১৪ ডিসেম্বর ও একটি ঘৃণ্য সামরিক কূটচাল

মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে নভেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে পাকিস্তানি সামরিক গোষ্ঠীর কাছে পরিষ্কার হয়ে যায় পূর্ব পাকিস্তানের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ ক্রমেই হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। পূর্বাঞ্চলে একদিকে যেমন মুক্তিবাহিনী শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলে দূর্বল করে দিয়েছে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে ঠিক তখনই পশ্চিমাঞ্চলে ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে ভারত তাদের অবস্থান আরো শক্তিশালী করে তুলছে। পাকিস্তানের সামরিক কৌশল ভারতের কাছে অনেকটাই পরিষ্কার।

পূর্ব পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রন ধরে রাখতে পশ্চিমে ভারত আক্রমণ করে যুদ্ধজয় করতে হবে আর তাহলে দর কষাকষি বা সমঝোতার মাধ্যমে ভারতকে মুক্তিযুদ্ধ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা যাবে।

ডিসেম্বর ৪, ১৯৭১, ভারতের রাজস্থান রাজ্যের মরুভুমিতে লঙ্গেওয়ালা সীমান্তে অতর্কিত হামলা চালায় পাকিস্তান পদাতিক বাহিনীর একটা দল। ভারতের পাঞ্জাব ব্যাটেলিয়নের ছোট্ট একটা কোম্পানী সেখানে অবস্থান নিয়ে ছিলো। পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে ভুলে ভরা গোয়েন্দা তথ্য ছিলো। না ছিলো ভারতীয় কোম্পানী সম্পর্কে সঠিক ধারণা আর নাই বা তারা জানতো ইন্ডিয়ান এয়ার ফোর্স সেখানে আক্রমন চালাতে পারবে।

প্রাথমিকভাবে প্রায় হারতে বসা ভারতীয় বাহিনীর কাছে দুটি চয়েজ ছিলো, এক বর্ডার পোস্ট ছেড়ে দেয়া এবং দ্বিতীয়ত শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত যুদ্ধ করে এয়ার সাপোর্টের জন্য অপেক্ষা করা। কোম্পানী কমান্ডার মেজর কুলদিপ সিং চাঁদপুরী দ্বিতীয়টি গ্রহন করেন। একবার যদি পাকিস্তান ওই সীমান্ত দখলে নিতে পারে তাহলে পূর্ব পাকিস্তানে ভারতের প্রবেশ ঠেকানো সম্ভব। প্রায় ছয় ঘন্টা মাত্র ১২০ জন সৈন্য নিয়ে পাকিস্তানের ২০০০ সৈন্য এবং ৪৫ ইনফেন্ট্রি ট্যাংকের বিরুদ্ধে অসীম সাহসের সাথে যুদ্ধ করে টিকে থাকে ভারতের ‘এ’ কোম্পানী।

রাতের বেলা এয়ার সাপোর্ট সম্ভব ছিলোনা, তাই ছয় ঘন্টা পর সকাল হবার সাথে সাথে ভারতীয় বিমান বাহিনী পাকিস্তানি ট্রুপসের উপর বিমান হামলা চালালে পরাজয় ঘটে পাকিস্তানের। ৪ ডিসেম্বর শুরু হওয়া এই যুদ্ধ শেষ হয় ৭ ডিসেম্বর সকালে, তবে মূল যুদ্ধ হয় ৬ ডিসেম্বর।

পাকিস্তানের কৌশল ব্যর্থ হয়। তবে ভারতের হাতে চলে আসে সরাসরি পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশের সুযোগ। যেহেতু পাকিস্তান ভারতের উপর হামলা করেছিলো তাই আন্তর্জাতিক মানচিত্র অনুসারে ভারতীয় বাহিনী পাকিস্তানে (তখনো বাংলাদেশের জন্ম যেহেতু হয়নি) অর্থাৎ পূর্ব বাংলায় প্রবেশ করে। ৬ ডিসেম্বর সব সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এই অংশ এখনো তাই অনেক জেনারেল ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বলে থাকে।

পাকিস্তানের পশ্চিম আক্রমনের ভুল কৌশলের সুযোগে ভারতীয় বাহিনী মুক্তিবাহিনীর সাথে মিলে যৌথ বাহিনী গঠন করে। ভারত কিন্তু শুরুতে পরোক্ষ সহায়তা করেছিলো, হয়তো সরাসরি যুদ্ধ জড়ানোর জন্য পাকিস্তানের এমন কোন ভুলের অপেক্ষায় ছিলো তারা।

৬-১০ ডিসেম্বরের ভেতরই কার্যত নিশ্চিত হয়ে যায় বাংলার মাটিতে পাকিস্তানের পরাজয়। বাস্তবতা হচ্ছে ইয়াহিয়া তখন পূর্ব বাংলার আশা ছেড়ে দিয়ে আরো বড় কোন আক্রমনের আশংকা করেছিলো। ইসলামাবাদ, লাহোর, রাওয়ালপিন্ডি থেকে যুদ্ধ বিমান গুলা নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন, নতুন সৈন্য মোতায়েন করা থেকে বিরত থাকেন। অর্থাৎ তাদের ভয় ছিলো ভারতের বিমানবাহিনী যেকোন সময় ইসলামাবাদে হামলা চালাবে।

