হোটেল সমাচার || ছোট গল্প

১.

জীবনের একটা সময় পর্যন্ত আমরা সকলেই বাবার হোটেলে খাই। সম্পূর্ণ ফ্রিতে। এই হোটেলে খাওয়ার আগে পরে প্লেটটা ধুয়ে খাওয়াতো দূরের কথা হাতটাও অন্যজন ধুয়ে দেন। তারপর সময় পেরিয়ে গেলে ‘আর কত কাল বসে বসে বাবার হোটেলের অন্নধ্বংস করবা?’ শুনতে শুনতে আমাদের সবারই বাবার হোটেলে খাওয়া বন্ধ হয়ে যায়।

২.

বাবার হোটেলে খাওয়া বন্ধ হয়ে গেলে পকেটে সামান্য টাকা কিন্তু বুকে ‘একদিন সব শালাকে দেখিয়ে দেব’ সংলাপ নিয়ে রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে পরিচয় ঘটে ভাই ভাই হোটেলের সাথে। কিছুদিন খাওয়ার পর ভাই ভাই হোটেলের ক্যাশিয়ার -মেসিয়ারদের সাথে ভাইয়ের মত একটা সম্পর্ক হয়ে যায়।সে সম্পর্কের খাতিরে কয়েকদিন নগদ টাকা না দিয়েও দিব্যি খাওয়া যায়। নাম ওঠে বাকির খাতায়।বাকির পরিমান যথেষ্ট হয়ে গেলে এবং সময়মত পরিশোধ না করতে পারলে ভাই ভাই হোটেলের সাথে সুসম্পর্কের ছেদ পড়ে।

৩.

বাবার হোটেলের দরজা বন্ধ। ওদিকে ভাই ভাই হোটেলের দরজাও বন্ধ। ক্ষিধের জ্বালায় অস্থির হয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে যখন লোকটার পায়ের চটি স্যান্ডেলটা ছিড়ে যায় তখন কেউ দেখে ফেললো কিনা ভেবে এদিক-ওদিক তাকাতেই রাস্তার ধারে মায়ের দোয়া হোটেল চুপিচুপি ইশারায় তাকে ডাক দেয়।

তখন লোকটার সাথে সাথে আমাদের মনে পড়ে –

কিশোর বয়সে বাবার হোটেলে খাওয়াকালীন পাশের বাসার লস্কর বাড়ির ছেলের সাথে মারামারি করে নাক ফাটিয়ে দিয়ে আসলে অথবা পরীক্ষার খাতায় কম নম্বর পেলে, টিনের সিনেমা হলের বেড়ার ফাঁক দিয়ে ফুচকি দিয়ে সিনেমা দেখে শার্টের কলার উচিয়ে, বুকের বোতাম খুলে রাস্তা দিয়ে নায়কীয় ভঙ্গিমায় হেঁটে আসলে অথবা হাটফেরত হাটুরিয়াদের রাস্তায় ফেলে যাওয়া বিড়িতে টান দিয়ে মুখে গন্ধ নিয়ে ঘরে ফিরলে, ‘আইজ থেইকা অর ভাত বন্ধ।’

বাড়ির সবাই খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লে ঘুটঘুটে অন্ধকারে বাহির বাড়িতে শাড়ির আঁচলের নিচে ভাতের প্লেটের কোনায় এক চিমটি ঘি, কুমড়ো ফুলের বড়া, সজনে ডাটা দিয়ে রান্না করা ডাল আর ডিমভাজি নিয়ে এসে,

– তাড়াতাড়ি খা। কেউ দেইখলে কিন্তু আমার খবর হইয়া যাইবো। তর বাপে দেখলে আমারে মাইরাই ফালাইবো।

– রিস্ক লইয়া খাওয়াইতে আসছো ক্যান?

– যহন পুতের বাপ হবি তহন বুঝবি। এইবার খা কইলাম।

কয়েক লোকমা খাওয়ার পরে,

– মা, সবি ঠিক আছে। গুড। তয় কুমড়া ফুলের বড়াতে লবন ইট্টু কম হইছে। আর ঘোষ কাকায় আজকাল কি ঘি দিয়া যায়! কেমন জানি পানসে পানসে লাগে। তুমি তারে কইয়া দিও।

কিশোর বেলার কথা ভাবতে ভাবতে মায়ের দোয়া হোটেলে ঢুকবে কি ঢুকবে না চিন্তা করতে করতে লোকটা পাশের বিসমিল্লাহ হোটেলের সাইনবোর্ডের দিকে তাকিয়ে বিসমিল্লাহ বলে মায়ের দোয়া হোটেলে বসে একে একে সব মেনু খেতে থাকে। খাওয়া শেষে মেসিয়ার বিলবুক সামনে দেয়। বিল হয়েছে এক হাজার টাকা মাত্র। ইংরেজিতে লেখা ওয়ান থাউজেন্ড ওয়ানলি।

– টাকা তো নাই…

– নাই মানে? এটা কি বাপের হোটেল?

