১৫ রুপির দিনমজুরী থেকে ১৬০০ কোটি রুপির প্রতিষ্ঠান

সব ধরণের লজিক তো বটেই, অনুপ্রেরণার এই গল্পটা হার মানাতে পারে যেকোনো রূপকথার গল্পকেও। গল্পটা ১৬ বছর বয়সী এক বালকের অদম্য ইচ্ছাশক্তির।

বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই সে শুনে এসেছে, মুম্বাই গেলে নাকি ভাগ্য পাল্টে যায়। কিন্তু, এ কী! মু্ম্বাই এসে তো খালি পেটে দাদার রেলস্টেশনে ঘুমাতে হচ্ছে। যদিও, জীবনের আগে ধাপেই যেমন অশান্তি আর দারিদ্র দেখেছে এই ছেলেটা, তাতে এই রেল স্টেশনে ঘুমানোর ব্যাপারটা একেবারেই নস্যি।

পশ্চিম বঙ্গের দুর্গাপুর থেকে এসেছে ছেলেটা। বাবা আর্মিতে ছিলেন। নন কমিশন্ড পদে। ১৯৭১ সালে শরীরে গুলি লেগেছিল, প্যারালাইসড হয়েই বাকিটা জীবন কেটে যায়। বড় ছেলে যা একটু আয় করতো সেও অল্প বয়সে মারা যায়। ছেলের মৃত্যু শোকে তিন মাস পর বাবাও মারা যান।

ছোট ছেলের সহায় তখন কেবলই মা। একই সাথে দায়িত্বও। ১৯৮৯ সালের মে মাসে, ১৬ বছর বয়সী ছেলেটার প্রবল ইচ্ছাশক্তি বাদে আর কোনো সম্বল ছিল না। ১৫ রুপির মজুরী অ্যালুমিনিয়াম কারখানার চাকরী আর ২০ জনের সাথে ছোট একটা ঘরে শোবার বন্দবস্তো করে ফেলে সেই বয়সে।

ছেলেটির নাম সুদীপ দত্ত। মিরা রোডের বাসা থেকে রোজ ৪০ কিলোমিটার হেঁটে জগেশ্বরীর কারখানায় যেত। কারণ, শুধু নিজের পেট চালালেই চলতো না, মায়ের দেখাশোনাও করতে হত ওকে। ছোট ছোট আরো চার ভাই বোন তো আছেই।

দুই বছর পর লোকশানের কারণ দেখিয়ে মালিক কারখানা বন্ধ করে দিল। মালিকের এই সিদ্ধান্তই হয় সুদীপের জীবনের ‘টার্নিং পয়েন্ট’। লোকশানের সাগরে ডুবতে থাকা কারখানাটা নিজের জমানো টাকায় খুব অল্প দামেই কিনে ফেলেন তিনি। নিজের সঞ্চয় আর বন্ধুদের কাছ থেকে ধার করে ১৬ হাজার রুপি বিনিয়োগ করেন কারখানায়।

মাত্র ১৯ বছর বয়সেই নিজের পরিবার তো বটেই, কার্যত ওই কারখানায় কাজ করা সাত দিনমজুরের সাতটি পরিবারের দায়িত্ব নিয়ে নেন সুদীপ। ১৬ হাজার রুপির ওই বিনিয়োগটা যথেষ্ট ছিল না। অ্যালুমিনিয়াম প্যাকেজিং ইন্ড্রাস্টির দুর্দিন চলছিল ওই সময়। ওই সময় শুধু জিন্দাল অ্যালুমিনিয়ামের মত বড় প্রতিষ্ঠানগুলোই লাভ করতে পারতো।

সুদীপ বুঝতে পেরেছিল টিকে থাকতে হলে তাকে নতুন কিছু করতে হবে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে লড়াই করা সহজ ছিল না। ভিন্ন ধরণের ব্যবসায়ী বুদ্ধি নিয়ে আসে। দাম একই হলেও, গুণগত মানে এগিয়ে ছিল সুদীপের প্রতিষ্ঠান। প্রথমে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে ব্যবসা করে টিকে থাকার কাজ চলছিল। একই সাথে ক্রমাগত বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর দরজায় কড়া নাড়া চলছিল।

