স্টারকিড মানেই অবারিত সাফল্য নয়!

বলিউডে অভিনয় শিল্পীদের ‍উত্থানের স্পষ্ট দুটি বিভাজন আছে। প্রথমটা খুব কঠিন। প্রতিভা যদি থাকে, পরিশ্রম করো। অনেক কাঠখড় পোড়াও, পরিচালক-প্রযোজকদের পেছন পেছন ঘোরো। হয়তো সহকারী পরিচালক কিংবা ছোট কোনো চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ মিলবে। এরপর চেষ্টা চালিয়ে যাও বড় কোনো সুযোগের জন্য।

আর দ্বিতীয়টা খুবই সহজ। কোনো বিখ্যাত বলিউড পরিবারে জন্ম নাও, নামী কোনো পরিচালক ঠিকই তোমাকে ব্রেক দিয়ে দেবে। যদিও, পরের ধাপে যেতে নিজের প্রতিভা ও পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। শুধু এই দু’টোর অভাবেই তো অকালে কত স্টারকিড ঝরে গেলেন। চলুন তাঁদের ব্যাপারে বিস্তারিত জানি।

  • সুনীল আনন্দ

দেব আনন্দের মত কিংবদন্তীতুল্য অভিনেতার সন্তান ছিলেন তিনি। দেব আনন্দ তাকে লঞ্চ করেছিলেন ‘আনান্দ অওর আনান্দ’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। বাবা কোটি তরুণীর হৃদয়ে জায়গা করতে পারলেও ব্যর্থ হয়েছিলেন সুনীল।১৯৮৪ সালে রূপালি পর্দায় অভিষেকের পর কিছু ফ্লপ ছবিতে দেখা গিয়েছিল তাকে। অতঃপর, তিনি অভিনয় ছেড়ে দেন। বর্তমানে তিনি যুক্ত আছেন তার বাবার প্রোডাকশন কোম্পানি ‘নবকেতন ফিল্মস’-এর সাথে।

  • রাজীব কাপুর

রূপালি পর্দার জনপ্রিয় অভিনেতা রাজ কাপুরের সন্তান ছিলেন তিনি। তবে, বাবার মত হতে পারেননি তিনি। ১৩ টা চলচ্চিত্রের ছোট্ট ক্যারিয়ারের উল্লেখ করার মত একমাত্র চলচ্চিত্র হল ‘রাম তেরি গঙ্গা ম্যায়লি’। ফিল্মটি রিলিজ পেয়েছিল ১৯৮৫ সালে।

  • শাদাব খান

আমজাদ খান ওরফে গাব্বার সিং এর সন্তান তিনি। বলিউডে তাঁর অভিষেক হয় ‘রাজা কি আয়েগি বারাত’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে, রানী মুখার্জীর বিপরীতে। রানীরও প্রথম হিন্দি সিনেমা ছিল এটি। রানী পরবর্তীতে চলচ্চিত্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেও পারেননি শাদাব। আড়ালেই হারিয়ে যান তিনি।

  • করণ কাপুর

শশী কাপুরের সন্তান ছিলেন তিনি। বোম্বে ডাইং-এর মত নামকরা কোম্পানির পোস্টার বয় ছিলেন করণ। তার প্রথম চলচ্চিত্র ছিল ‘সালতানাত’। চলচ্চিত্রটি তার ক্যারিয়ারের জন্য কোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেনি। চলচ্চিত্রাঙ্গন ছেড়ে দেবার আগে কিছু ছবিতে অভিনয় করে নিজের ভাগ্য বদলানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছিলেন তিনি।

  • কুনাল গোস্বামী

মনোজ কুমারের সন্তান ছিলেন তিনি। বাবার মত অভিনয়ে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে পারেননি তিনি। তাঁকে ‘ঘুঙরু’, ‘কালাকার’, ‘পাপ কি কামি’র মত বি গ্রেড চলচ্চিত্রে দেখা গিয়েছিল। তবে, তাঁকে মনে রাখা হবে ‘নীলে নীলে আম্বার পার’ গানটির জন্য। ‘কালাকার’ ফিল্মের এই গানটি তার সাথে ছিলেন প্রয়াত শ্রীদেবী।

