বিশ্বকাপের ঘোর লাগা ফাইনাল শেষে ১১ উপলব্ধি

প্রায় ৫০ বছরের ওয়ানডে ক্রিকেটে গতকালকের ইংল্যান্ড-নিউজিল্যান্ড ফাইনালের চাইতে আকর্ষণীয় এবং নাটকীয় ম্যাচ কেউ দেখে থাকলে জানানোর অনুরোধ করছি। আমি টেস্ট ম্যাচ খুব একটা দেখি না, ৯৬ এর আগে যেসব ওয়ানডে হয়েছে দেখার সুযোগ ঘটেনি; গতকালের খেলাটি তাই আমার দেখা ক্রিকেট ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম ম্যাচ; ১৯৯৯ বিশ্বকাপে সাউথ আফ্রিকা-অস্ট্রেলিয়া সেমিফাইনালকেও এটি বড়ো ব্যবধানে হারিয়ে দিয়েছে। ম্যাচ শেষ হওয়ার পরও ঘণ্টা-দুয়েক অন্য কিছু চিন্তা করতে পারিনি, এমনই আবিষ্ট হয়ে পড়েছিলাম।

এই ম্যাচ দেখার পর আমার উপলব্ধি সংখ্যা আসলে অসংখ্য। তবু ক্রিকেট যেহেতু ১১ জনের খেলা, উপলব্ধিগুলোকেও যাচাই-বাছাই করে ১১তে নামিয়ে আনলাম।

  • উপলব্ধি ১

আমি ভাগ্যে বিশ্বাস করি না। মানুষের চেষ্টা, ইনটেনশন আর স্যাক্রিফাইস থেকেই তার কর্মফল আসে। কিন্তু ফলাফল সবসময় সরাসরি উপায়ে আসে না, অন্য কোনো পরিবর্তিত রূপে তা আবির্ভূত হয়। ক্রিকেট খেলা সম্বন্ধে আমার এতদিনের ইমপ্রেসন ছিল, এটা মনস্তাত্ত্বিক আর কঠোর স্কিল প্রদর্শনীর খেলা। মানসিকভাবে যে দৃঢ় এবং সাহসী, সে স্কিল প্রদর্শনের ক্ষেত্রেও দক্ষতা বেশি দেখাতে পারে। ক্রিকেট সম্বন্ধে আমার ধারণা এখনো অপরিবর্তিতই আছে, তবে সামান্য পরিমার্জনা আছে। ক্রিকেটে ক্রেডিট কার্ড সিস্টেমে আপনার ভাগ্যেরও সহায়তা লাগবে। যতটুকু সহায়তা নিবেন, একটি নির্দিষ্ট পারসেন্ট সুদে তা কোনো একসময় ফেরতও দিতে হবে।

বিশ্বকাপ শুরুর আগে নিউজিল্যান্ডকে ফেবারিটের তালিকায় ৩ নম্বরে রেখেছিলাম। কিন্তু টুর্নামেন্ট যত গড়িয়েছে মনে হয়েছে তারা আসলে ৫ বা ৬ নম্বরে থাকার মতো। সেই দল ফাইনালে উঠে গেল কীভাবে? টুর্নামেন্ট শুরুর আগে এই বিশ্বকাপের পার স্কোর যেখানে ৩০০+ অনুমান করেছিলো বেশিরভাগ ক্রিকেট এক্সপার্ট, সেখানে একবারও ৩০০ না করে, এমনকি ২৭০ চেজও না করে একটা দল ফাইনালে উঠে গেল! বাংলাদেশ, সাউথ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ- ৩ ম্যাচেই একটু এদিক-সেদিক হলে তাদের হেরে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি ছিল, গ্রুপ পর্বে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটা পরিত্যক্ত না হলে তাদের জায়গায় পাকিস্তান হয়তোবা সেমিতে উঠে যেত; এগুলোকে আপনি ভাগ্য ছাড়া কী বলবেন!

