নিউজিল্যান্ড-ম্যাচ পরবর্তী ৭ পর্যবেক্ষণ

ম্যাচ হারলে নানা দোষ-ত্রুটি চোখে পড়ে, প্রতিক্রিয়া অভিধান মানে না, জিতলে স্তুতি কাব্যের বাহার লেগে যায়। তাই জেতা ম্যাচের চাইতে হেরে যাওয়া ম্যাচে ৪ টা পর্যবেক্ষণ কম শেয়ার করছি।

  • পর্যবেক্ষণ ১

বাংলাদেশ ম্যাচটা হেরেছে আদতে অতিরিক্ত নার্ভাসনেস এর মাশুল দিয়ে। গত নিউজিল্যান্ড সফরে হেনরি আর ফার্গুসন যে ভীতির সঞ্চার করেছিল তার প্রভাবে শুরু থেকেই প্রচণ্ড সতর্কতা লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। এর প্রমাণ পাই সৌম্যের ব্যাটিংয়ে। কাল তার মিসটাইমড হচ্ছিল, ইনসাইড এজড হয়েছে, এবং যে বলকে মিড উইকেট দিয়ে উড়িয়ে মারে সেটা মিস করেছে, সেরকম এক বলেই বোল্ড হয়েছে। পিচ কিছুটা স্লো ছিল, তবু সৌম্যের ব্যাটিং স্টাইলেই দলের মনস্তত্ত্ব বোঝা গেছে।

আমার ম্যাচ প্রিভিউতে নিউজিল্যান্ডের অধিনায়কদের প্রতি আলাদা ফ্যাসিনেশন সম্বন্ধে লিখেছিলাম। কেইন উইলিয়ামসনের ক্যাপ্টেন্সি সেটার সত্যতা প্রমাণ করেছে। কাভার এবং পয়েন্ট-গালি রিজিয়নে কাল যতগুলো রান সেইভ করেছে, অন্য দলের হলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেগুলো বাউন্ডারি হত। কাল তারা লেগস্লিপ নিয়েও বোলিং করেছে। এখান থেকেই ম্যাচ রিডিং এবং ব্যাটসম্যান অ্যানালাইসিস অ্যাবিলিটি বোধগম্য হয়।

  • পর্যবেক্ষণ ২

যে কোনো টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচটা তামিমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই ম্যাচে তার পারফরম্যান্স থেকেই সমগ্র সিরিজটা তার কীভাবে কাটবে সে সম্পর্কে ধারণা মেলে। গত ৪ বছরে তামিম নিজের যে স্ট্যান্ডার্ড সেট করেছে, এবারের বিশ্বকাপে সেটা ধরে রাখতে পারবে না। উপরের দলগুলোর বিপক্ষে প্রভাব না পড়লেও র‍্যাংকিংয়ে কাছাকাছি থাকা দলগুলোর বিপক্ষের ৪ ম্যাচে এর মাশুল দিতে হতে পারে। এমনকি হেরে যাওয়াও লাগতে পারে।

তামিম- সৌম্য যখন ব্যাটিংয়ে নামে তখন থেকেই ভারচুয়ালি ১ উইকেট নেই ধরে রাখতে হয়, কারণ সৌম্য যে কোনো বলেই আউট হতে পারে এটা মাথায় নিয়েই রাখতে হবে। তবু তামিমকে ৯ ম্যাচেই একাদশে রাখতে হবে। বাংলাদেশের যে কয়েকজন ব্যাটসম্যান নিয়ে বিপক্ষ দল এনালাইসিস করে তামিম তাদের মধ্যে ১ নম্বরেই থাকবে। তাছাড়া ওপেনিং জুটি কিন্তু খারাপ হচ্ছে না। তামিমের নামটা ভুলে গিয়ে যদি কেবল ওপেনিং স্ট্যান্ড দেখি, তাকে সন্তোষজনকই বলবো।