  • মিমো চক্রবর্তী

মহাক্ষয় চক্রবর্তী ফিল্মিদুনিয়ায় আসেন মিমো চক্রবর্তী নামে। তিনি ছিলেন ‘ডিস্কো ড্যান্সার’ মিঠুন চক্রবর্তীর ছেলে। তাঁর ছিল না তার বাবার মত নাচের দক্ষতা, ছিল না অভিনয় গুণ। বলিউডে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেননি তিনি। ২০০৮ সালে ‘জিমি’র মাধ্যমে হিন্দি চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় তার। ২০১৩ সালে ‘এনিমি’ চলচ্চিত্রে মিমোর সাথে রূপালি পর্দায় দেখা গিয়েছিল মিঠুন চক্রবর্তীকে। কোনোটাই ব্যবসা সাফল্য পায়নি।

  • আরিয়া বাব্বার

রাজ বাব্বারের সন্তান তিনি। ‘গুরু’, ‘রেডি’র মত ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রে দেখা গিয়েছিল তাকে। আবার, ‘তিস মার খান’-এর মত ফ্লপ ছবিতেও অভিনয় করেছেন তিনি। তিনি কখনো পৌঁছাতে পারেননি তাঁর বাবার উচ্চতায়।

  • এশা দেওল

যখন আপনি হেমা মালিনী এবং ধর্মেন্দ্রর মত কিংবদন্তীদের সন্তান হবেন তখন আপনার জিনেই থাকবে দুর্দান্ত অভিনয় দক্ষতা, তাই না? ভুল! এশা দেওলের দিকে তাকালে অন্তত তাই মনে হয়। বলিউডে তাঁর বলার মত উপস্থিতি বলতে ২০০৬ সালে ‘ধুম’ চলচ্চিত্রে তার আইটেম নাম্বার। একের পর এক ফ্লপ ছবির পর তিনি বিয়ের পিঁড়িতে বসেন ও নিজেকে গুটিয়ে রূপালি পর্দার দুনিয়া থেকে।

  • উদয় চোপড়া

২০০০ সালে ‘মোহাব্বতেঁ’-এর মত ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অভিষেক হয়েছিল তার। অমিতাভ, শাহরুখ, ঐশ্বরিয়ার মত অভিনয়শিল্পীদের সাথে একই ফিল্মে অভিনয় করা সত্ত্বেও প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন তিনি। এরপর তার বাবা যশ চোপড়ার প্রোডাকশন কোম্পানির কিছু ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। ধুম সিরিজে ‘আলি খান’ হিসেবে অভিনয় করা তার ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় অর্জন। সম্ভবত, তার ক্যারিয়ারের সবচাইতে বড় অর্জন নার্গিস ফাকরির সাথে সম্পর্ক রাখা। তাও, নিন্দুকেরা বলেন যে, এই প্রেম সম্ভব হয়েছিল স্বয়ং যশ চোপড়া’র ছেলে হওয়ার সুবাদে।

  • তুষার কাপুর

তুষার আর উদয় যেন কেউ কারো থেকে কম না। জিতেন্দ্র’র মত সুপারস্টার তার বাবা। কিন্তু, রূপালি পর্দায় ব্যর্থ তুষার।তা র ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সেরা পারফর্মেন্স ‘গোলমাল’ ফ্রাঞ্চাইজিতে তার বোবার অভিনয়। আর হ্যাঁ,তিনি উদয় চোপড়া থেকে সফল। এখানেও অবশ্য পরিবারের হাত আছে। কারণ, তাঁর বোন হলেন স্বনামধন্য নির্মাতা একতা কাপুর।