এবং তাকে যেকোন মূল্যে ইসলামাবাদ রক্ষা করতে হবে। জেনারেল নিয়াজী তখন সীমান্ত থেকে সব সৈন্যকে ঢাকার দিকে নিয়ে আসেন ঢাকাকে রক্ষা করার জন্য ফলে বিনা বাঁধায় ভারতের সেনারা সীমান্ত অরিক্রম করে, এবং টাঙ্গাইলে বিমানসেনারা (ছত্রীসেনা) অবতরণ করে। (সূত্র, HOW PAKISTAN GOT DIVIDED, জেনারেল রাও ফারমান আলী)

অবরুদ্ধ ঢাকায় নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে দাড়িয়ে ইতিহাসের ঘৃন্যতম এক সিদ্ধান্ত নেয় পাকিস্তানি গোষ্ঠী। দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যা করার। আর এই কাজে তাদের সহায়তা করে এদেশেরই রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস্ বাহিনী।

১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১। দেশব্যাপী তুমুল যুদ্ধ। যুদ্ধে ভারতীয় বাহিনী তখন সরাসরি অংশ নিয়েছে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে। ওইদিন হতে পূর্ব পাকিস্তানে কারফিউ জারি করা হয়। নিশ্চিত পরাজয় জেনেই কারফিউ জারি করে পাকিস্তান সরকার। যুদ্ধের দামামা বাজালেও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পিছুটান তখন স্পষ্টতই টের পাওয়া যাচ্ছিল।

ডিসেম্বরের শুরু থেকে দেশের অনেক এলাকা মুক্ত হতে শুরু করে। তবে পরাজয়ের আগে ঘাতক পাকিস্তান বাহিনী এবং তাদের দোসররা বাঙালির সর্বোচ্চ ক্ষতি করার চেষ্টায় লিপ্ত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ঘটায় ঘাতকেরা। লেখক, বিজ্ঞানী, চিত্রশিল্পী, কণ্ঠশিল্পী, শিক্ষক, গবেষক, সাংবাদিক, রাজনীতিক, আইনজীবী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, স্থপতি, ভাস্কর, সরকারি ও বেসরকারি কর্মচারী, চলচ্চিত্র ও নাটকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, সমাজসেবী এবং সংস্কৃতিসেবীদের হত্যার মধ্য দিয়ে তারা জাতিকে মেধাশূন্য করতে ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।

‘৭১-এর ১০ ডিসেম্বর হতে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের প্রস্তুতি চলে। মূলত ১৪ ডিসেম্বর পরিকল্পনার বাস্তবায়ন হয়। সেদিন দেখা যায় পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত ও ঘৃণ্য সামরিক কূটচাল। এদিন প্রায় দুইশ’ জনের মত বুদ্ধিজীবীকে তাদের বাসা হতে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের চোখে কাপড় বেঁধে মিরপুর, মোহাম্মদপুর, নাখালপাড়া, রাজারবাগসহ অন্যান্য অনেক স্থানে অবস্থিত নির্যাতন কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে তাদের উপর বিভৎস নির্যাতন চালানো হয়। পরে নৃশংসভাবে রায়েরবাজার এবং মিরপুর বধ্যভূমিতে হত্যা করে ফেলে রাখা হয় দেশের বুদ্ধিজীবীদের।

পাকিস্তানি সামরিক জান্তার সঙ্গে এ হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। আর তাকে তালিকা প্রস্তুতিতে সহযোগিতা ও হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়নের পেছনে ছিল মূলত জামায়াতে ইসলামী কর্তৃক গঠিত কুখ্যাত আল বদর বাহিনী। বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রধান ঘাতক ছিলেন বদর বাহিনীর চৌধুরী মঈনুদ্দীন (অপারেশন ইন-চার্জ) ও আশরাফুজ্জামান খান (প্রধান জল্লাদ)।

১৬ ডিসেম্বরের পর আশরাফুজ্জামান খানের নাখালপাড়ার বাড়ি থেকে তার একটি ব্যক্তিগত ডায়েরি উদ্ধার করা হয়, যার দুটি পৃষ্ঠায় প্রায় ২০ জন বুদ্ধিজীবীর নাম ও বিশ্ববিদ্যালয়সহ তাদের কোয়ার্টার নম্বর লেখা ছিল। তার গাড়ির চালক মফিজুদ্দিনের দেয়া সাক্ষ্য অনুযায়ী রায়ের বাজারের বিল ও মিরপুরের শিয়ালবাড়ির বধ্যভূমি হতে বেশ কয়েকজন বুদ্ধিজীবীর গলিত লাশ পাওয়া যায়। যাদের সে নিজ হাতে গুলি করে মেরেছিল।

