হয়তো আমি এই লেখাটা লিখতে পারতাম না

প্রায় চার বছর আগের গল্প ।

মৌলভিবাজারের শমশেরনগরে পুরো ফাঁকা রাস্তায় আমি আর আমার এক জুনিয়র মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার কবলে পড়ি । আমি বাইক চালাচ্ছিলাম এবং দোষ আমারই ছিলো । আমি যথেষ্ট সাবধান ছিলাম না, বৃষ্টিভেজা রাস্তায় আমার স্পিড অনেক বেশি ছিলো এবং পাশ কাটিয়ে না গিয়ে আমার উচিৎ ছিলো হঠাৎ রাস্তায় দৌড়ে আসা গরুর পেট বরাবর সেঁধিয়ে যাওয়া ।

অ্যাক্সিডেন্টের পর আমি মোটামুটি মমিফাইড অবস্থায় বিছানায় ছিলাম প্রায় তিন মাস। পুরো শরীর ছিলে গিয়েছিলো, বামহাতের একখাবলা মাংস রাস্তায় রেখে এসেছিলাম এবং আমার হিউমেরাস ডিসলোকেটেড হয়েছিলো । পিজিওথেরাপিস্ট যদি সদয় না হতেন, হয়তো আমি পঙ্গুত্ববরণ করতাম । যদি সেদিন রাস্তা ফাকা না থেকে উল্টোদিক থেকে কোন যাত্রীবোঝাই বাস আসতো, হয়তো, আমি এই লেখাটা লিখতে পারতাম না ।

আমার গাড়ি নেই, এই বিশাল শহরে একটা মোটরসাইকেলই আমার একমাত্র যানবাহন । আমার এ্যাক্সিডেন্টের পরে আমি মোটরসাইকেল চালানো বন্ধ করিনি, কিন্তু, এই একটি দুর্ঘটনা, আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে । এ্যাক্সিডেন্ট করে শেখার চেয়ে মেগাবাইট খরচ করে শেখা সহজতর, তাই খেটেখুটে লিখছি ।

মোটরসাইকেল মেইনটেইন করা সহজ, খরচ নেই বললেই চলে । ট্রাফিক জ্যামের চিপাচুপা দিয়ে যাওয়া যায় বলে, বেশ জনপ্রিয় এই মাধ্যমটি । পাঠাও, উবারের কল্যাণে এখন শুধু ব্যক্তিগত নয়, বানিজ্যিক ভাবেও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে চলেছে এই দ্বি-চক্রযানটি ।

মোটরসাইকেল সবচেয়ে সহজলভ্য মোটরযান, কিন্তু একইসাথে সবচেয়ে ঝুকিপূর্ণও । মোটরকারের মত নিরাপদ নয় মোটরসাইকেল চালনা । পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, শতকরা ৮০ ভাগ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ঘটে চালকের ভুলে নয়, অন্য কোন কারণে । কিন্তু , সামান্য কিছু সাবধানতা পারে, এই দুর্ঘটনার সম্ভাবনাকে অনেকাংশে কমিয়ে নিয়ে আসতে। আসুন, এগুলো নিয়ে একটু আলোচনা করি।

.

একজন দক্ষ বাইকার হবার প্রথম এবং প্রধান শর্ত – হেলমেট পড়ে বাইক চালানো। ১০০ টাকার প্লাস্টিকের হেলমেট না, একটা ভালো হেলমেট – যেটা পড়ে আপনি নিরাপদে বাইকভ্রমণ করতে পারেন । আপনি ভ্যালেন্টিনো রসি হতে পারেন, কিন্তু যদি আপনি সেফ না হন, আপনি প্রথম শ্রেণীর একজন অপদার্থ ছাড়া আর কিছুই নন। একজন ভালো বাইকার কখনোই ভালো হেলমেট ছাড়া বাইক চালান না। হেলমেটের দাম মোটেই খুব বেশি নয়, পরিষ্কার করাও কঠিন কিছু নয় । কিন্তু, হেলমেট ছাড়া বাইক চালানোর মাঝে কোন হিরোইজম নেই ।

.

তেমনি হিরোইজম নেই গতির ফোয়ারা ছোটানোতে । আপনার গতি আপনার ক্ষতির কারণ হলে, গতিকে বারণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ । বিশ্বাস করুন, আপনার মোটরসাইকেলের গতি ২০ কেপিএইচ কম হলে ভার্সিটির সুন্দরী মেয়েটি আপনাকে দুইছটাক কম ভালোবাসবে না । আমি বলছিনা, কচ্ছপের গতিতে বাইক চালান, বলছি, এমন গতিতে বাইক কখনোই চালাবেন না, যেটা কন্ট্রোল করা আপনার পক্ষে সম্ভব না ।

.

অনেকে বাইকের রিয়ারভিউ মিররটা সৌন্দর্যের জন্য খুলে রাখেন । আপাতদৃষ্টিতে অপ্রয়োজনীয় এই অংশটি আসলে মোটরসাইকেলের অন্যতম প্রয়োজনীয় অংশ । বিশেষত, যারা হাইওয়েতে বাইকিং করেন, তারা অবশ্যই নিশ্চিত করবেন, যে আপনার রিয়ারভিউ মিররটি আছে এবং জায়গামত আছে ।

.

আপনার মোটরসাইকেল আপনার পরিচর্যা দাবী করে । শাইনার দিয়ে বাহ্যিক পলিশ শুধু নয়, নিয়মিত ইন্জিন অয়েল চেন্জ করুন। আপনার ক্ল্যাচপ্লেট এবং ব্রেক নিয়মিত চেক করান, এয়ার ফিল্টার পরিষ্কার রাখুন , দেখুন লাইটগুলো ঠিকঠাক কাজ করছে কিনা। প্রয়োজন হোক বা না হোক, মাসে অন্তত একবার গ্যারেজে যান। টায়ারের গ্রিপ নষ্ট হয়ে গেলে যতো শ্রীঘ্রি সম্ভব টায়ার বদলান । এই পার্টসগুলোর চেয়ে অবশ্যই আপনার জীবনের মূল্য অনেক অনেক বেশি ।

.