ক্রেডিট কার্ড সাধারণত এত দ্রুত ঋণ ফেরত দেয়ার জন্য তাগাদা দেয় না। আমার ধারণা ছিল নিউজিল্যান্ড এই টুর্নামেন্টে ভাগ্য দিয়েই পার পেয়ে যাবে, পরের কোনো আসরে মাশুল দিতে হবে। কিন্তু তারা এত বেশি ভাগ্য ব্যবহার করে ফেলেছে, শোধবোধের জন্য দেরি করা গেলো না। মিশেল স্যান্টনার শেষ বলটা ডাক না করে যদি খেলার চেষ্টা করে ১ রান নিত! কিংবা বাউন্ডারি লাইনে কতো ফ্যান্টাস্টিক ক্যাচ দেখলাম টুর্নামেন্টজুড়ে, তুলনায় সহজ একটি ক্যাচ বোল্ট ছক্কা বানিয়ে দিল, গাপটিলের থ্রো ঠিকঠাকই ছিল, সেটা স্টোকসের ব্যাটে লেগে ৪ হয়ে গেল, কিংবা সুপার ওভারে গাপ্টিল ৩ বার ঝুঁকিপূর্ণ ২ রান নিলো, থ্রো হলো ভুল প্রান্তে; যখন ২ রান নেয়াটা সবচাইতে জরুরী তখনই থ্রো হলো বিদ্যুৎগতিতে। নিউজিল্যান্ডে ক্রিকেটের চাইতে অনেক বেশি জনপ্রিয় রাগবি; ২ বারের ফাইনাল খেলা ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা বাড়াতে কাজে আসবে।

পক্ষান্তরে ইংল্যান্ড ব্যাটিং বা বোলিংয়ে ব্যালান্সড দল, তারা টেস্ট ক্রিকেটকে যতটা গুরুত্ব দেয়, ওয়ানডের ব্যাপারে ছিল ততটাই উদাসীন। তবু ২০১৫ তে প্রথম পর্ব থেকে বিদায় নেয়ার পরে তারা কমফোর্ট জোন ভেঙ্গে সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, চেষ্টা করেছে; উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে হলেও কাপটা তাদের হাতেই উঠেছে। ভাগ্য যে ওভাররেটেড ব্যাপার, কর্মফল মানুষের নিজের হাতে তা আবারো প্রমাণিত হলো।

  • উপলব্ধি ২

এখনকার ক্রিকেটে সবচাইতে প্যাথেটিক হলো ফাস্ট বোলিং দেখা। বোলারের মধ্যে ইয়র্কার দেয়ার চেষ্টা নেই, সুইং করানোর প্রবণতা বা যোগ্যতা নেই, বোলিংয়ে আগ্রাসন নেই; টি-টোয়েন্টির কল্যাণে স্লোয়ার, টেনিস বল বাউন্সার, কাটার এগুলো হয়েছে ভালো বোলারের অস্ত্র। ব্যাটসম্যান বেইস বল স্টাইলে মারতে যাবে, কিন্তু স্লোয়ারের কারণে মিসটাইমড হয়ে ক্যাচ তুলে দেবে – এটা ক্রিকেটের জন্য অভিশাপ। ইয়র্কার বা সুইংয়ের চাইতে যে বড়ো কোনো অস্ত্র নেই তা বুমরাহ, স্টার্ক এর বোলিং আবারো প্রমাণ করলো। এধরনের কোয়ালিটি বোলিংয়ের জন্য পরিশ্রম লাগে।

তার চাইতে স্লোয়ার-টোয়ার শিখে নেয়া তুলনামূলক কম শ্রমসাধ্য; ২০২৭ বিশ্বকাপেই হয়তোবা ইয়র্কার দিতে জানা বা সুইং করাতে জানা কোনো এগ্রেসিভ ফাস্ট বোলারই দেখা যাবে না, ইনিংসের প্রথম ওভারেই ‘নাকল’ বল ডেলিভারি দিতে শুরু করেছে। বুমরাহ বা স্টার্কের মতো বোলার আছে বলেই ক্রিকেটটা এখনো সুন্দর।