ক্রিকেট বোঝা কোনো মানুষের পক্ষে তামিমকে রিপ্লেস করার চিন্তা মাথায় আসারই কারণ নেই। সহজ কথা ভারত, নিউজিল্যান্ড, কিংবা ইংল্যান্ড কোহলি, উইলিয়ামসন কিংবা বাটলারকে বিশ্রাম দেয়ার কথা চিন্তাই করবে না, ফর্ম যেমনই হোক, কারণ এরাই ব্যাটিংয়ের নিউক্লিয়াস। যদি ফর্ম খারাপ যায় সেটা নিতান্তই দুর্ভাগ্য।

  • পর্যবেক্ষণ ৩

যদিও খুব তাড়াতাড়ি হচ্ছে তবু বলবো, কোচ স্টিভ রোডস একজন মিডিওকর প্রকৃতির ট্যাকটিশিয়ান। তার গেমপ্ল্যানে সিরিয়াস লেভেলের সমস্যা আছে। সে এগ্রেসিভ ক্রিকেট একেবারেই বোঝে এটা মনে হয়নি। আপনারা যদি ভেবে থাকেন, ২৪৪ ডিফেন্ড করতে গিয়ে মাশরাফি আর মিরাজের বোলিং ওপেন করানোর সিদ্ধান্ত মাশরাফির একক, আমার ধারণা সেটা ভুল।

বাংলাদেশ যেসব ম্যাচ ডিফেন্ড করে সেখানে অল আউট করার চাইতে ম্যাচ ৫০ তম ওভারে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা বেশি লক্ষ্যণীয়। যেসব ম্যাচে আগে বোলিং করে সেখানেও উইকেট নেয়ার চাইতে রান আটকানো নীতি বেশি কাজ করে। স্যাম্পল হিসেবে শেন জার্গেনসন, চান্দিকা হাতুরুসিংহে আর স্টিভ রোডসের কোচিংকাল কে নেয়া যেতে পারে। এই সময়ে ঘুরেফিরে সাকিব, মুশফিক আর মাশরাফিই অধিনায়ক ছিল। অথচ কোচ বদলের সাথে সাথে খেলার স্টাইল বদলে গেছে। তার মানে কোচ ৮৩%, অধিনায়ক ১৭% এটাই দলের সিদ্ধান্তের প্রভাবক।

মাহমুদউল্লাহ’র প্লেয়িং রোল চিন্তা করুন। তার যেসব স্মরণীয় ইনিংস বেশিরভাগের ক্ষেত্রেই সে শুরু থেকে এগ্রেসিভ থাকে, তারপর সেটেল হয়। কিন্তু মাহমুদউল্লাহ’র শেষ ৯-১০ টা ইনিংস পর্যবেক্ষণ করে দেখবেন সে স্লো খেলছে, তার পার্টনার মারার চেষ্টা করছে। ৪৫ ওভার পার হওয়ার পরে সে স্ট্রোক খেলছে। এটা মাহমুদুল্লাহ এর ন্যাচারাল খেলার পরিপন্থী। আমার অনুমান হলো, ইংল্যান্ডের বিপক্ষেও একাদশে পরিবর্তন আসবে না, এক্ষেত্রে কোচের যুক্তি হতে পারে- মাত্র ১ ম্যাচ আগেও যেটা আমার বেস্ট একাদশ ছিল, ১ ম্যাচ হারার কারণেই নিশ্চয়ই সেটা খারাপ হয়ে যায়নি।

এই কোচ প্লেয়ারদের সাথে মেশে, লিগের খেলা দেখে এসব খবরেই সমর্থকেরা তাকে নিয়ে মহা সন্তুষ্ট। কিন্তু কোচের মূল কাজ যে গেম প্ল্যান, ট্যালেন্ট ম্যাক্সিমাইজ, রিসোর্স ইউটিলাইজেশন সেখানে তার চিন্তাধারা ২০০০ সালের সময়ের বাংলাদেশের। সময় যাক, আরো ভালোমত বোঝা যাবে সব।

  • পর্যবেক্ষণ ৪

সাকিব যে ২০০ ওয়ানডে খেলেছে ১০-১২ টা বাদে প্রতিটিই দেখেছি। এর মধ্যে ১০ টা ম্যাচও পাবো না যেখানে সাকিব কোয়ালিটি বলে আউট হয়েছে। তার আউটগুলো বরাবরই ক্যাজুয়াল ধরনের, সে কখনোই সেট হয় না সেই অর্থে, যে কারণে নির্ভরযোগ্যও হতে পারে না।সবাই বিশ্বাস করে সে রান পাবে, কিন্তু খেলার ধারার বিপরীতে আউট হয়ে যাবে।যে কারণে পরিসংখ্যান সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও আনুপাতিক হারে রিকগনিশন নেই।

