উচিত না, কার বোলিং চলে না, কার ফিল্ডিং দুর্বল, কে কাটারের পর কাটার মারে, ফিল্ড প্লেসিং কোথায় করা উচিত, ম্যাচের আগে প্রিভিউ, পরে রিভিউ তো চলছেই।

দুই সভাপতির ভাবনার পার্থক্য বোঝা যাচ্ছে তো?

ঘরোয়া ক্রিকেটের প্রতি মৌসুমের আগেই টাকা-পয়সার স্বল্পতার কথা বলা হয়। এজন্য এবার মৌসুম শুরুর কিছুদিন আগেই বিসিবি সভাপতিকে একটি সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নটি করা হয়েছিল। তিনি তখন বলেছিলেন, ‘ঘরোয়া ক্রিকেটের জন্য টাকা-পয়সা কোনো সমস্যা নয়।’

অথচ এবার দেখা গেল, জাতীয় লিগের পারিশ্রমিক বাড়ানো হয়নি। আগের বছরের মতোই, প্রথম স্তরে ৩৫ হাজার টাকা, দ্বিতীয় স্তরে ২৫ হাজার টাকা। ক্রিকেট বিশ্বের অন্যতম সম্পদশালী বোর্ডের প্রধান ঘরোয়া লঙ্গার ভার্সন টুর্নামেন্টে চার দিনের পারিশ্রমিক ২৫ আর ৩৫ হাজার? এই যুগে এটা তো হাস্যকর!

সংবাদ সম্মেলনে এটি নিয়ে প্রশ্ন করার সময় বিসিবি প্রধানের পাশ থেকে বিসিবির প্রধান নির্বাহী মুখ টিপে বলছিলেন, ‘পরে ১০% বাড়ানো হয়েছে।’ যদিও সেটি বাড়ানোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা প্রেস রিলিজ ধরনের কিছু পাইনি। তবু ধরে নিলাম বেড়েছে, কিন্তু কত? ধরলাম ৩০ আর ৪০ হাজার। এই যুগে পেশাদার ক্রিকেটারদের জন্য এটা কোনো টাকা?

ভারতে ঘরোয়া ক্রিকেটের পারশ্রমিকের তুলনায় এই অঙ্ক নিতান্তই হাস্যকর। তার পরও ভারতে বাড়ানোর কথা বলেন স্বয়ং তাদের সভাপতি। বিসিবির আয় অবশ্যই ভারতের মতো নয়, সেই তুলনা চলে না। কিন্তু বিসিবির যা আয়, তাতে ৩০-৪০ হাজার অঙ্কটাও লজ্জাজনক রকমের কম।

কেন এটা ১ লাখ আর ৮০ হাজার হবে না? অন্তত, ৭৫ হাজার-৬০ হাজার হতে তো পারে! কয়টা ম্যাচ জাতীয় লীগে? কত টাকা লাগে এটুকুর জন্য?

খুব হম্বিতম্বি করা হলো, জাতীয় ক্রিকেটার খেলতে হবে। সব ক্রিকেটারকে নিবেদন দেখাতে হবে। অমুক-তমুক। বেশ ভালো। কিন্তু এসব কি হাওয়া থেকে আসবে? পেশাদার যুগ,ম্যাচ ফি বাড়লে জাতীয় ক্রিকেটাররাও আগ্রহী হবেন, অন্যরাও একাদশে থাকতে নিজেদের উজার করে দেবেন। এই ৩০-৩৫-৪০ হাজার টাকা তো মধ্যম সারির ক্রিকেটাররা ঢাকার বাইরে খ্যাপ টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেললেই পেয়ে যান। এই টাকায় জাতীয় লিগে চারদিন খাটতে ভালো লাগবে কেন?

ডেইলি অ্যালাউন্স মোটে ১৫০০ টাকা। ট্রাভেল অ্যালাউন্স ২৫০০ টাকা, কোথাও প্লেনে যাওয়ার উপায় নেই। দুটি ম্যাচের মাঝে বিরতি কেবল তিন দিন। বাসে যেতে-আসতেই অনেক সময় শেষ। রিকভারি কখন করবে, প্র্যাকটিস কখন করবে?

শত শত কোটি টাকার ফিক্সড ডিপোজিটে লাভটা কি তাহলে? এই যে কিছুদিন আগে, আফগানিস্তান আর জীর্ণ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ত্রিদেশীয় সিরিজ হলো, সেটির খেলা দেখতে যতজন পরিচালক বোর্ডের খরচে চট্টগ্রাম উড়ে গেছেন, ফাইভ স্টারে থেকেছেন-খেয়েছেন, তাদের পেছনে ওই খরচ করে দেশের ক্রিকেটে কি উন্নতি সাধন হয়েছে? প্রতি সিরিজেই এই মনোরঞ্জন ভ্রমণ চলে। ওই টাকাটা অন্তত ঘরোয়া ক্রিকেটে দিন!