  • উপলব্ধি ৩

আম্পায়ারিং বিষয়ে আইসিসির আরো কঠোর হওয়ার সময় এসেছে। বিশ্বকাপজুড়েই বাজে আম্পায়ারিং অত্যন্ত দৃষ্টিকটু লেগেছে। যে কোনো আম্পায়ারই ভুল সিদ্ধান্ত দিতে পারে। তবে একটু ভালোমতো খেয়াল করলেই দেখা যাবে, সুনির্দিষ্ট ৩-৪ জন আম্পায়ার যেসব ম্যাচে দায়িত্ব পালন করেছে সেগুলোতেই ভুল সিদ্ধান্ত বেশি হয়েছে৷ সেইসব আম্পায়ার কারা আইসিসির তা অজানা নয়, এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে আম্পায়ারিংয়ের মান আরো নিম্নগামী হবে।

বাংলাদেশের কোনো আম্পায়ার দায়িত্ব না পাওয়াটাও বিসিবির একটি ব্যর্থতা হিসেবেই দেখবো। বাংলাদেশের আম্পায়াররা মানসম্মত নয় এটা বলার আগে বাংলাদেশের আম্পায়ারদের বিভিন্ন দেশের সিরিজে সুযোগ দিয়ে দেখা উচিত; ধর্মসেনা বা কাটেলবার্গ এর চাইতে চাইলেও খারাপ করা সম্ভব নয়। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে শরাফোদ্দৌলা সৈকতের ব্যাপারে আশাবাদী, তার আম্পায়ারিং আন্তর্জাতিক মান থেকে পিছিয়ে নেই খুব৷

  • উপলব্ধি ৪

১০ দলের বিশ্বকাপ এবং ফরম্যাট নিয়ে অনেকের মতো আমারও আপত্তি ছিল। কিন্তু ৩-৪টি দল বাদে বাকিদের মান এমনই নিম্নগামী, এটা ক্রিকেটের জন্য দুঃসংবাদ। টুর্নামেন্টজুড়ে আমি আন্ডারডগদের পক্ষে প্রেডিকশন দিয়েছি। কিন্তু বাংলাদেশ-সাউথ আফ্রিকা, পাকিস্তান-ইংল্যান্ড, শ্রীলংকা-ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া-সাউথ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড-ভারত, মাত্র ৫টি ম্যাচে আন্ডারডগ বিজয়ী হয়েছে; আগের আসরগুলোতে এই সংখ্যাটা আরো বেশি ছিল।

আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ১৬ দলকে খেলার সুযোগ দিচ্ছে, এটি অবশ্যই প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে টি-টোয়েন্টি কখনোই ওয়ানডের মতো উত্তেজনা তৈরি করতে পারবে না। ক্রিকেটকে জনপ্রিয় করতে টি২০ এর মাধ্যমে অনেক দেশেই এন্ট্রি নিতে হবে, তবু ওয়ানডে বিশ্বকাপকে টি২০ এর মতো ২ পর্বে করা যায় কিনা, আইসিসি তা ভাবতে পারে। ভেবেছেও বলা যায়, ৮ দল সরাসরি খেলেছে, বাকি ২টি পজিশনের জন্য কোয়ালিফাইং রাউন্ডে খেলে আসতে হয়েছে।

এই কোয়ালিফাইং রাউন্ডটা বিশ্বকাপের অন্তর্ভুক্ত করলেই হিসাবটা সুন্দর হয়। ফ্র‍্যাঞ্চাইজি লিগ ক্রিকেটারদের জন্য লাভজনক হলেও দর্শক আর আইসিসির জন্য চূড়ান্ত বিচারে ক্ষতিকর। ক্রিকেটার নিজেকে এখন ফ্রি মার্কেট ইকোনমিক্সের অংশ মনে করে বোর্ড আর ফ্র‍্যাঞ্চাইজের মধ্যে যার কাছ থেকে বেশি টাকা পাবে তার হয়ে খেলবে, এবং এক্ষেত্রে আইসিসিরও কিছু করার নেই আদতে। বিগ ব্যাশ বা আইপিএলে এমন কিছু ক্রিকেটার পাবেন যারা জাতীয় দলে এখনো সুযোগ পায়নি, কিন্তু টি-টোয়েন্টি লিগে জনপ্রিয় মুখ।