  • কুমার গৌরব

রাজেন্দ্র কুমারের ছেলের মাঝে ছিল স্টার হবার মত দৈহিক গঠন। দেখতে সুদর্শন, দীর্ঘকায় কুমার গৌরব মহেশ ভাটের ‘জানাম’ ফিল্মের মাধ্যমে প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। ‘লাভ স্টোরি’, ‘নাম’-এর মত ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি। কিন্তু, একের পর এক ফ্লপ তার ক্যারিয়ারের লাল বাতি বাজিয়ে দেয়।

  • ফারদিন খান

তার বাবা ফিরোজ খান ছিলেন একজন স্টাইলিশ অভিনেতা। অন স্ক্রিন ও অফ স্ক্রিনে তিনে ছিলেন একজন দুর্দান্ত ব্যক্তিত্ব। তাঁর ছেলে ফারদিন খানের বলিউডে অভিষেক হয় ৯০ দশকের শেষদিকে ‘প্রেম অঙ্গন’ এর মাধ্যমে। এই চলচ্চিত্রের জন্য ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পান ‘সেরা নবাগত অভিনেতা’ ক্যাটাগরিতে। এরপর ‘দেব’-এর মত চলচ্চিত্র উপহার দিলেও একের পর এক ফ্লপ তার চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারের বারোটা বাজিয়ে দেয়।

  • তানিশা মুখার্জী

তনুজা চন্দ্রের মেয়ে এবং তার কাজলের বোন হবার পরেও তানিশা পরিবারের সুনাম রাখতে পারেননি। দিয়েছেন ‘নিল এন নিক্কি’, ‘ওয়ান টু থ্রি’-এর মত ফ্লপ। ফিল্মি দুনিয়ায় সর্বশেষ তাকে দেখা গিয়েছে ‘আন্না’ ফিল্মে। ‘সরকার রাজ’ সিনেমায় তিনি অভিষেক বচ্চনের স্ত্রী’র চরিত্রও করেছিলেন।

  • সিকান্দার খের

অনুপম খের ও কিরণ খেরের মত প্রতিভাবান অভিনয়শিল্পীর সন্তান হবার পরেও নিজের নাম তাদের মত উজ্জ্বল করতে পারেননি সিকান্দার। ২০০০ সালে ‘উডস্টক ভিলা’ ফিল্মের মাধ্যমে অভিষেক হয় তাঁর। তাঁকে সর্বশেষ দেখা যায় ২০১৬ সালের সিনেমা ‘তেরে বিন লাদেন ২’-এ।

  • রিয়া সেন

রিয়ার মা মুনমুন সেনও ছিলেন তারকার সন্তান। সুচিত্রা সেনের মত কিংবদন্তীতুল্য নায়িকা রিয়ার নানী। তার মা মুনমুন সেন ও তার বেন রাইমা সেন চলচ্চিত্রাঙ্গনে নিজেদের নাম উজ্জ্বল করেছেন। রিয়ার ক্যারিয়ারে একবারই নিজের নাম এনেছিলেন সবার মুখে মুখে, সেটাও আস্মিত প্যাটেলের সাথে স্ক্যান্ডালে জড়িয়ে।

  • পুরু রাজকুমার

রাজ কুমারের সন্তান পুরু রাজকুমারের বলিউডে অভিষেক হয় ১৯৯৬ সালে ‘বাল ব্রাহ্মাচারী’ সিনেমায়। সিনেমাটি মুক্তি পেয়েছিল তার বাবার মৃত্যুর কয়েকদিন পর। সিনেমাটি ব্যবসাসফল হতে ব্যর্থ হয়েছিল। তিন বছর পর ‘হামারা দিল আপকে পাস হ্যায়’ চলচ্চিত্রে খলচরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে ফিল্মিদুনিয়ায় ফেরেন তিনি। ‘মিশন কাশ্মীর’ চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করেছিলেন বিশেষ ভূমিকায়। এরপর তিনি একটি ‘হিট অ্যান্ড রান’ কেসের মামলায় গ্রেফতার হন। যদিও তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণ করা যায়নি। মূলত, এরপরই তার ক্যারিয়ার পতনের দিকে ধাবিত হয়। সর্বশেষ তাকে দেখা গিয়েছে প্রভু দেবার ‘অ্যাকশন জ্যাকশন’ চলচ্চিত্রে।