তবে তামিম ফর্ম হারানোতে বাংলাদেশের ব্যাটিং প্রথম ৪ এ বিশেষত সাকিব আর মুশফিকের উপর পুরো নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। মিডিওকর মিথুন, মাহমুদউল্লাহ’র খেলার স্টাইল বদলে ফেলা, ৭ এ অধারাবাহিক মোসাদ্দেক বা সাব্বির- এরা ইনিংস টানতে পারছে না। পজিটিভ চিন্তার কোচ হলে মাহমুদুল্লাহকে ৫ এ উঠিয়ে এনে ৭,৮ এ ২ জন মিনি অলরাউন্ডার খেলাতো, কিংবা ভারত যেমন তাদের বিকল্প ওপেনার কেএল রাহুলকে ৪ এ পাঠিয়েছে, ইনফর্ম লিটনকে ৫ এ পাঠিয়ে ব্যাটিং ক্যাপাসিটি বাড়িয়ে একজন মিনি অলরাউন্ডার কমাতো।

কিন্তু, আমাদের এসব ঘটানোর জন্য ২-৩ ম্যাচ হেরে হিসাব নিকাশের বাইরে যেতে হবে। ১০-১৫ মিনিট নিবিড় পর্যবেক্ষণেই বোঝা যায় মিথুন ব্যাক আপ প্লেয়ার হতে পারে বড়জোর, সে হয়ে গেছে অটোচয়েজ। ফলে সাকিব একা যতই ডিটারমিনেশন দেখাক, নেগেটিভ গেমপ্ল্যান থেকে তার রেজাল্ট আসবে না।

এবার আইপিএলে বসে থাকাটা সাকিবের ক্যালিবারের একজন প্লেয়ারের অহমে আঘাত করারই কথা। সেখান থেকেও সে যদি এমন ডেসপারেট হয়ে উঠে, আমি চাইবো সৌম্য প্রথমবারের মতো আইপিএল এ দল পাওয়ার জন্য হলেও যেন বিধ্বংসীতা অব্যাহত রাখে। যতই বুলি আওড়াই, একজন প্রফেশনাল সীমিত ওভারের ক্রিকেটারের জন্য আইপিএল ফ্যাক্টকে বিরাট মোটিভেশন হিসেবেই দেখতে হবে।

  • পর্যবেক্ষণ ৫

গত ৫ বছরে মাশরাফি নিজেকে যে ইমেজ দাঁড় করিয়েছিল নির্বাচনের কারণে তাতে সামান্য আঁচড় লেগেছিল, কিন্তু বিশ্বকাপের ৯ ম্যাচ তার ৫ বছরের ইমেজকে ধূলিস্যাত করে দিবে মনে হচ্ছে। সে ৩০০+ রান ডিফেন্ড করার ম্যাচে বোলিং কোটা পূরণ করতে পারে না, ২৪৪ এও না, তাহলে একজন ফ্রন্টলাইন বোলার হিসেবে তার ভূমিকা কী আদতে?

পার্ট টাইমার মোসাদ্দেকের সাথে তাঁর বোলিং কোটা শেয়ার করতে হচ্ছে, দেখেও বোঝা যায় ম্যাচ খেলার মতো ফিটনেস তার নেই আপাতত। হাফ-ফিট অবস্থায় খেলাটাও কোনো সুচিন্তা নয়। কিন্তু আমাদের দেশে দলের চাইতে ব্যক্তি বড়ো সবসময়, যে কারণে মুশফিক আজীবন বাজে কিপিং করা সত্ত্বেও তাকে সরাতে পারে না সে অভিমানী এই অদ্ভুত যুক্তিতে, সিনিয়র খেলোয়াড় ইনজুরিতে পড়লে ফিজিও’র রিপোর্টের চাইতে খেলোয়াড় নিজে খেলবে কিনা তার উপরই ছেড়ে দেয়া হয়, আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে জুনিয়রদের বিশ্রামে পাঠালেও সিনিয়ররা সবাই খেলে।

