২৩ টি আদিবাসী ভাষার ভেষজ পল্লী

আমার পাশে যাকে দেখা যাচ্ছে তার নাম রবি খান। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এক অঞ্চলে তাঁর মতো একজন প্রতিভাবান ব্যক্তি লোকচক্ষুর আড়ালে, নীরবে যা করে যাচ্ছেন তা শুনলে আপনার চোখ কপালে উঠে যাবে।

টাঙাইলের মধুপুর বনের দোখলা রেঞ্জের ফেগামারীতে তিনি নিজের একটি স্কুল গড়ে তুলেছেন। তিনি এই স্কুলের নাম দিয়েছেন ‘ভাষাপল্লী’। কেন জানেন? কারণ এখানে ১৬ জন বাচ্চা পড়ালেখা করে যাদের এক একজন এক এক নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। কেউ গারো, কেউ মারমা, কেউ মুরং। মজার ব্যাপার হচ্ছে তাদের প্রত্যেকের ভাষাই উনি জানেন। উনি বাংলাদেশের আদিবাসীদের প্রায় ২৩টি ভাষা জানেন! উনি এসকল বাচ্চাদের তাদের নিজ নিজ ভাষায় পড়ালেখা করান।

ছবিগুলোতে যে গাছের ছবিগুলো দেখছেন তার প্রত্যেকটিই ভেষজ উদ্ভিদ। উনি স্কুলের বাচ্চাদেরকে তাদের নিজেদের ভাষাতে এসকল গাছের সায়েন্টিফিক নাম পর্যন্ত পড়িয়েছেন। এই বাচ্চাদেরকে দিয়ে তিনি এ সকল গাছের চাষ করান। এতে বাচ্চারা এসব ভেষজ গাছ সম্পর্কে একদম হাতে কলমে শিক্ষা পায়। আর এই গাছ বিক্রি করে যা আয় হয় তা দিয়েই স্কুলের খরচ চলে, বাচ্চাদের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। উনি চান যেন বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে থেকেও এসকল বাচ্চারা ছোটবেলা থেকেই স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারে, তাদের আশেপাশের পাহাড়ি এলাকায় যেই ভেষজ উদ্ভিদ পাওয়া যায় তা সম্পর্কে যেন তারা জানতে পারে ছোটবেলা থেকেই এবং সেগুলো চাষ করেই যেন তারা জীবনযাপন করতে পারে। ভাবতে পারেন কি মহান উদ্যোগ এই রবি খান নিয়েছেন?

আরও কিছু মজার তথ্য দেই। এখানের ছেলেমেয়ারা দাঁত মাজার জন্য টুথপেস্ট ব্যবহার করে না, চুলে শ্যাম্পু দেয় না, ত্বকের জন্য ক্রিম ব্যবহার করে না। তারা দাঁত মাজার জন্য ব্যবহার করে নিমের ডাল, রিঠাফল এর সাথে এলোভেরা জেল মিশিয়ে শ্যাম্পু হিসেবে ব্যবহার করে, ত্বকের ক্রিম হিসেবে ব্যবহার করে কাঁচা হলুদ, নিমপাতা, তুলসী, এলোভেরা জেলের মিশ্রণ। আর এগুলো কোথা থেকে আসে? সবই স্কুলের ছেলেমেয়েরা এখানেই চাষ করে! আর হ্যাঁ। এগুলোর গুণগত মান বাজারের রাসায়নিক শ্যাম্পু, টুথপেস্ট, ক্রিমের চেয়ে অনেক উন্নত, সাইড ইফেক্টবিহীন।

উনি স্থানীয় একটি হাই স্কুলের ইংরেজি শিক্ষক। বিশ্বাস করেন! তার ইংরেজি উচ্চারণ শুনে কিছুক্ষণ হা করে তাকিয়ে ছিলাম। মধুপুর বনের ভেতরে এরকম প্রত্যন্ত একটা জায়গায় কেউ এরকম ফ্লুয়েন্ট ইংলিশ বলতে পারেন এবং উচ্চারণ এরকম হতে পারে তা কেউ ভাবতেও পারবে না। উনি সারা জীবন বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে আদিবাসীদের সাথে মিশেছেন, তাদের ভাষা শিখেছেন, দূর্গম এলাকা থেকে এসকল মূল্যবান ভেষজ উদ্ভিদ সংগ্রহ করেছেন। তার এই ভাষাপল্লীতে রয়েছে ৬০০ এর অধিক ভেষজ উদ্ভিদের বিশাল সংগ্রহ। তার ভাষ্যমতে তার এই ভাষাপল্লীতে এমন সব দুর্লভ ভেষজ উদ্ভিদ রয়েছে যা খুঁজতে মানুষের ১০ বছর লেগে যাবে কিন্তু তবু খুঁজে পাবে কিনা সন্দেহ।