নিচের টায়ারে ( র‍্যাংকিংয়ে ৯ থেকে ১৬) থাকা দলগুলোকে উপরের টায়ারের ‘এ’ বা ‘বি’ দলের বিপক্ষে খেলিয়ে হলেও তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া উচিত। সাউথ আফ্রিকা আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট থেকে ক্রমাণ্বয়ে হয়তোবা হারিয়ে যাবে, কিন্তু পাকিস্তান, শ্রীলংকার মতো দলগুলো আরেকটু প্রতিযোগিতা দেখাতে পারলেও ক্রিকেট ইন্টারেস্টিং থাকবে। বাংলাদেশ আজীবনের মিডিওকর দল, তাদের প্রতি বিশেষ প্রত্যাশা নেই।

  • উপলব্ধি ৫

প্রত্যেক বিশ্বকাপেই নতুন কিছু তারকার জন্ম হয়। এবারের বিশ্বকাপে যারা শীর্ষ পারফরমার, তারা ইতিমধ্যেই পরিচিতি পাওয়া। পাকিস্তানের শাহীন আফ্রিদি, অস্ট্রেলিয়ার অ্যালেক্স ক্যারি, ওয়েস্ট ইন্ডিজের নিকোলাস পুরান আর শ্রীলংকার অভিষ্কা ফার্নান্দো ব্যতীত কাউকে পেলাম না যাকে আগামী দিনের তারকা বলা যায়। এটাও সুসংবাদ নয়। দলগুলোর পাইপলাইনের অবস্থা সন্তোষজনক নয়, এটাই ইঙ্গিত বহন করে।

  • উপলব্ধি ৬

ইংল্যান্ডের কন্ডিশনে স্পিনাররা সুবিধা করতে পারবে না অনুমিতই ছিল, বিশ্বকাপের সেরা একাদশেও কোনো জেনুইন স্পিনার রাখছে না কেউ। নাথান লায়ন টেস্টে যতটা কার্যকর, ওয়ানডেতে বিমর্ষ; ভারতের চাহাল আর কুলদীপকে ঘিরে যেরকম প্রত্যাশা ছিল আউটপুট সে তুলনায় যথেষ্ট কম; ইমরান তাহির, আদিল রশিদ, জাম্পা, রশিদ খান কেউই তেমন ইমপ্যাক্ট রাখতে পারেনি।

অথচ ২০ বছর আগে এই ইংল্যান্ডের মাটিতেই অস্ট্রেলিয়াকে চ্যাম্পিয়ন বানাতে অবদান রেখেছিল শেন ওয়ার্ন নামের এক লেগি! আমরা ওয়ার্ন, সাকলাইন মুশতাক, মুরালিধরনদের দেখে বড়ো হয়েছি, যৌবনে আজমলকেও দেখেছি ( যদিও তার একশন প্রশ্নবিদ্ধ), কিন্তু বিগত ১০ বছরে মনে দাগ কাটার মতো কোনো স্পিনার দেখলাম না। রশিদ খান, মুজিব কে নিয়ে আশাবাদী ছিলাম, তারাও কন্ডিশন নির্ভর বোলার। স্পিনার মানেই ছক্কা মারার সম্ভাবনা বেশি, এটাই কি স্পিনারদের হারিয়ে যাওয়ার প্রধান নিয়ামক?

  • উপলব্ধি ৭

২০২৩ বিশ্বকাপে শিরোপার সবচাইতে বড়ো দাবিদার হতে পারে শ্রীলঙ্কা। মাঠে তারা পারফর্ম করতে পারেনি সেভাবে, কিন্তু তাদের নতুন খেলোয়াড়দের প্রায় প্রত্যেকেই প্রতিশ্রুতিশীল। হাথুরুসিংহকে অব্যাহতি দিয়ে আর করুণারত্নকে সরিয়ে কুশল পেরেরা বা কুশল মেন্ডিসের মধ্যে কাউকে অধিনায়ক করলে মধ্যবর্তী ৪ বছরে এই দল অনেকটাই শেপে চলে আসবে। এটা বাংলাদেশের জন্য সুসংবাদ। বিসিবির মার্কেটিং আর সাংগঠনিক দক্ষতা এতোটাই নিম্নমানের যে তারা অস্ট্রেলিয়া, ভারত বা ইংল্যান্ডের সাথে সিরিজ আয়োজনে সফলভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দেয়, আগামীতেও দিবে।

