৩০০ রুপির স্টেজ শো থেকে তারাদের মিছিলে

একজন অভিনেতার সার্থকতা কিসে? কোন ধরনের চরিত্রে? আজ এমন একজন অভিনেতাকে নিয়ে লিখব যিনি ভালো কিংবা নেতিবাচক – সব ধরনের চরিত্রেই সফলতা দেখিয়েছেন। তিনি আর কেউ নন, প্রকাশ রাজ।

১৯৬৫ সালের ২৬ মার্চ কর্ণাটকে এক নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেন আজকের এই মহান অভিনেতা। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মানো কিংবা ফিল্মি ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসা এই সুবিধাগুলো তার ছিল না।।

ফিল্ম ইন্ড্রাস্টিতেও তিনি হুট করে ঢুকে জাননি। অনেক পথ তাকে পেরোতে হয়েছে। ক্যারিয়ারের শুরুতে মাসিক মাত্র ৩০০ রুপি বেতনে স্টেজ শো করতেন। এছাড়াও কিছু কন্নড়/তুলু সিরিয়ালে কাজ করেন। তার বাবা তুলু ভাষার এবং মা কান্নাড়া ভাষার হওয়ায় দুটো ভাষায়ই তার আয়ত্তে ছিল। এছাড়া তার ভাইও একজন অভিনেতা।

আজকে যে প্রকাশ রাজকে আমরা চিনি তার আসল নাম কিন্তু প্রকাশ রাজ না। জন্মসূত্রে পরীবারের পদবীনুসারে তার নাম রাখা হয় প্রকাশ রাই। কিন্তু তামিলের অন্যতম সেরা ডিরেক্টর মনি রত্নাম তার নাম দেন প্রকাশ রাজ। ১৯৯৪ সালে মনি রত্নামের ‘ডুয়েট’ মুভির মাধ্যমে তিনি তার ফিল্ম ক্যারিয়ার শুরু করেন।

তারপর একে একে অন্যান্য ইন্ড্রাস্টিতেও নিয়মিত হন। হিন্দিতে অভিষেক আগে হলেও ২০০৯ সালে হিন্দি ওয়ান্টেড মুভির মাধ্যমে হিন্দিতে নিজেকে একজন ভিলেন হিসেবে গড়ে তোলেন। তারপর একে একে সিংঘাম, দাবাং ২ এর মত বড় বড় বলিউড মুভিতে ভিলেনের চরিত্রে অভিনয় করেন।

প্রথমে তাকে আমি নেতিবাচক চরিত্রেই দেখি। ভিলেন রোলে যে তিনি ভারতের অন্যতম সেরা ভিলেন। বলিউডে তার পরিচিতি মূলত ভিলেন হিসেবেই। তামিল, তেলুগু অনেক মুভিতেও তিনি ভিলেন চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তার ভিলেন্সি দেখে বোঝার উপায় নেই যে ইনি পজেটিভ চরিত্রও করতে পারেন। মনে হয় তার জন্মই হয়েছে ভিলেন্সির জন্য।

বলা হয়ে থাকে প্রত্যেক মানুষের ভিতরে ভালো এবং খারাপ দুটো প্রবৃত্তিই থাকে। কিন্তু তার ভিলেন্সিতে তিনি এতটাই দারুণ যে তার মধ্যে যে ভালো প্রবৃত্তি আছে তা বোঝা যায় না। মাফিয়া ডন হিসেবে কিংবা লোকাল গুন্ডা হিসেবে, জাঁদরেল ভিলেন হিসেবে কিংবা পাগলাটে ভিলেন হিসেবে, কমিক ভিলেন কিংবা সিরিয়াস ভিলেন-যেকোনো ধরনের ভিলেন্সতেই তিনি পারফেক্ট।

ভিলেন হিসেবে তিনি বলিউডেও অনেক সুনাম কুড়িয়েছেন। টেম্পারে তার করা ভিলেন রোল আর ব্যক্তিগতভাবে আমার অনেক প্রিয়। এছাড়াও রবি তেজার ‘ডেভুডু চেসিনা মানুসুলু’ এ তার করা আলাভোলা ভিলেন চরত্রেও তিনি অসাধারন ছিলেন। ‘বৃন্দাভানাম’ এ একসাথে একজন বাবা, ভাই, দায়িত্ববান ছেলে ও একজন গ্রামপ্রধানের চরিত্রে ছিলেন।

শুধু কি ভিলেন? না। সব ধরনের ক্যারেক্টারেই তিনি পারফেক্ট। পারুগুতে নায়িকার বাবা হিসেবে কি অভিনয়টাই না করলেন তিনি। সহ অভিনেতা হিসেবে অনেক মুভিতে তিনি অভিনয় করেছেন। রেস গুররামে শ্রুতির বাবার চরিত্রে তাকে কার না ভালো লেগেছে। কমেডিতেও যে তিনি ওস্তাদ তা তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন। ওপিরিতে একজন ভালো বন্ধু হিসেবে কিংবা পাওয়ারে পুলিশের চরিতে।

