চ্যাম্পিয়ন্স লিগে মেসির পারফরম্যান্স ও যাবতীয় ট্রলের জবাব

১.

ভেবেছিলাম ৩-০ তে পিছিয়ে থাকার পর বড় ধরণের অঘটন না ঘটলে লিভারপুলের পক্ষে পরের পর্বে যাওয়া সম্ভব হবে না। কিন্তু পরে দেখলাম ‘অঘটন’-টা ঘটেই গিয়েছে।

এরপর সোশ্যাল মিডিয়াতে স্বাভাবিক ভাবে যে ট্রল গুলো হবার কথা সেগুলো হচ্ছে। মেসি কালকের ম্যাচে গোল পায়নি, স্বাভাবিক ভাবেই ট্রল গুলোর একটা বড় অংশ মেসিকে নিয়েই করা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই টুর্নামেন্টে বার্সেলোনার বাদ পড়ার জন্য কি আসলেই মেসি দায়ী? সেটাই একটু আলোচনা করা যাক।

মেসি এই মৌসুমে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা (১২ টি)। কাজেই কেউ কেউ বলতেই পারে যে মেসিই একা বার্সাকে এই পর্যন্ত এনেছে। আবার বিপক্ষ দল বলতে পারে যে এই পর্যন্ত সবচেয়ে কঠিন দলের মুখোমুখি হবার ম্যাচটাতেই মেসি ব্যর্থ। লজিক আর অ্যান্টি লজিক দিয়ে বিবেচনা করলে আসলে কি বের হয়?

২.

একজন খেলোয়াড় দলের জন্য একা কতটুকু করতে পারে?

একটা হচ্ছে পিছিয়ে পড়ার পর দলকে নিজের পারফর্মেন্স দিয়ে ফেরত আনা। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় ক্রিসের এই মৌসুমে জুভের হয়ে এটিএম এর বিপক্ষে পারফর্মেন্স। এই ধরণের ম্যাচ গুলোতে হেরে গেলেও খেলোয়াড়ের কোন দোষ থাকে না, তবে কেউ যদি নিজের অতিমানবীয় পারফর্মেন্স দিয়ে দলকে জিতিয়ে ফেরাতে পারে তাহলে একস্ট্রা অর্ডিনারি হবে।

দ্বিতীয়টা হচ্ছে প্রথম লেগেই দলকে সুবিধা জনক একটা অবস্থানে পৌঁছিয়ে দেওয়া, যাতে পরের লেগে সে না থাকলেও অঘটন বাদে প্রতিপক্ষ জিততে না পারে। যেমন ২০১৬-১৭ মৌসুমে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের বিপক্ষে সেমিফাইনালের প্রথম লেগে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর হ্যাটট্রিক।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে মেসি কি এই মৌসুমে তেমন কোনো পারফরম্যান্স দেখাননি? গ্রুপ পর্ব বাদ দেই, সেখানে মেসি বাদেও বার্সার পরের পর্বে উঠার সামর্থ্য রয়েছে। নক আউটেও কিন্তু মেসি এবার ভালোই ছিলেন। দ্বিতীয় পর্বে লিওনের বিপক্ষে কিংবা কোয়ার্টারে ইউনাইটেডের বিপক্ষে মেসি স্বরূপেই ছিলেন। সেমিতেই সবচেয়ে বড় বাঁধাটা আসে। কিন্তু এখানেও প্রথম লেগে মেসি দু’টি গোল করেন, এর একটা ফ্রি-কিক থেকে।

৩-০ গোলে এগিয়ে থাকার পর বার্সার মতো দলের মেসি বাদেও সেটা ডিফেন্ড করা উচিত, না পারাটা মোটেও মেসির ব্যর্থতা নয়। সেটা দলগত ব্যর্থতা। একজন সিঙ্গেল খেলোয়াড়ের পক্ষে একটা দলের জন্য যতটুকু করা উচিত, মেসি এবারের ইউসিএলে তার প্রতিটাই করে গিয়েছেন।

৩.

এখন প্রশ্ন আসতে পারে সবচেয়ে প্রয়োজনের দিনেই মেসি কিভাবে ব্যর্থ হন?