আমাদের খেলা বলতে জিম্বাবুয়ে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, শ্রীলংকা আর মাঝেমধ্যে নিউজিল্যান্ড। শ্রীলংকা যদি এগিয়ে যায় তাদের সাথে সিরিজ হারের মধ্য দিয়ে হলেও আমরা তখন নিজেদের দুর্বলতাগুলো খুঁজে নিতে পারবো। পাকিস্তানের সাথেও খেলতে পারে চাইলে; হোক সেটা দেশে, কিংবা আবুধাবিতে। আফগানিস্তানও বাংলাদেশের জন্য শক্ত প্রতিপক্ষ হয়ে উঠতে পারে নিকট ভবিষ্যতে। তাদের বেশ দ্রুতগতিসম্পন্ন পেসার আছে, কেবল কয়েকজন প্রোপার ব্যাটসম্যান পেলেই ম্যাচ জয়ের সংখ্যা বাড়বে। যদিও বিশ্বকাপের সবগুলো ম্যাচে হেরেছে, তবু কিছুটা অভিজ্ঞতা থাকলেই ভারত-পাকিস্তান- শ্রীলঙ্কা তিন বিশ্ব চ্যাম্পিয়নকেই হারিয়ে দিতে পারতো।

  • উপলব্ধি ৮

আমরা কৈশোরে শুনতাম, অস্ট্রেলিয়ার রিজার্ভ বেঞ্চে যে পরিমাণে খেলোয়াড় আছে তা দিয়ে আন্তর্জাতিক মানের ৬-৭টা দল তৈরি করা সম্ভব। ২০০৭-০৮ এর আশপাশে তাদের গোল্ডেন জেনারেশনের ক্রিকেটাররা অবসরে চলে যাওয়ার পর নতুন যাদের দেখা যাচ্ছে মানের বিশাল পার্থক্য সাদা চোখেই ধরা পড়ে যাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ায় এমন কোয়ালিটি ক্রিকেটারের সংকট হওয়ার কারণ কী এখনো বোধগম্য হচ্ছে না।

ওয়ার্নার, ফিঞ্চ, স্মিথ, স্টার্ক, ম্যাক্সওয়েল এরা কেউ নতুন ক্রিকেটার নয়। নতুন যাদের দেখলাম তাদের বেশিরভাগই আফগানিস্তান বা বাংলাদেশ দলেও সুযোগ পাবে না হয়তো। বাংলাদেশের নাম নেয়ায় অনলাইনবাসী হা রে রে করে তেড়ে আসতে পারেন, তবে আমি বাংলাদেশকে এখনো আমলে নেয়ার মতো কোনো দল মনে করি না। অস্ট্রেলিয়া কি ক্রিকেটে বিনিয়োগ কমিয়ে দিয়েছে, নাকি নতুন প্রজন্মের তরুণেরা ক্রিকেটের চাইতে অন্য খেলায় আগ্রহী হচ্ছে বেশি, নাকি ৫ বার চ্যাম্পিয়ন হয়ে তাদের মধ্যে আত্মতুষ্টি চলে এসেছে। অস্ট্রেলিয়ার মতো খেলাপাগল জাতি কোয়ালিটি ক্রিকেটার তৈরি কমিয়ে দিলে বুঝতে হবে কোথাও কোনো গোলমাল হয়েছে।

  • উপলব্ধি ৯

বিশ্বকাপের পরে প্রতিটি দলই নতুন করে কর্মপরিকল্পনা সাজাবে৷ আগামী আসরে কারা খেলতে পারবে না সে ব্যাপারে এখনই চিন্তা করে তাদের রিপ্লেস করার রোডম্যাপ তৈরি করবে। পক্ষান্তরে বাংলাদেশ কী করবে? আগামী বছর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, তাই ওয়ানডে আর টেস্ট খেলা কমিয়ে এনে বা পারতপক্ষে বাদ দিয়ে নির্বিচারে টি-টোয়েন্টি খেলে যাবে।

