‘হয়তো আমাকে কারো মনে নেই’

| শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা থেকে |

ট্রল – এখন একটা বিশাল মাধ্যম ফেসবুকে। অনেক সময় যাকে নিয়ে যারা ট্রল করছেন তাঁর নখের যোগ্য হননা। তাদের মধ্যে অন্যতম সুখেন দাস। এ প্রজন্ম, কে সুখেন দাস কি তার বাংলা ছবিতে অবদান জানেনা ওই মুখ্যু ট্রল গুলো দেখে হেহে করে। আবার অনেক আগের প্রজন্ম সুখেনের ছবি যাত্রাপালা তকমা দেয়।

কিন্তু তা আদতে নয়। উত্তম শেষ জমানায় ও উত্তমোত্তর জমানায় টলিউড কে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন সুখেন দাস অঞ্জন চৌধুরী বীরেশ চট্টোপাধ্যায় সুজিত গুহ প্রভাত রায়ের মতো কিছু পরিচালক। সুখেনের ছবি যদি নিম্নমানের হতো মহানায়ক কি সে ছবিতে কাজ করতেন ও নাম করতেন?

সৌমিত্র ভানু অনুপ থেকে চিরঞ্জিত তাপস প্রসেনজিৎ, সাবিত্রী থেকে শকুন্তলা বড়ুয়া মহুয়া ইন্দ্রাণীরা যার ছবিতে অভিনয় করে নাম করেছেন। টালিগঞ্জের বাংলা ছবির বাণিজ্যসফল পরিচালক অভিনেতা সুখেন দাস। পরিচালক অঞ্জন চৌধুরীর পূর্বসূরি।

পার্শ্ব অভিনেতা হিসেবে এত সাফল্য কম জন পেয়েছেন।উত্তমের মতোই সকলের ঘরের ছেলে হয়ে ওঠে সুখেন। সে পর্দায় এলে থাকত হাসি মজা নয়ত আবেগ। হাউসফুল হল করবার ক্ষমতা তাঁর ছিল।

যারা মানুষটাকে নিয়ে ট্রল করেন তারা কি জানেন মানুষটা কত আন্তরিক ছিল যা এ যুগে বিরল। তাঁর ছবির যখন শুটিং চলত সব ব্যাপার তিনি নিজে দেখভাল করতেন। প্রত্যেককে নিজে আদর আপ্যায়ন করতেন। ঠিক তার অভিনীত ছবি ‘দাদামণি’র মতো। এমনকী মধ্যাহ্নভোজনের সময় সকলকে খেতে বসিয়ে তারপর নিজে সবার শেষে বসতেন। কার পাতে কী পড়ছে, কী পড়ছে না, সেদিকেও নজর রাখতেন তিনি। তাঁর আদর থেকে বাদ পড়তেননা টেকনিশিয়ানরাও। কিন্তু অকৃতজ্ঞ প্রজন্ম যারা তাঁর নাতির বয়সি তারা তাঁকে নিয়ে আজ টিটকিরি ফেবু ট্রল করে।

সুখেন দাস একজন কিংবদন্তি। যা হলিউড ছবি দেখা দর্শকদের ট্রলে কিছু এসে যায়না। সত্তর আশির দশকের কলকাতা মফস্বল আলাদা ছিল তখন মানুষ পরিবারকেন্দ্রিক ছায়াছবি চাইত। কারো ছবিতে আবেগ থাকা তো দোষের নয়।

শুধু সুখেন দাসের পরিচালনা অভিনয় নয় তাঁর ভাই অজয় দাসও একজন কিংবদন্তি। যিনি নুন্যতম প্রাপ্য সম্মান পাননি। দেখলাম এবারের ফিল্মফেয়ার পুরস্কারে শ্রদ্ধেয় অজয় দাসকে মরণোত্তর ফিল্মফেয়ার দেওয়া হল। ভালো লাগল। কিন্তু ওনার জীব্বদশায় উনি কোনো স্বীকৃতি পাননি। সুখেন দাসের ছবির মূল ইউএসপি অজয় দাসের সুর।আরো অনেক পরিচালকের ছবিতে লেজেন্ডারি গানের সুরারোপ করেছেন অজয় দাস।

এখনকার ছেলেপিলেরা বলবে, ‘সুখেন দাস যুগে সুখেন দাস পাবলিককে কাঁদাবার ভার নিয়েছিল অজয় দাসের গান গেয়ে চড় থাপ্পর মেরে দাড়ি খুলে দিয়ে শালা কাঁদবিনা মানে।’

এগুলো যারা বলিস শালা তোরা পারবি অজয় দাসের মতো একটা গান বানাতে? ‘কি উপহার সাজিয়ে দেবো’, ‘সুখেও কেঁদে ওঠে মন’, ‘আজ মিলন তিথির পূর্ণিমার চাঁদ’, ‘বৃষ্টি থামার শেষে’, ‘তুমি মা আমাকে পৃথিবীর এই আলো দেখিয়েছিলে’, ‘অনেক জমানো ব্যাথা বেদনা কি করে গান হল জানিনা’, ‘দূর আকাশে তোমার সুর’।