এতে দলের কী হলো ব্যাপার না, ব্যক্তি সন্তুষ্টিই বড়ো কথা। মাশরাফি নিজেও হয়তো বুঝতে পারছে ইংল্যান্ডের ফ্ল্যাট পিচে তার ১২০ কিলোমিটার গতির বল ইফেক্টিভ হবে না, কিন্তু খেলাটার প্রতি তীব্র আবেগের কারণে ২-৩ ম্যাচ রেস্ট নিবে সেটাও করবে না। একবার ভাবুন, নিউজিল্যান্ডের ম্যাট হেনরি ১০ ওভারের কোটা পূরণ করছে না, কিন্তু জিমি নিশাম প্রতি ম্যাচে ১০ ওভার করছে; তাহলেই দলের চিত্র বোঝা যাবে। ফলে মাশরাফির বর্ণিল ক্যারিয়ারের শেষটা মর্মান্তিক ভাবে ঘটবে আশংকা করছি।।

  • পর্যবেক্ষণ ৬

সাইফউদ্দিন-মিরাজ দু’জনকেই খেলতে হলে ১ জনকে ৭ নম্বরে উঠে আসতে হবে, এই সরল সমীকরণ না বোঝার মূর্খ মাশরাফি বা সাকিবকে মনে হয় না। কিন্তু নেগেটিভ গেমপ্ল্যান এর কারণেই তারা ৮,৯ এ ব্যাট করছে। কাল এটার মূল্য দিতে হয়েছে, আরো দিতে হবে। তাদের ক্যারিয়ারয়া গ্রোথও ঠিকমতো হবে না এই ভুল গেম প্ল্যানের কারণে।

  • পর্যবেক্ষণ ৭

লিটন বা রুবেলকে নিতে হবে, এসব বলে প্লেয়ার দুটোর প্রতি অপ্রত্যাশিত রকমের চাপ তৈরি করে ফেলছি, সুযোগ পাওয়ার পর এটা তাদের প্রভাবিত করতে পারে। রুবেল কোনো এক্সপ্রেস বোলার নয়, বলের উপর তার নিয়ন্ত্রণ কম, যে কারণে রান বেশি দেয়। তবু তাকে ফেভার করার প্রধান কারণ খেলার ধারার বিপরীতে সে আচমকা উইকেট তুলে নেয়, কিংবা বিপক্ষ দলের সেরা ব্যাটসম্যানের উইকেট নিতে পারে।

অন্য যে কোনো বাংলাদেশি বোলার বোলিং করলে উইকেট কখন পড়বে সেই অপেক্ষায় থাকতে হয়, কিন্তু রুবেল যখন বোলিংয়ে আসে, উইকেট পড়লেও পড়তে পারে এমন এক অনুভূতি কাজ করে।

লিটন সৌম্যের মতো বিস্ফোরক ব্যাটসম্যান নয়, কয়েকটা টি-টোয়েনিট ইনিংস তার সম্বন্ধে মানুষের ভুল প্রত্যাশা তৈরি করেছে। কিন্তু সে গ্যাপ বের করতে পারে, ২০-২৫টা বল খেলে ফেললে উইকেটে জমে যায়, তার আগ পর্যন্ত শেকি থাকে। নিউজিল্যান্ডের ওই ৩টা ১ বাদ দিলে সে খুব বেশি অধারাবাহিক বলা যায় না। গতকাল দ্বাদশ খেলোয়াড় হিসেবে ফিল্ডিংয়ে তার এফোর্টও ছিল চোখে পড়ার মতো।

লিটন বা রুবেলকে নিলেই ইংল্যান্ড- অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দিবো তা নয়,তবু তারা একাদশে থাকা মানে সীমিত সামর্থ্যের সর্বোচ্চটুকু নিয়ে মাঠে নামে। শ্রীলঙ্কা ম্যাচের পরে ২ জনই সুযোগ পাবে নিশ্চিত, কিন্তু ততদিনে অনেকটা দেরি হয়ে যায় কিনা সেটাই ভাবাচ্ছে খুব!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।