বানোয়াট আবেগের ব্যবসা বন্ধ হোক!

হঠাৎ ফেসবুকে মড়ক লেগে গেলো।

কোন এক বিসিএস কর্মকর্তা ম্যাজিস্ট্রেট তার ম্যাজিস্ট্রেট বউয়ের কথায় মাকে স্টেশনে ফেলে রেখে এসেছে। কেবল রেখে আসেনি, একখানা ‘ইতি তোমার খোকা’ টাইপের আবেগী চিঠিও মায়ের ব্যাগে রেখে এসেছে। জনৈক ব্যারিস্টারের স্ট্যাটাস প্রথমে শেয়ার করে ‘Legal & Law’ নামের একটা পেইজ, তারপর অখ্যাত কিছু পোর্টাল, এর পর কালের কণ্ঠ আর যুগান্তের মতো পত্রিকা। তারপর ইতিহাস। বাঙালির মাতৃপ্রেম বঙ্গোপসাগর সাগরের জোয়ারের মতো জেগে উঠল। ফেসবুকে আলোচনার ঝর উঠল, শেয়ারে শেয়ারে টাইমলাইন ভরে গেলো।

পরে দেখা গেলো ঘটনাটি বানোয়াট। যে মায়ের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে তাও ভারতীয় একটি পত্রিকা থেকে নেওয়া।

কিন্তু একটা বিষয়ের সামনে-পিছনে যাচাই না করে প্রথম শ্রেণীর পত্রিকাগুলোতে কিভাবে আসে? বাঙালিই কেনোই বা জোয়ার লাগিয়ে তা প্রচার করে?

ইতোমধ্যে সত্য প্রকাশিত হয়েছে। দুএকজন নিউজটি যে মিথ্যা তা প্রমান সহকারে লিখেছেন। কিন্তু ভূয়া সংবাদটি যে প্রচারণা পেয়েছে মাত্র একদিনের ব্যবধানে সত্যটি ততটা হালে পানি পাচ্ছে না। কেন?

আমার ধারণা, এই লেখা লাইক, কমেন্ট পাবে না। কারণ এটি স্টাবলিশমেন্টকে আঘাত করে না, ভেতো বাঙালির আবেগ ধরে টান মারে না। উল্টো ভূয়া নিউজ সমর্থন করে কিছু লিখলে সবাই তাদের বিশাল মাতৃ প্রেম দেখিয়ে যেতো। শুনতে খারাপ লাগলেও, জাতি হিসেবে আমরা প্রচন্ড স্টাবলিশমেন্ট বিরোধী, পরশ্রীকাতর। প্রতিষ্ঠিত যে কোন কিছুই আমরা গুড়িয়ে মাটিতে নামিয়ে আনতে চাই। যেহেতু সংবাদটি একজন বিসিএস কর্মকর্তা সম্পর্কিত। অতএব, তাকে মাটিতে নামিয়ে আনতে আমরা জিহাদি জোশ পাই। যিনি নিজের মায়ের খোজ রাখে না, তিনিও আবেগের তাড়নায় অন্যের মায়ের মিথ্যা সংবাদ শেয়ার করেন। ‘মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেস্ত’ বানীখানা আমরা যেমন জান-পরান দিয়ে বিশ্বাস করি, তেমনি জান-পরান দিয়ে নিজের মাকে অবহেলা করি। এমনই আবেগী দ্বিচারিতা।

এই প্রজন্মে সোস্যাল মিডিয়া যারা চড়িয়ে বেড়ায় তাদের অধিকাংশই স্বাভাবিক সামাজিক সম্পর্ক স্থাপন করতে অসমর্থ। আমার ভয় হচ্ছে, হয়ত আমাদের অগোচরেই একটি মানসিক প্রতিবন্ধী প্রজন্ম গড়ে উঠছে। এরা স্বাভাবিক সামাজিক সম্পর্ক বলতে ফেসবুক বোঝে, ধর্মকর্ম বলতে ফেসবুকে ধর্মের প্রচার ও প্রচারণা বোঝে। এরা ধর্ষণের কারন হিসেবে নারীর পোশাককে দায়ী মনে করে। সেই চিন্তা আবার ফেসবুকেই প্রচার করে।

তাদের হাতিয়ার কেবল হস্তমৈথুন আর ফেসবুক। কেননা দুটোতেই সত্যিকারের বাস্তবতা ও সামাজিক প্রতিঘাত এড়িয়ে নিজেকে তুষ্ট করা যায়। তাই বাঙালির মাতৃপ্রেম, বিপ্লব, ধর্ম প্রতিপালন ও প্রচার ফেসবুকে এসে ঠেকেছে।

অতএব, ভূয়া খবর এভাবে ছড়াতেই থাকবে।

পত্রিকাগুলোও এই আবেগকে পুঁজি করে ভূয়া সংবাদ ছাপাতে থাকবে।

– নাজমুল ইসলাম রাজুর ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।