‘প্রতিশোধ’ ছায়াছবিতে শকুন্তলা বড়ুয়ার লিপে অরুন্ধতী হোম চৌধুরী’র কন্ঠে ‘ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা আর কি আমি চাই? নাই বা পেলাম পান্নাচুনী দু:খ আমার কিছু নাই।’

দুই দাদা সুখেন আর অনুপ কুমার। ভাইফোঁটা মানেই সুখেন দাসের ছবিতে অজয় দাসের সুরে এই গান চিরদিনের ক্লাসিক গান।

কিশোর কুমার কে সেরা সেরা গানে ব্যবহার করেছেন সুখেন অজয় দাস জুটি। ‘হয়তো আমাকে কারো মনে নেই’, ‘চিতাতেই সব শেষ’। আশা লতা গেয়েছেন সুখেন দাসের ‘অমর কন্টক’ ছবিতে মুনমুনের লিপে ‘অন্ধকারে আলো দিতে পুজোর প্রদীপ হয়ে জ্বলো’।

লতাজী গেয়েছেন ‘আমি যে কে তোমার তুমি তা বুঝে নাও’। বাংলার অজস্র শিল্পী তাঁদের ছবি ও সুরে গেয়েছেন। সুখেন দাস যাত্রাপালা বানায় বলে তাঁর অবদান বাংলা ছবিতে অস্বীকার করা যায়।

আজকালকার যে গান হয় একই শব্দের বারংবার ব্যবহার ‘মন মানে না মানে না’, ‘বল না তুমি আমার’ – এসব গানের চেয়ে অনেক উচ্চমানের আসল গান সুখেন অজয় জুটি বানান। যা আজও যেকোনো অনুষ্ঠানে হিট। কেন যদি অখাদ্য হত আজও গান গুলো অমর হয়ে থাকতনা। তখন মিউজিক এখনকার মতো এত উন্নত না হলেও তারা করে দেখিয়েছেন। মহানায়কের মহাপ্রস্থানে টলিপাড়া অচল হয়ে যাওয়া ইন্ডাস্ট্রিতে এসব গান লোকের মুখে মুখে হিট করিয়েছেন।ট্যালেন্ট না থাকলে এটা হয়না। যারা সমালোচনা করেন তারা পারবেন এসব গান ও তার দৃশ্যায়ন বানাতে?

একজন আন্তরিক সরল মানুষ আজ ট্রলের স্বীকার।

ছবি মোটা দাগের আবেগপ্রবন হতেই পারে কিন্তু আজকাল দেব জিত যে ধরনের তামিল কপি ছবি করেছে করে সেগুলোর চেয়ে অনেক সুন্দর নিটোল গল্প বলতেন সুখেন দাস। প্রসেনজিত ঋতুপর্নার যুগে যা অখাদ্য ছবি হত ওমন জুটি না হলেও ইন্ডাস্ট্রির কিছু এসে যেতনা। এগুলোর চেয়ে সুখেনের ছবি ভালো গল্প বলত। আর অজয় দাসের সুর অপূর্ব যা কিন্তু আর ডি এস ডি বর্মণদের পাশে রাখার মতো।

সুখেন শুধু সমাজে ধর্ষিত নন তার পরিবারের কেউ তাকে মনে রাখেনি। আজ সুখেন দাসের প্রয়াণ দিবস কিন্তু তাঁর নিজের নাতি হালের নায়ক বনি সেনগুপ্ত দাদুর কথা বলেনা। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলে, ‘দাদুর একটা ছবিও দেখা হয়নি।’ সে তো এমন কিছু তালেবর অভিনেতা কি নায়ক নন। যারা মূল ভুলে যায়। সুখেন তাঁর মেয়ে পিয়া দাস ও ছেলে রজত দাসকে সিনেমায় আনেন। পিয়া যা হোক করে টিকে গেলেও রজত জঘন্য অভিনয় করে হারিয়ে যায়।সুখেনের সহকারী পরিচালক অনুপ সেনগুপ্ত পিয়া দাসকে বিয়ে করেন।

সুখেনকে ভুলে গেল তাঁর পরিবার। যার জন্য এরা সিনেমায় এলো।যে নাতি দাদুকে এড়িয়ে যেতে পারলে বাঁচে – এদের প্রতি করুনা হয়। এক গাল দাড়ি চোখে চশমা আজকালকার মেয়েদের নাকি পছন্দ তাতে সুখেন দাশের ছবি দিয়ে তাকে ট্রল করছে যারা – তাদের ছি! বলতেও করুনা হয়।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।