চৌধুরী মঈনুদ্দীন ৭১-এ সালে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি অবজারভার ভবন হতে বুদ্ধিজীবীদের নাম ঠিকানা রাও ফরমান আলী ও ব্রিগেডিয়ার বশির আহমেদের কাছে পৌঁছে দিতেন। এছাড়া এ বি এম খালেক মজুমদার (শহীদুল্লাহ কায়সারের হত্যাকারী), মাওলানা আবদুল মান্নান (ডা. আলীম চৌধুরীর হত্যাকারী), আবদুল কাদের মোল্লা (কবি মেহেরুন্নেসার হত্যাকারী) প্রমুখ তাদের সঙ্গে ছিলেন। চট্টগ্রামে প্রধান হত্যাকারী ছিলেন ফজলুল কাদের চৌধুরী ও তার দুই ছেলে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং গিয়াস কাদের চৌধুরী।

এই জঘন্য হত্যাকান্ডের পরপই ১৯৭১ সালের আজকের দিনে অর্থাৎ ১৪ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান পন্থী প্রশাসন পদত্যাগ করে। এদিনই ভারতীয় বাহিনী ঢাকার সবচেয়ে কাছাকাছি চলে আসে।

১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর নিউইয়র্ক টাইমস-এ প্রকাশিত রয়টার্সের রিপোর্টে বলা হয়, “পুরো আঞ্চলিক সরকার আজ (১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১) পদত্যাগ করেছে, দেশের পশ্চিমাংশে প্রেসিডেন্ট আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের কার্যক্রম থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়।

রিপোর্টে বলা হয়, ভারতীয় মিগ-২১ পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ড. এ এম মালিকের সরকারি বাসভবন গভর্নমেন্ট হাউস ধ্বংস করে দিলে তিনি তার কেবিনেটের জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের কাছে খসড়া পদত্যাগপত্র লিখেছেন। নয়াদিল্লীতে সরকারি কর্মকর্তারা জানান, ভারতীয় সেনাবাহিনী উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে দ্রুত ঢাকার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এবং তারা ঢাকার ৬ মাইলের মধ্যে পৌঁছে গেছে।

এ সময় ঢাকা গ্যারিসনের কাছে পাকিস্তানি একটি ব্রিগেড কমান্ডার তাদের আত্মসমর্পণ করার খবর দিয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানি প্রশাসনের মন্ত্রীদের পরিবেষ্টিত গভর্নর মালিক তার পদত্যাগের খসড়া জাতিসংঘ কর্মকর্তা জন কেলি লন্ডনের সানডে পত্রিকা গ্যাভিন ইয়াংকে দেখান।

বিমান হামলার সময়ে তারা গভর্নরের সঙ্গে তার বাংকারে আটকা পড়েছিলেন। ড. মালিকের স্ত্রী ও কন্যা পাশের একটি কক্ষে আশ্রয় নিয়ে ছিলেন। এ সময় ড. মালিক এবং তার মন্ত্রিসভার সদস্যরা পদত্যাগ করবেন কি করবেন না, এ নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলেন। ভারতীয় বিমান বাহিনীর অভিযান অবশেষে এ বিষয়ে সমাধান দেয়। তারা পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করেন। রকেট ও বোমা হামলা শেষে ড. মালিক তার জুতা ও মোজা খুলে ফেলেন। সাবধানে তার পা পরিষ্কার করেন। রুমাল দিয়ে তার মাথা পরিষ্কার করেন এবং বাংকারের একটি কর্নারে নামাজ আদায় করেন।

নামাজ শেষে ড. মালিক মি. কেলিকে জিজ্ঞেস করেন, তার স্ত্রী ও কন্যাকে নিয়ে তুলনামূলক নিরাপদে ইন্টার কন্টিনেন্টাল হোটেলে যাবেন। হোটেলটি নিরাপদ জোন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এটি রেড ক্রস চালাতো। এর আগে পুলিশের আইজি এম এ চৌধুরীর নেতৃত্বে ১৬ জন বেসামরিক কর্মকর্তা হোটেলে এসে আশ্রয় নেয়। এই পদত্যাগের মাধ্যমে সকল দায়-দায়িত্ব পূর্ব-পাকিস্তানি সামরিক কমান্ডার লে. জেনারেল এ এ কে নিয়াজির ওপর পড়ে।

বিকেলে ভারতীয় মিগ জঙ্গি বিমান কোন প্রকার প্রতিরোধ ছাড়াই ঢাকার আকাশে উড়ে। এর আগে ভারতীয় বিমান থেকে ফেলানো প্রচার পত্রে অবাঙালী সৈন্যদেরকে আত্মসমর্পণ করার আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, তারা আত্মসমর্পণ করলে তাদের জীবন ও সম্পদ নিরাপদ থাকবে।

১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে জাতির যেসব সূর্য সন্তান নিহত হন তাদের ভেতর শিক্ষাবিদ ৯৯১ জন, সাংবাদিক ১৩ জন, চিকিৎসক ৪৯ জন, আইনজীবী ৪২ জন, অন্যান্য পেশার সফল ১৬ জনসহ আরো খোঁজ না পাওয়া অনেকে। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে সেই সব সূর্য সন্তানদের জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।