তোরা কি চাস? কোথায় নিয়ে যাবি আমাকে?

আমি ১৯৬৯ সালে কাজের লোক হিসেবে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে আসি। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট ভোর ৫টায় বঙ্গবন্ধু নিহত হন। তখন আমি বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে ছিলাম। ওইদিন অর্থাৎ ঘটনার দিন রাত্রে আমি এবং সেলিম দোতলায় বঙ্গবন্ধুর বেডরুমের সাম বারান্দায় ঘুমিয়েছিলাম। আনুমানিক ভোর ৫টার দিকে হঠাৎ বেগম মুজিব দরজা খুলে বাইরে আসেন এবং বলেন যে, সেরনিয়াবাতের বাসায় দুষ্কৃতিকারীরা আক্রমণ করেছে। ওইদিন তিনতলায় শেখ কামাল এবং তাঁর স্ত্রী সুলতানা ঘুমিয়েছিল। ওইদিন শেখ জামাল ও তাঁর স্ত্রী রোজী এবং ভাই শেখ নাসের দোতলায় ঘুমিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর স্ত্রী এবং শেখ রাসেল দোতলায় একই রুমে ঘুমিয়েছিল। নিচতলায় পিএ মহিতুল ইসলামসহ অনান্য কর্মচারী ছিল।

বেগম মুজিবের কথা শুনে আমি তাড়াতাড়ি লেকের পাড়ে গিয়ে দেখি কিছু আর্মি গুলি করতে করতে আমাদের বাড়ির দিকে আসিতেছে। তখন আমি আবার বাসায় ঢুকি এবং দেখি পি.এ/রিসিপশন রুমে বঙ্গবন্ধু তার সাথে কথা বলিতেছে। আমি পিছনের সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় এসে দেখি বেগম মুজিব দোতলায় ছোটাছুটি করছে। আমি সাথে সাথে তিনতলায় যাই এবং আমাদের বাসা আর্মিরা আক্রমণ করেছে বলে কামাল ভাইকে উঠাই। কামাল ভাই তাড়াতাড়ি একটা প্যান্ট আর শার্ট পরে নিচের দিকে যায়। আমি তাঁর স্ত্রী সুলতানকে নিয়ে দোতলায় আসি। দোতলায় গিয়ে একইভাবে আমাদের বাসা আর্মিরা আক্রমণ করেছে বলে জামাল ভাইকে উঠাই।

তিনি তাড়াতাড়ি প্যান্ট, শার্ট পরে তাঁর মার রুমে যান। সাথে তাঁর স্ত্রীও যান। এই সময়ও খুব গোলাগুলি হচ্ছিল। একপর্যায় কামাল ভাইয়ের আর্ত চিৎকার শুনতে পাই। একই সময় বঙ্গবন্ধু দোতালায় আসিয়া রুমে ঢুকেন এবং দরজা বন্ধ করিয়া দেন। প্রচণ্ড গোলাগুলি একসময় বন্ধ হয়ে যায়। তারপর বঙ্গবন্ধু দরজা খুলে আবার বাইরে এলে আর্মিরা তার বেডরুমের সামনে চারপাশে তাহাকে ঘিরে ফেলে। আমি আর্মিদের পিছনে ছিলাম। আর্মিদের লক্ষ্য করে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘তোরা কি চাস? কোথায় নিয়ে যাবি আমাকে?’