আমার হিসেবে অন্তত এই মৌসুমে লজিকটা ভুল। একজন খেলোয়াড়ের একটা বাজে দিন যেতেই পারে। দলের বাকি খেলোয়াড়দেরও উচিত দলের সেরা খেলোয়াড়ের এই বাজে দিনটাকে ওভারকাম করা। মাদ্রিদের হয়ে ক্রিস এই সমর্থনটা পেয়েছেন। গত মৌসুমের সেমিফাইনাল আর ফাইনালে ক্রিশ্চিয়ানো ফ্লপ থাকার পরেও কিন্তু মাদ্রিদ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছে। এখন তাই বলে গত চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ে কি রোনালদোর অবদান নেই? কিংবা মাদ্রিদ হেরে গেলে রোনালদো দায়ী থাকতেন?

তা কিন্তু নয়। গত মৌসুমে পিএসজি কিংবা বায়ার্নের বিপক্ষে ক্রিশ্চিয়ানো নিজের দায়িত্বটা সেড়ে রেখেছিলেন। গত মৌসুমে যে দায়িত্বটা মাদ্রিদের হয়ে ক্রিশ্চিয়ানো পালন করেছিলেন, এই মৌসুমে মেসিও বার্সার হয়ে তেমনটা করেছেন।

মেসিও এই মৌসুমে প্রথম লেগে নিজের দায়িত্বটা পালন করছেন, দলকে এমন একটা অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছিলেন যাতে মেসি বাদেও বার্সার জেতা উচিত ছিল। কাজেই এই ম্যাচের জন্য মেসিকে দায়ী করা একটা বাজে ট্রল বাদে কিছু নয়।

৪.

তবে দল পিছিয়ে যাওয়ার পর দুর্দান্ত পারফর্ম করে ফিরিয়ে আনার মতো পারফর্মেন্সও সাম্প্রতিক ইতিহাসে মেসির নেই। একটা সময় মেসিরও এরকম কিছু পারফর্ম ছিল। ২০০৯-১০ মৌসুমে আর্সেনালের মাঠে ২-২ গোলে ড্র হবার পর ঘরের মাঠে প্রথমেই পিছিয়ে পড়েছিল বার্সা। সেখান থেকে একটানা ৪ টি গোল করে মেসিই বাচিয়ে নিয়ে যায় বার্সাকে। ২০১২-১৩ মৌসুমে মিলানের ঘরে ২-০ গোলে হেরে যাবার পর ঘরের মাঠে ৪-০ গোলে জয়ের প্রথম ২ টা গোলই মেসির।

ইদানিং এই ধরণের পারফর্মেন্সরই অভাব মেসির মাঝে। গত মৌসুমেও মেসি যথেষ্ট করেছিলেন। চেলসিকে দ্বিতীয় পর্বে হারানোর মূল ভুমিকাটাই মেসির।

পরপর দুই মৌসুম তিন গোলের লিড নিয়েও পরের লেগে হেরে যাবার দায় আপনি চাইলেই একজন খেলোয়াড়ের উপর চাপিয়ে ট্রল করতে পারেন। সেটা যৌক্তিক কিনা সেটাই হচ্ছে ভাববার বিষয়।

আমার লেখার সাথে পরিচিত তারা ভালো করেই জানেন যে আমি নিজেও মেসির সমালোচনা যথেষ্টই করে থাকি। কাজেই অকারণে মেসির কিংবা অন্য কারো পক্ষপাতিত্ব করা আমার স্বভাবে নেই। আমি শুধু লজিকটার পক্ষে থাকার চেষ্টা করি।

অবশ্য ইউরো জয়ে রোনালদো অবদান যারা স্বীকার করেন না তাদেরকে কাউন্টার হিসেবে যুক্তি দিয়ে বিচার না করে ট্রল করাটাই হয়তো সমীচিন।

তবে ট্রল করুন আর যাই করুন, মন থেকে সত্য বিষয়টা জানা থাকলে আপনারই ভালো। নয়তো দিন শেষে মানুষের কাছে জিতে গেলেও নিজের কাছে আপনি পরাজিত দলেই থাকবেন।

৫.

আমার মতে, বার্সেলোনা দলে দু’টো পরিবর্তন দরকার। সুয়ারেজকে রিপ্লেস করে একজন ফর্মে থাকা নাম্বার নাইন নিয়ে আসা এবং অবশ্যই কোচ আর্নেস্তো ভালভার্দেকে পাল্টানো। বাকিটা বার্সা সমর্থকেরা বলতে পারবেন।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।