বোর্ড সভাপতি বললেন, বঙ্গবন্ধু বিপিএল বলে এবার লাভের চিন্তা নেই বিসিবির। পেশাদার একটা বোর্ডের ভাবনা হলো এটা? চিন্তা নেই, নাকি নিজেরা লাভ করতে পারবে না বলে বঙ্গবন্ধুবে বর্ম বানানো হলো?

তবু ধরে নিলাম, বিশেষ আসর বলে লাভের চিন্তা নেই। তাহলে ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক কেন কমানো হচ্ছে? টাকা বাঁচানোর চিন্তা কেন? ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক কমা মানে দেশের ফিজিও, ট্রেনার থেকে শুরু করে টিম বয়, সবার টাকা কমবে। জাতীয় ক্রিকেটারদের সমস্যা হবে না। কিন্তু অন্য সবাই এই অর্থের দিকে তাকিয়ে থাকে পুরো বছর। তাদের সবার মন খারাপ। জাতির জনকের জন্ম শতবার্ষিকী উদযাপনের টুর্নামেন্ট হওয়ার কথা উৎসবের আবহে। সবাই কেন দুঃখ নিয়ে, বিরক্তি নিয়ে থাকবে?

ঘরোয়া ক্রিকেটে ফিটনেসে ব্যাপক কড়াকড়ি করা হয়েছে। খুব ভালো কথা। দারুণ উদ্যোগ। কিন্তু ক্রিকেটারদের বছর জুড়ে ফিটনেস ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা কি?

ঢাকায় মিরপুরে বাইরে ভালো জিম আছে? ঢাকার বাইরে কোথাও আছে ভালো জিম? জাতীয় দল বা এর আশেপাশে থাকা ক্রিকেটাররা নাহয় ট্রেনিংয়ে থাকে, বাকিরা কি করবে? কোথায় করবে? জাতীয় ক্রিকেটাররা তবু নিজের গাঁটের পয়সায় ট্রেনিং করতে পারে ফাইভ স্টারে বা ভালো প্রাইভেট জিমে। অন্যরা কিভাবে পারবে?

এই বোর্ড ৭ বছর দায়িত্বে আছে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় অনেক লম্বা সময়। ঢাকার বাইরে একটা ভালো জিম করতে পেরেছে? কিংবা এই ৭ বছরে পুরো দেশের ক্রিকেট অবকাঠামোর কতটা উন্নতি হয়েছে?

মিরপুরে একটা ইনডোর আছে, যেখানে ঢুকলেই দম বন্ধ লাগে। বছরের পর বছর ধরে ক্রিকেটাররা বলে আসছে, ইনডোরে এসি লাগাতে। সংস্কার করতে। ৭ বছরে কিছু করতে পারেনি। ওখানে প্র্যাকটিস করতে গেলে ক্রিকেটারদের অবস্থা খারাপ হয়। বিকল্প না পেয়ে তবু করতে হয়। ওখানে বিপ টেস্ট দিলে দম পাওয়া যায় না বলে এমনিতেই স্কোর কমে যায়। ক্রিকেটারদের অনেক পুরোনো অভিযোগ। কোনো প্রতিকার করা হয়নি।

কয়েকবার বোর্ড থেকে গল্প শোনানো হয়েছে, ওই ইনডোর ভেঙে সিডনি, ব্রিসবেনের মতো কিছু করবে। অস্ট্রেলিয়ার সেন্টার অব এক্সিলেন্সের মতো করবে। সুইমিংপুল, জিমসহ অনেক কিছু করা হবে। হয়েছে কচু। নাহ, আসলে কচুও হয়নি। সামান্য এসিই লাগানো হয়নি।

ফিটনেসে জোর দেওয়া হচ্ছে। অথচ জাতীয় লিগের ম্যাচে খাওয়ানো হয় ভাত, মাছ, মাংস, চিংড়ি, ভর্তা, ডাল। খুব ফিটনেস ধরে রাখার খাবার।

হ্যাঁ, কিছু ভালো উদ্যোগ গত কিছুদিনে ছিল। আগামী অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়া দলটি প্রচুর ম্যাচ খেলছে। সম্প্রতি ‘এ’ দল, বিসিবি একাদশ বা এইচপির অনেক ম্যাচ হয়েছে। যদিও এসব স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হওয়ার কথা, তবু সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য, কারণ স্বাভাবিক কিছু তো হয় না এখানে। কিন্তু এসবের বাইরে, ঘরোয়া ক্রিকেট, অবকাঠামোর অবস্থা ঠনঠন।

দেশের কোচদের নিয়ে প্রশ্ন করলেই তারা বিরক্ত হন। ভালো কোচ নাকি নাই। তাহলে ৭ বছরে কোচদের উন্নতির জন্য প্রোগাম কি কি ছিল? সমাধান কি?

যে কোনো ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন করলেই তারা বলেন, ‘হবে, হবে।’ ৭ বছর তো হল, আর কবে?

– ফেসবুক ওয়াল থেকে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।