তারা বঙ্গবন্ধুকে তখন সিঁড়ির দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। সিঁড়ির ২/৩ ধাপ নামার পরে নিচের দিক হতে অনেক আর্মি বঙ্গবন্ধুকে গুলি করে। গুলি খেয়ে সাথে সাথে বঙ্গবন্ধু সিঁড়িতে লুটিয়ে পড়েন। আমি তখন আর্মিদের পিছনে ছিলাম। তারা আমাকে জিজ্ঞাসা করে, ‘তুমি কি করো? উত্তরে আমি বলি, ‘কাজ করি।’ তখন তারা আমাকে ভিতরে যেতে বলে। আমি বেগম মুজিবের রুমের বাথরুমে গিয়ে আশ্রয় নেই। সেখানে বেগম মুজিবকে বলি বঙ্গবন্ধুকে গুলি করেছে। ওই বাথরুমে শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা, শেখ জামাল ও তার স্ত্রী রোজি, শেখ রাসেল, বেগম মুজিব ও বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসের এবং আমি আশ্রয় নিই। শেখ নাসের ওই বাথরুমে আসার আগে হাতে গুলি লাগে,তাঁর হাত হতে তখন রক্ত ঝরছে। বেগম মুজিব শাড়ির আঁচল ছিড়ে তাঁর রক্ত মুছেন। এরপর আর্মিরা আবার দোতালায় আসে এবং দরজা পিটাতে থাকলে বেগম মুজিব দরজা খুলিতে যান এবং বলেন, ‘মরলে সবাই একসাথে মরবো।’ এই বলে বেগম মুজিব দরজা খুললে আর্মিরা রুমের ভিতর ঢুকে পড়ে এবং শেখ

নাসের, শেখ রাসেল, বেগম মুজিব এবং আমাকে নিচের দিকে নিয়ে আসছিল। তখন বেগম মুজিব সিঁড়িতে বঙ্গবন্ধুর লাশ দেখে বলেন, ‘আমি যাবনা, আমাকে এখানেই মেরে ফেলো।’ এই কথার পর আর্মিরা তাকে দোতলায় তাঁর রুমের দিকে নিয়ে যায়। একটু পরেই ওই রুমে গুলির শব্দসহ মেয়েদের আর্ত চিৎকার শুনতে পাই। আর্মিরা নাসের, রাসেল ও আমাকে নিচতলায় এনে লাইনে দাড় করায়। সেখানে সাদা পোশাকের একজন পুলিশের লাশ দেখি। নিচে নাসেরকে লক্ষ করে জিজ্ঞাসা করে, ‘তুমি কে’, তিনি শেখ নাসের বলে পরিচয় দিলে তাহাকে নিচতলার বাথরুমে নিয়ে যায়।

একটু পরেই গুলির শব্দ ও তাঁর ‘মাগো’ বলে আর্ত চিৎকার শুনতে পাই। শেখ রাসেল ‘মার কাছে যাবো’ বলে তখন কান্নাকাটি করছিল এবং পি,এ মহিতুল ইসলামকে ধরে বলছিল, ‘ভাই, ‘আমাকে মারবে না তো?’ এমন সময় একজন আর্মি তাহাকে বলল, ‘চলো তোমার মায়ের কাছে নিয়ে যাই।’ এই বলে তাহাকে দোতলায় নিয়ে যায়। একটু পরেই কয়েকটি গুলির শব্দ ও আর্ত চিৎকার শুনতে পাই।

লাইনে দাঁড়ানো অবস্থায় সেলিমের হাতে এবং পেটে দুইটি গুলির জখম দেখলাম। এর পর দেখলাম কালো পোশাক পরিহিত আর্মিরা আমাদের বাসার সব জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। তখন ডিএসপি নুরুল ইসলাম এবং পিএ/রিসিপশনিস্ট মহিতুল ইসলামকে আহত দেখি। এর পরে আমাদের বাসার সামনে একটা ট্যাংক আসে। ট্যাংক হতে কয়েকজন আর্মি নেমে ভিতরের আর্মিদের লক্ষ্য করে জিজ্ঞাসা করে ভিতরে কে আছে, উত্তরে ভিতরের আর্মিরা বলে, ‘All are finished,’ অনুমান বেলা ১২টার দিকে আমাকে ছেড়ে দিবার পর আমি প্রানভয়ে আমার গ্রামের বাড়ি টুঙ্গিপাড়া চলে যাই।

স্বাক্ষর

আবদুর রহমান শেখ (রমা)

__________

বঙ্গবন্ধুর বাড়ির কাজের ছেলে আব্দুর রহমান শেখ ওরফে রমা’র জবানবন্দি। কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ‘দেয়াল’ বই থেকে নেওয়া।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।