বালুপুতে তার চরিত্রটা সবার কাছে সমাদৃত। একই মুভিতে একজন দায়িত্ববান বাবা আর একজন মাফিয়া চরিত্রে অভিনয় করা চাট্টিখানি কথা নয়। আন্নিয়ানে পুলিশ চরিতে তিনি ছিলেন অনবদ্য। ডুকুডুতে মহেশের বাবার চরিত্রেও তিনি ছিলেন দারুন। তবে তার একটা চরিত্র আমার মন ছুঁয়ে গেছে আর তা হলো কোটিগোব্বা ২ এ সুদীপের বাবার চরিত্র।

মাত্র অল্প কিছুক্ষনের স্ক্রিন প্রেজেন্সে প্রকাশ রাজ আমাকে কাঁদিয়েছে। তার ইমাশোনাল অভিনয়ে চোখে পানি আসেনি এমন লোক কমই পাওয়া যাবে। সিরিয়াস, ভিলেন, কমিক, সাধারণ, বাবা, দাদা, ভাই সবধরণের চরিত্রেই তিনি নিখুঁতভাবে অভিনয় করেন। কাধাল সাদুগুদু তে তিনি বিক্রমের শ্বশুরের চরিত্রে অভিনয় করেন যে কিনা তার সমবয়সী।

আচ্ছা সেটা বাদ দেই, সিতাম্মা ভাকিটলো শ্রীমাল্লে ছেট্টু তে তিনি ভেনক্টেশ এর বাবার চরিত্রে অভিনয় করেন যে কিনা তারও চার বছরের বড়। গোভিন্দুডু আন্দারিভাদেলেতে তিনি রামের দাদার চরিত্রে অভিনয় করেন অথচ তাদের বয়সের পার্থক্য মাত্র ২০ বছর। এতেই বোঝা যায় তিনি সব ধরনের সকল বয়সের চরিত্রে সাবলীলভাবে অভিনয় করতে পারেন।

সিতাম্মা ভাকিটলো শ্রীমাল্লে ছেট্টুতে তার নিরমল হাসি দেখে মুগ্ধ হয় নি এমন লোক খুব কমই আছে। হিস্টোরিকাল রোল তিনি কতটা ভালোভাবে করতে পারেন তা ‘রুদ্রামাদেবী’ তে তার করা মন্ত্রীর ক্যারেক্টার দেখলে বোঝা যায়।

কন্নড় ভাষা তার মাতৃভাষা হওয়া সত্বেও তিনি সাবলীলভাবে তামিল, তেলুগু, হিন্দি, মালায়ালাম বলতে পারেন। তার ঝুলিতে আছে ভারতের জাতীয় পুরস্কার। তাও আবার একবার নয়, পাঁচবার। ২০০৯ এ ‘কাঞ্চিভারাম’ এ তার দুর্দান্ত অভিনয়ের জন্য পান সেরা অভিনেতার জন্য জাতীয় পুরস্কার।

এছাড়াও আরো কয়েকটি বিভাগে তার জাতীয় পুরস্কার আছে। তিনি তামিল ফিল্মফেয়ারও জিতেছেন বেস্ট এক্টর বিভাগে। তবে তার অভিনয় পুরস্কার দিয়ে বিবেচনা করলে তার প্রাপ্তি আরো বেশি হওয়া উচিত ছিল। তাও তার প্রাপ্তি নেহাতই কম নয়। ক্যারিয়ারের শুরুতেই ১৯৯৮ এ মনি রত্নামের ‘ইরুভার’ মুভির জন্য পান জাতীয় পুরস্কার (সহ অভিনেতা বিভাগে)। এছাড়াও তার মনোনয়নও আছে অনেক।

শুধু একজন অভিনেতা হিসেবে নয় একজন মানুষ হিসেবেও তিনি মহান। তিনি একা একটা গোটা গ্রামকে দত্তক নিয়েছে। তেলেংগানার মাহবুবনগর জেলার কোন্ডারেড্ডীপল্লি গ্রামকে তিনি দত্তক নিয়েছেন। এছাড়াও তিনি অনেক সোশাল ওয়ার্ক করেন মিডিয়ার অগোচরে। তাই এই সাহায্যকারী মনোভাবের জন্য তিনি অনেকেরই শ্রদ্ধার পাত্র।

নিজের এই দীর্ঘ সময়ের ক্যারিয়ারেও তাকে অনেক বাধা বিপত্তি পেরোতে হয়েছে। কিছু এক্টর ও ডিরেক্টরের সাথে সমস্যার কারনে তাকে তেলেগুতে ছয়বার ব্যান দেয়া হয়। ‘অংগোলে গীতা’ মুভিতে তার নগ্ন অবতারের জন্য তিনি নিন্দিত হন। তবে তা মূলত চরিত্রের প্রয়োজনেই ছিল। এছাড়াও আরো অনেক বাঁধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল তাকে। তবে সব উপেক্ষা করে তিনি হয়েছেন আজকের এই প্রকাশ রাজ।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।