তাতে কি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে আমরা ফাটিয়ে দিবো? আমরা কোয়ালিফাইং পার করে মূল পর্বে উঠে ১-২টা ম্যাচ জিতে হৃদয় জিতে বাড়ি ফিরে আসবো। অন্যদিকে বাকি দলগুলো কী করবে? তারা এখন থেকে যে সিরিজগুলো খেলবে সেখানে টেস্ট-ওয়ানডের সাথে ২ বা ৩ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলবে, এবং তাদের মধ্যে কোনো দলই চ্যাম্পিয়ন বা রানার আপ হবে।

আমরা আম্পায়ারের দোষ, আইসিসির ষড়যন্ত্র, ভারতের আধিপত্য নিয়ে গা-চুলকানো আর স্বমেহন শেষে ঘুমিয়ে পড়বো। জাতিগতভাবে আমরা সওদাগর কিংবা দোকানদার স্বভাবের; ৫ টাকায় মাল কিনে ৭ টাকায় বিক্রি করে ২ টাকা প্রফিট রাখো, তুমিই সমাজের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। এই জনগোষ্ঠীর দূরদর্শী চিন্তা বা অর্গানাইজড স্ট্র‍্যাটেজি ঠিক করার সামর্থ্যই নেই, ইচ্ছা তো পরের ব্যাপার। ক্রিকেট এই ধারার বাইরে যাবে কোন ভরসায়!

  • উপলব্ধি ১০

আমি আমার ক্রিকেট পর্যবেক্ষণ জীবনে বিরাট কোহলির মতো মেন্টালি টাফ এবং চ্যালেঞ্জিং এটিচুডের কোনো ব্যাটসমান দেখিনি, তার কনসিসিটেন্সি অবিশ্বাস্য পর্যায়ের। এবারের বিশ্বকাপটা ছিল তার ক্যারিয়ারের পিক টাইমে, তার সুযোগ ছিল ২০০৩ এর টেন্ডুলকার হওয়ার। সে হয়তোবা ২০২৩ বিশ্বকাপেও অংশগ্রহণ করবে, কিন্তু তখন ক্যারিয়ারের শেষপ্রান্ত প্রায়, এখনকার মতো রিফ্লেক্স-ফিটনেস অনুমিতভাবেই থাকবে না। তাই কোহলির জন্য আক্ষেপ বাড়লো। সে খারাপ পারফর্ম করেনি, কিন্তু বিশ্বকাপের সেরা একাদশে কি তার জায়গা মিলবে? অতি ভারত সমর্থকও তাকে জায়গা দিতে গিয়ে হতাশ হয়ে যাবে।

বিশ্বকাপ গ্রেটদের তালিকাতেও তার স্থান মিলবে না, তার মানের একজন ব্যাটসম্যানের জন্য এটা বিরল ব্যর্থতা। ৯ ম্যাচে একটিও সেঞ্চুরি নেই, এর কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছি না আসলে। টেন্ডুলকারের গ্রেটনেস যেমন টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরি কম থাকা আর একটিও ট্রিপল সেঞ্চুরি না থাকাতে এসে প্রশ্নবিদ্ধ হয়, ভবিষ্যতে কোহলির গ্রেটনেসও বিশ্বকাপ প্রশ্নে বড়োসড়োভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হবে। গত ৪ বছরের অতিমানবীয় পারফরম্যান্স সে বিশ্বকাপে টেনে আনতে পারলো না এটা এক রহস্য হয়ে রইলো। জস বাটলারও হতাশ করেছে যথেষ্ট পরিমাণে।

ডি ভিলিয়ার্সের অবসরের পর বাটলারই সেই ক্যারিশমাটিক ঘরানার একমাত্র প্রতিনিধি বর্তমান ক্রিকেটে। কিন্তু পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটি বাদে বাটলারের কাছ থেকে প্রতাশিত সার্ভিস পাইনি। ফাইনালে তার ইনিংসটি ইফেক্টিভ ছিল, কিন্তু যে মুহূর্তে সে আউট হয়েছে ইংল্যান্ডের পয়েন্ট অব ভিউতে এটা অমার্জনীয় কাণ্ড। বিশ্বকাপে প্রচণ্ড প্রত্যাশা ছিল বাংলাদেশের সৌম্য সরকারকে নিয়ে। বড়ো মঞ্চে বাংলাদেশের ওপেনাররাও যে বোলারকে শাসন করতে পারে তা দেখানোর জন্য সৌম্যের চাইতে বেটার অপশন বাংলাদেশের ইতিহাসেই কেউ নেই।