প্রতিষ্ঠানগুলোর বিজনেস হেডদের সাথে দেখা করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হতো। সুদীপের আলাপ করতে পারার ক্ষমতা ছিল দারুণ। তাতেই তিনি বাজিমাৎ করেন। আস্তে আস্তে সান ফার্মা, কিপলা, নেসলের মত প্রতিষ্ঠান থেকে ছোট ছোট কাজ বের করে আনেন।

তখন আস্তে আস্তে ব্যবসায় স্বচ্ছলতা আসে। এখানেই সুদীপ থেমে থাকেননি। নিজের গবেষণা চালিয়ে যেতে থাকেন। ভাবতে থাকেন, আর নতুন কী করা যায়। বিজনেস টাইকুন অনিল আগরওয়াল তখন ‘ইন্ডিয়া ফয়েল’ কিনে নেন। আগরওয়াল ও তার ভ্যাডান্টা গ্রুপ বিশ্বের অন্যতম বড় কোম্পানি গুলোর একটি ছিল।

কিন্তু, কোনো ভাবেই ওরা সুদীপকে টেক্কা দিতে পারছিল না। এক সময় ইন্ডিয়াল ফয়েলকেই সুদীপের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার চিন্তা করে। সেই ডিলের মধ্য দিয়ে ভ্যাডান্টা গ্রুপ বিদায় নেয় ভারতীয় বানিজ্য থেকে।

এখান থেকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি সুদীপকে। ১৯৯৮ থেকে ২০০০ – মাত্র এই দু’বছর সময়ে ইন্ডিয়ান অ্যালুমিনিয়াম কোম্পানির ডিস্ট্রিবিউটর বনে যান সুদীপ। বাজারে ওই সময় তার গুরুত্ব বাড়ে। মুম্বাই ও ভারতের জাতীয় স্টক এক্সচেঞ্জে প্রবেশ করে সুদীপের প্রতিষ্ঠান। ওই সময় প্রতিষ্ঠানটির নাম তিনি দেন – ‘নায়ায়ন মুর্তি অব প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রি’। এখন তার প্রতিষ্ঠানের নাম ইএসএস ডি অ্যালুমিনিয়াম লিমিটেড।

এখন ভারতের সবগুলো বড় প্রতিষ্ঠানের সাথে ব্যবসা করেন সুদীপ। কোম্পানির মূল্য এখন ১৬০০.৭৯ কোটি রুপি। আন্ধেরিতে অভিজাত জীবন যাপন করেন। ছেলে মেয়েদের সিঙ্গাপুরের স্কুলে পড়াশোন করতে পাঠিয়েছেন। কান্ডভিলিতে তার সুরম্য অফিস ভবন। প্রথম চাকরীতে যে ঘরটায় আরো ২০ জনকে নিয়ে ঘুমাতে হত সুদীপকে, এখনকার অফিসে সুদীপের বসার ঘরটা বড়। সফলতা আসলেও নিজের অতিততে তিনি ভুলে যাননি। এখনো কারখানার শ্রমিকদের তিনি আপনজন। সবাই এখনো ডাকে ‘দাদা’ বলে।

তিনি বলেন, ‘বিপর্যয় মানুষকে শক্ত করে, সাফল্যের জন্য আরো দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করে। এই বিপর্যয় নিয়েই তাই কাজ চালিয়ে যাও।’ এটাই সুদীপের জীবন থেকে নেওয়া গল্প।

গল্পের ছোট একটা অংশ বাকি – তরুণ উদ্যোক্তা, বিশেষ করে যারা দুর্বল অর্থনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছেন তাদের জন্য একটি ফাউন্ডেশন গড়ে তুলেছেন সুদীপ। এই সমাজ তাকে যা দিয়েছে, তার কিছুটা হলেও ফিরিয়ে দিতি চান তিনি!

– কেনফলিওস.কম ও ইওরস্টোরি.কম অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।