এবার কিছু দুঃখের কথা বলি। এই ভাষাপল্লী কিভাবে চলে তা তো আগেই বললাম। তো বুঝতেই পারছেন যে এই স্কুল চালাতে, বাচ্চাদের খরচ চালাতে, চাষাবাদের পেছনে কি পরিমাণ খরচ হয়। রবি খান অনেক কষ্টে সেই খরচ চালিয়ে যাচ্ছেন সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে, নিঃস্বার্থভাবে। নিজের শিক্ষকতার টাকায় আর কতোদিন চালাতে পারবেন জানেন না। অনেকেই সাহায্যের কথা বলেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তেমন কেউ এগিয়ে আসেননি।

উনি জানালেন যে, কেউ যদি শুধুমাত্র তার এলোভেরা গাছের পেছনে এক বছরের জন্য ২.৫০ লক্ষ টাকা ইনভেস্ট করে এক বছরের জন্য তাহলে প্রতি মাসে প্রায় ১ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব শুধুমাত্র এই এলোভেরা গাছ থেকেই। আর বাকি ৬০০ প্রজাতির গাছ তো বাকিই থাকলো!

উনি জানিয়েছেন যে, কেউ যদি এই ভাষাপল্লীতে ইনভেস্ট করতে চান তাহলে শুধুমাত্র তার স্কুলের বাচ্চাদের খরচ চালানোর মতো টাকা রেখে বাকি লাভের অংশ চাইলে সে নিয়ে যেতে পারেন। চিন্তা করতে পারছেন?আমরা সবাই যখন নিজের পকেট ভরার ধান্দায় ব্যস্ত তখন এতো মহান উদ্যোগ নেওয়ার পরেও তিনি ইনভেস্ট এর সময়ও নিজের কথা না ভেবে তিনি ভাবছেন নিজের স্কুলের অসহায় বাচ্চাদের কথা।

বিশ্বাস করেন আমার যদি সামর্থ্য থাকতো, তাহলে আমি নিজে অবশ্যই ইনভেস্ট করতাম। েকিন্তু আমার পক্ষে তা সম্ভব হচ্ছে না।তাই অনলাইনের মাধ্যমে সবার কাছে এই দারুণ উদ্যোগটি প্রচার করার ব্যবস্থা করছি। প্লিজ! আপনার আশেপাশেরর মানুষদের জানান, শেয়ার করুন।

হয়তো আপনি বিনিয়োগ করতে পারছেন না কিন্তু আপনার শেয়ার করার ফলে ইনভেস্ট করতে পারেন এমন কেউ এই উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে পারবেন। কেউ ইনভেস্ট করতে চাইলে আমাকে জানবেন। আমি তাঁর সাথে যোগাযোগের ব্যবস্থা করে দিব।

প্লিজ!আপনারই তো হিরো আলমদের বিখ্যাত করেন। সেই আপনারাই রবি খানের মতো সত্যিকারের হিরোদের বিখ্যাত করুন এবং তাদের উদ্যোগগুলোকে বাঁচিয়ে রাখুন। তাহলে বিশ্বাস করুন দেশ অনেক দূর এগিয়ে যাবে।

ও আচ্ছা। আরেকটি মজার কথা বলা হয়নি। আমরা মধুপুর গিয়েছিলাম ডিপার্টমেন্টের ট্যুরে। সাথে আমাদের স্যারও ছিলেন। আমরা যখন গিয়েছিলাম তখন স্কুল বন্ধ ছিল। বাচ্চাদের সাথে তাই দেখা হয়নি। ফিরে আসার সময় রবি খান বার বার বলছিলেন, ‘বাচ্চাদের সাথে দেখা হলে আপনাদের সত্যি খুব ভালো লাগতো। তারা আপনাদের এই ভাষাপল্লীতেই উৎপাদিত কিছু ভেষজ উদ্ভিদ দিয়ে চা বানিয়ে আপনাদের আপ্যায়ন করতো।’

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।