কিন্তু সে প্রমাণ করলো, আদতে তার কলিজা পুঁটি মাছের সমান। তামিম, মাহমুদউল্লাহ, মুশফিকদের জেনারেশন বিদায় নিলে যখন আফিফ, ইয়াসিরদের সাহসী জেনারেশন দলে জায়গা করে নিবে তখন দলের ব্যাটসম্যান বা বোলারদের কলিজার আকারও বৃদ্ধি পাবে; সৌম্য-লিটন বা অন্য কোনো ওপেনার সেই চাওয়া তখন পূরণ করবেই। তবে বাংলাদেশের ক্রিকেটে যে নোংরা রাজনীতি চলে সেই চক্রব্যূহ ভেদ করে বড়ো কলিজার ক্রিকেটার আদৌ কোনোদিন পাবো কিনা সন্দিহান।

তবে আমাকে নিদারুণ মুগ্ধ করেছে বেন স্টোকস। ২০১৭ তে সাকিব তাকে আউট করে স্যালুট দেয়ার পর থেকেই তাকে পর্যবেক্ষণে রেখেছিলাম। প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই তিন ডিপার্টমেন্টের কোনো একটা দিয়ে মাঠে নিজের সরব উপস্থিতি সে জানান দিয়েছে। পরিসংখ্যান হয়তোবা তার ক্যালিবারের যথার্থ প্রমাণ দিতে পারবে না, তবু বিগত ২৪ বছরে সে আমার দেখা সবচাইতে কমপ্লিট এবং হাংরি ওয়ানডে ক্রিকেটার।

  • উপলব্ধি ১১

সাকিব আল হাসান ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট না হওয়ায় বহু মানুষের ক্ষোভ চোখে পড়লো। হিউম্যান বিহেভিয়ার বোঝার ক্ষেত্রে সাকিব একটি ইন্টারেস্টিং কেইস স্টাডি হতে পারে। একেকটা ম্যাচ হয় আর মানুষ প্রার্থনা করে রোহিত, ওয়ার্নার যেন রান না পায়, স্টার্ক উইকেটশূন্য থাকে, তাতে সাকিবের ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট হওয়াটা সুগম হবে। নেপোটিজম আর ব্যক্তিস্বার্থ যে মানুষকে আত্মশুদ্ধিতে পৌঁছুতে দেয় না, যথেষ্ট সেনসিবল হওয়া সত্ত্বেও মানুষ জঙ্গি মনোভাব দেখায় সাকিবের এক্সপেরিমেন্টটা এক্ষেত্রে আজীবনের উদাহরণ হয়ে থাকবে।

ক্রিকেট যতই ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের প্লাটফরম হোক, আদতে এটি দলীয় খেলা, এবং রেজাল্টই শেষ কথা। গতকাল স্টোকস ফিফটি করার পরও সেলিব্রেশন করেনি তেমন একটা, কমেন্ট্রিতে নাসের হুসেইন বলছিলো এই ফিফটির কোনো মূল্যই নেয় যদি ম্যাচ জেতাতে না পারে, এজন্যই সেলিব্রেশন তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ না। ফুটবল আমি একেবারেই দেখি না, তবু এটা জানি বিশ্বকাপে একজন গোল্ডেন বুট আর একজন গোল্ডেন বল পুরস্কার পায়। গোল্ডেন বল এর ভিত্তি কী?