ফুটপাথে বাইক চালাবেন না । এটা ফুটপাথে যারা চলছেন তাদের জন্য বিরক্তিকর এবং একই সাথে নিয়মবিরুদ্ধ । হাজার হাজার এসি গাড়ির ভিড়ে গরমে সেদ্ধ হওয়াটা কষ্টকর, কিন্তু এটুকু কষ্ট সহ্য করুন। আপনি দুই ঘন্টার রাস্তা আধাঘন্টায় যাবেন, সেটাই আপনার কমপেনসেশান ।

.

বালু বা ভেজা রাস্তায় কখনো ২৫ এর উপরে বাইক চালাবেন না । কখনোই না । আপনি অনেক দক্ষ অনেক অভিজ্ঞ বাইকার হতে পারেন, কিন্তু প্রথম শ্রেণীর গর্দভ ছাড়া কেউ কাদা বা বালুর উপরে বাইক জোরে চালায় না । জীবন থেকে নেয়া শিক্ষা, এই কাজটা কখনো করবেন না ।

.

‘পেরিফেরাল ভিউ’ নামের একটা জিনিস আছে । সামনের দিকে তাকিয়ে থাকলেও কিন্তু বোঝা যায় আপনার দুপাশে কি হচ্ছে । এই জিনিসটা তখনি হয়, যখন আপনি মনোযোগ দিয়ে বাইক চালাবেন । অনেক সময় ঘটে, হঠাৎ একটা শিশু বা অতিউৎসাহী পথচারী দৌড়ে সামনে চলে আসলো । আপনি সাবধান থাকলে এসব ক্ষেত্রেও দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব ।

.

মোবাইলে কথা বলতে বলতে বাইক চালাবেন না । আমি একসময় এই কাজটা করতাম । এখন করি না । আপনি যতো সাবধানই থাকুন, মোবাইলে কথা বললে আপনার মনোযোগটা রাস্তার উপরে থাকে না । কল আসলে, বাইক রাস্তার পাশে দাড় করান। সংক্ষেপে কথা শেষ করুন , তারপরে আবার রওনা হোন।

.

শীতকালে গ্লাভস পরুন, সম্ভব হলে পায়ে নী-প্যাড পরে নিন । ভালো গ্রীপ পাবেন, দুর্ঘটনায় ছড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না । কখনোই হাফপ্যান্ট পড়ে বাইক চালাবেন না । দুর্ঘটনার কথা বাদই দিলাম, দুনিয়াশুদ্ধ লোককে নিজের তামিলনাড়ু দেখানোর কোন মানে হয় না ।

১০.

রাস্তার আপনার চেয়ে দ্রুতগামী গাড়ি থাকবেই । এটা রাস্তা, রেসট্র্যাক না । আপনার সবার আগে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, আপনার প্রয়োজন সুস্থভাবে যাওয়া । সুতরাং ওভারটেকিং টেন্ডেন্সি পরিহার করুন ।

১১.

বাইকের কাগজপত্রের ফটোকপি সাথে রাখুন । আপনি আইন ভঙ্গ না করলে, আপনাকে আইন আটকাতে পারবে না । রাস্তায় ট্রাফিক আটকালে ভদ্রভাবে কথা বলুন, যদি তবুও হেনস্তা করার চেষ্টা করে, যোগাযোগ করুন উর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে ।

১২.

রাতে বাইক চালানোর সময় চোখে পোকা আর ধূলো পড়া কমন একটা সমস্যা । সাদা একটা প্লাষ্টিকের চশমা কিনে নিন। ফুটপাথে সস্তায় পেয়ে যাবেন । অনেক কাজের একটা জিনিস ।

১৩.

অন্যান্য বাইকারদের সাহায্য করুন । কোথাও কোন দুর্ঘটনা দেখলে যথাসাধ্য চেষ্টা করুন সাহায্য করতে । এড়িয়ে যাওয়া সহজ, কিন্তু অন্যকে সাহায্য করার মানসিকতা না থাকলে নিজেকে বাইকার দাবী করাটা অযৌক্তিক ।

সবশেষে একটা কথা বলি । নিশ্চয়ই পৃথিবীতে কেউ না কেউ আছে যে আপনাকে অনেক ভালোবাসে । সেটা বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তান, বন্ধু-প্রেমিকা যে কেউ হতে পারে । তারা চাননা আপনি পঙ্গু হয়ে জীবন কাটান । হাসপাতালে গেলে দেখতে পাবেন, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে বাইকে , এবং প্রতিটিই জীবন কেড়ে নেয়ার মতো মারাত্নক দুর্ঘটনা । নিজের জীবনের মায়া না থাকতে পারে, কিন্তু তাদের কথা ভেবে হলেও একটু সাবধানে বাইকটা চালান । আমরা অনেকেই এই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় হারিয়েছি প্রিয়জনদের । আমি যে নিয়মগুলোর কথা লিখলাম, এমনটা নয় যে আমি নিজে সেগুলো একশোভাগ মেনে চলি । কিন্তু এই স্ট্যাটাসটা নিজের জন্যও একটা রিমাইন্ডার । আপনার যদি একটুও সর্তক হোন, সত্যি বলছি, অনেক অনেক খুশি হবো ।

– শামীম শরীফ সুষম’র ফেসবুক ওয়াল থেকে।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।