৭১-এর গুলির দাগ এখনো আছে লেভিনের পায়ে

বছর খানেক আগের কথা। তখন ডিসেম্বর মাস। টরেন্টো ফিল্ম ফেস্টিভালের সময়। বাঙালি অধ্যূষিত ডেনফোর্থ সংলগ্ন ৯ ডজ রোডের রয়্যাল কানাডিয়ান লিজিয়ন হল| টরেন্টো ফিল্ম ফোরামের আয়োজনে চলছিল নৈশভোজ। বরফ পড়া হিমশীতল এক রাত।

এরই মধ্যে প্রবাসী বাংলাদেশি, নয় বছরের এক বাচ্চা মেয়ে প্রশ্ন করে বসলো এক প্রবীন চলচ্চিত্র পরিচালককে, ‘পাকিস্তানের লোকরা কি জানতো যে, আপনি বাংলাদেশের পক্ষে কাজ করছিলেন? ওরা তো নির্বিচারে বাংলাদেশের মানুষ মেরে ফেলছিল, চাইলে আপনাকেও মেরে ফেলতে পারতো…’

প্রবীন ভদ্রলোকটি যেন একটু চমকে গেলেন। চোখ দেখে স্পষ্ট বোঝা গেল তিনি ফিরে গেছেন ঠিক সেই ১৯৭১ সালে। একটু থেমে বললেন, ‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই! ওরা আমাকে মেরে ফেলতে পারত। তারা মানুষ মারছিল কোনো বাছবিচার না করে। কিন্তু তারাও হয়তো দ্বিধান্বিত ছিল। আমি আমেরিকান, আমার দেশ পাকিস্তানকে অস্ত্র দিচ্ছে, সেই অস্ত্র দিয়ে তারা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ মারছে। আমি একজন আমেরিকান সেই সব বীভৎসতার চিত্র ধরে রাখার চেষ্টা করছি।’

পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী টের পেয়ে যায়, বুঝতে পারে এই লোকটি বেঁচে থাকলে তাদের এই হত্যাযজ্ঞ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই, হামলা চালানো হল। টরেন্টোর সেই রাতেই ওই শিশুর কানে কানে তিনি বলেছিলেন, ‘রাতের অন্ধকারে আমাদের ওপর গুলিও হয়েছিল। আমার পায়ে লেগেছে সেই গুলি। তোমাকে কানে কানে বলি, আমার স্ত্রী ঘটনাটা এখনও জানে না, আমার পায়ে কিন্তু এখনো গুলির দাগ আছে।’

হ্যা, এখনো ৭১-এর গুলির দাগ পায়ে নিয়ে ঘুরছেন লেয়ার লেভিন। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন বাংলাদেশে। ‘বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা’ নামে একটি দলের দলের সদস্য হয় বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ান।

দলটির সাথে তিনি যান শরণার্থীদের ক্যাম্পে, যান মুকাঞ্চলে। সাথে সাথে মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের দেশাত্মবোধক ও সংগ্রামী গান শুনিয়ে, পুতুল নাচ দেখিয়ে উজ্জীবিত করতেন।

শুধু তাই নয়, এই শিল্পীদের সঙ্গে থেকে লেভিন প্রায় ২০ ঘণ্টার ফুটেজ সংগ্রহ করেন এই সিনেম্যাটোগ্রাফার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা। বিরল সেই ফুটেজ থেকে পরবর্তীতে চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ ‘মুক্তির গান’ নামে প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করেন।

প্রামাণ্যচিত্রটি মুক্তি পায় ১৯৯৫ সালে। ১৯তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ প্রামাণ্যচিত্রের পুরস্কার পেয়ে যায় মুক্তির গান।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।