ধরা যাক, আফগানিস্তানের মোহাম্মদ নবী ব্যাটিংয়ে ৫০০ রান আর বোলিংয়ে ২০ উইকেট পেয়েছে; তাতে কি আপনারা তাকে ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট পুরস্কার দেয়ার দাবি তুলবেন? তার দল তো একটা ম্যাচেও জিতেনি। সাকিব যদি আরো ২০০ রান আর ৭ উইকেট বেশি করতো/পেতো, তাতেই বা কী; দল হিসেবে বাংলাদেশ ১০ এর মধ্যে ৮ম হয়েছে। সাকিবের ইমপ্যাক্ট কী আদতে? ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান সমৃদ্ধি আর ওয়ানডেতে গ্রেট অলরাউন্ডারেএ স্বীকৃতি আদায়; এটাই কি যথেষ্ট নয়? কোন যুক্তিতে বা মানদণ্ডে তাকে প্লেয়ার অব দ্য টুর্নামেন্টের পুরস্কার দিবে? বিশ্বকাপের ১২ আসরে সেমিতে জায়গা পায়নি এমন কোনো দলের ক্রিকেটার কি কখনো এই পুরস্কার পেয়েছে? অনেকে বলছেন জো রুট বেশি দাবিদার ছিল উইলিয়ামসনের তুলনায়।

ইংল্যান্ড যে চ্যাম্পিয়ন হলো, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচ বাদে আর কোনটাতে রুট বড়ো ইমপ্যাক্ট রেখেছে? পক্ষান্তরে, বাংলাদেশের খেলা বাদেও যারা অন্য ম্যাচগুলো দেখেছেন তারামাত্রই জানেন, উইলিয়ামসন বোলিং রোটেশন আর ফিল্ড প্লেসিং দিয়ে ম্যাচের পরে ম্যাচ কেমন ইমপ্যাক্ট তৈরি করেছে, দলের ব্যাটিং একা বহন করেছে। সে একা ৫৫০+ রান করেছে, তার দলের ২য় কোনো ব্যাটসম্যান ৩০০ রানও করেনি, দলের মোট রানে তার কন্ট্রিবিউশন পারসেন্টেজ হিসাব করুন; সেই দল নিয়ে সে ফাইনাল খেলেছে। এমন একজন প্লেয়ার অব দ্য টুর্নামেন্ট না হয়ে ৮ম হওয়া দলের কেউ পুরস্কার পেলে সেটা ক্রিকেট না হয়ে কমেডি হয়ে যেত। আমরা ক্ষুদ্র ব্যক্তিচিন্তার বাইরে বের হতে পারি না, এজন্য আমরা মিডিওক্রিটি থেকে মুক্তিও পাই না। দোষারোপ যদি করতেই চান মাশরাফি, তামিম আর স্টিভ রোডসকে করুন, আইসিসিকে নয়।

খাসলত বদলান, আগে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার এটিচুড রপ্ত করুন, দোষাদোষি খেলা ফাঁকিবাজ কেরানির বৈশিষ্ট্য, চেঞ্জমেকারের নয়। চলতে-ফিরতে এতো বেশি কেরানির সাথে ঠোকর খেতে হয় যে কেরানিমুক্ত পৃথিবী চেয়ে ঈশ্বরের কাছে আবেদন করতে মন চায়; পরক্ষণেই ভাবি আবেদন-টাবেদনে লাভ নেই, কেরানির ক্ষমতা রাষ্ট্রযন্ত্রের চাইতেও বেশি।

সুতরাং চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সাধ নিয়েই অবিরত ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, আইসিসিকে গালাগাল দিয়ে জিম্বাবুয়ে আর আয়ারল্যান্ডকে ডেকে এনে টুর্নামেন্ট আয়োজন করুন এবং হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে বিজয়ী হয়ে আইসিসির পেজে গিয়ে দলবেঁধে লিখুন ‘উই আর কামিং’ এবং তারপর কিছু সাংবাদিক যখন ক্রমাগত মেহেদি মিরাজের ইন্টারভিউ ছেপে ছেপে তাকে কাল্ট ফিগার বানিয়ে ফেলবে, তখন তাকে নবম বীরশ্রেষ্ঠ খেতাব দিয়ে ভারতের কাছে ৩ রানে ম্যাচ হারার যন্ত্রণা সইতে না পেরে হার্ট অ্যাটাক করে পরপারে পাড়ি জমান। জাতি আপনাকে স্মরণ করবে না, শহীদের মর্যাদাও দিবে না, বড়োজোর দুই লাইন ফেসবুক স্ট্যাটাস দিবে।

আপনি খুশি তো?

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।