  • জ্যাকি ভাগনানি

পিতা ভাসু ভাগনানি ছিলেন ‘কুলি নাম্বার ওয়ান’-এর মত সিনেমার পরিচালক। কিন্তু, তিনি তার ছেলের ক্যারিয়ারের পথ প্রদর্শক হতে পারেননি। ‘ফালতু’ চলচ্চিত্রের অভিনেতা তার প্রথম চলচ্চিত্র ‘কাল কিসনে দেখা’র জন্য জিতেছিলেন আইফা অ্যাওয়ার্ড, সেরা নবাগত অভিনেতা ক্যাটাগরিতে। এরপর জ্যাকি ভাগনানির উপস্থিতি কখনো স্থান করে নিতে পারেননি দর্শক কিংবা সমালোচকদের অন্তরে।

  • হারমান বাওয়েজা

আর্ট ডিরেক্টর হ্যারি বাওয়েজা ও পরিচালক পাম্মি বাওয়েজার সন্তান তিনি। ‘লাভ স্টোরি ২০৫০’ নামের এক সাইফাই মুভির মাধ্যমে ফিল্মি জগতে অভিষেক তার। সিনেমাটি ব্যর্থ হয়েছিল বক্স অফিসে। এরপর তাঁকে দেখা গিয়েছে ‘ভিক্টরি’, ‘হোয়াট’জ ইওর রাশি?’, ‘ডিশকিয়াও’ ও ‘চার সাহিবজাদে’ চলচ্চিত্রে। সবগুলো মুখ থুবড়ে পড়েছিল বক্স অফিসে। তাঁর ফিল্মি ক্যারিয়ারের বড় প্রাপ্তি সম্ভবত প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার সাবেক প্রেমিক হওয়া!

  • অধ্যয়ন সুমান

তাঁর বাবা শেখর সুমান, একজন জনপ্রিয় টিভি অভিনেতা। তাঁকে দেখা গিয়েছে ‘দেখ ভাই দেখ’, ‘রিপোর্টার’, ‘আন্দাজ’, ‘ছোটে বাবু’, ‘মুভারস অ্যান্ড শেকারস’ এর মত জনপ্রিয় টিভি শোতে। তার ছেলে অধ্যয়নের অভিষেক হয় ‘হাল-এ-দিল’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। এই সিনেমায় অভিনয়ের জন্য তিনি মনোনীত হয়েছিলেন ফিল্মফেয়ার পুরস্কারের সেরা নবাগত অভিনেতা ক্যাটাগরিতে। এরপর তাকে দেখা গিয়েছে ‘রাজ দ্য মিস্ট্রি কন্টিনিউস’, ‘জাশন’, ‘হিম্মতওয়ালা’র মত চলচ্চিত্রে। অধ্যয়ন নিজের জায়গা বলিউডে পাকাপোক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। উপরন্তু,তার ব্যর্থ ক্যারিয়ার থেকে তিনি কঙ্গনা রনৌতের সাথে প্রেমের সম্পর্কের জন্য বেশি বিখ্যাত ছিলেন!

  • সোহা আলী খান

তাঁর পরিবারে তারকার কোনো কমতি নেই। মা স্বয়ং শর্মিলা ঠাকুর। বাবা ভারতীয় জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক মনসুর আলী খান পতৌদি। ভাই সাইফ আলী খান, ভাইয়ের প্রথম স্ত্রী অমৃতা সিং, দ্বিতীয় স্ত্রী কারিনা কাপুর। তারপরও কখনোই বড় তারকা হয়ে উঠতে পারেননি সোহা আলী খান। ৩০ টার মত সিনেমা করেছেন, কোনোটাতেই খুব বেশি সুনাম কুড়াতে পারেননি নবাব বাড়ির এই মেয়ে। বলিউড অবশ্য তাঁকে ‘রঙ দে বাসন্তী’ সিনেমার জন্য হলেও মনে রাখবে।

– ইন্ডিয়া.কম অবলম্বনে

 

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।