ক্যাশিয়ার বলে,

– কি হইছে রে…

– এক হাজার টাকা খাইয়া কয় টাকা নাই।

ক্যাশিয়ার উঠে এগিয়ে এসে,

– এলাকায় কবে আইছো?ভালোয় ভালোয় টাকা গুইনা দিয়া যাও।নাইলে…

– মায়ের দোয়া হোটেলে খাইতে আবার টাকা লাগে নাকি!

– বিশ লক্ষ টাকা খরচা কইরা হোটেল দিছি মাইনসেরে মাগনা খাওয়ানের লাইগা?

– মায়ের দোয়া নিয়ে হোটেল চালাচ্ছেন। মায়ে আপনাকে দোয়া দিছে বিনিময়ে আপনি মায়ের জন্য দোয়া করছেন কোন? তাহলে আপনি কেমন ছেলে!

কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে হোটেল মালিক লোকটাকে জড়িয়ে ধরে,

-ও ভাইগো আপনি এইডা কি হুনাইলেন…এমনে ভাবি নাইতো! আপনি আর কি খাইবেন। কোন টাকা পয়সা লাগবো না। যা খুশি খাইয়া যান। মারে খুব ভালবাসি আমি।

– আমারতো পেট ভরা আর কিছু খেতে পারবো না।

– এরপর থেইকা আপনার যহন যা মন চায় তহন আইসা খাইয়া যাবেন। কামাই-কাজি তো আর আল্লায় কম দেয় নাই আপনার মত মানুষরে খাওয়ানো কোন ব্যাপার! মা খুশিতো আল্লাহ খুশি। ভাইছাব বৃষ্টির দিনে হোটেলে আসতে না পারলে লোক দিয়া পাঠাইয়া দিমু। ঐ কে আছিস ভাই সাহেবরে রিকশা ঠিক কইরা দে।ভাইছাব এই এক হাজার টাকার নোটটা রাখেন।

লোকটা খানিকটা বিব্রত বোধ করে।

‘ভাই না নিলে আমি শান্তি পামু না।’ বলে হোটেল মালিক।

মেসিয়ার ছেলেটা রিকশা ঠিক করে দাঁড়িয়ে আছে। ছয়ফুট লম্বা লোকটা মাথার লম্বাচুলে হাত দিয়ে হোটেলের বাইরে এসে দাঁড়ায়। পিছন ফিরে হোটেলের সাইনবোর্ডের দিকে তাঁকায়। তাতে লেখা-মায়ের দোয়া হোটেল।

রিকশায় উঠে বসে ।মেসিয়ার ছেলেটা খপ করে লোকটার হাত ধরে বসে।

– ভাইয়া,আমারে ক্ষমা করেন। আমি আপনার লগে খারাপ ব্যবহার করছি। বুঝি নাই।

হোটেলের পাশের টং দোকানের বেঞ্চি থেকে শুনতে পাই। লোকটা মেসিয়ার ছেলেকে বলছে, ‘এই হোটেলে সর্বোচ্চ কত টাকা পর্যন্ত বকশিস পেয়েছো?’

– একশো। এক ম্যাডাম দিছিল।

চা খেতে খেতে আমরা আরও দেখি, লোকটা এক হাজার টাকার নোটটা মেসিয়ার ছেলেটার হাতে গুজে দিতে। না নিয়েও উপায় নাই ভেবে মেসিয়ার ছেলেটা টাকাটা হাতে নিয়ে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

ইতোমধ্যে রিকশাওয়ালা রিকশা চালানো শুরু করে দিয়েছে। মেসিয়ার ছেলেটা একদৃষ্টিতে রিকশার পানে তাকিয়ে আছে। যতক্ষন পর্যন্ত রিকশা দেখা গেল ততক্ষন পর্যন্ত তাকিয়ে থাকলো। এরপর মেসিয়ার ছেলেটা হোটেলের সাইনবোর্ডের আলো বরাবর এক হাজার টাকার নোটটা দুহাতে চোখের সামনে মেলে ধরলো। ব্যাকগ্রাউন্ডে মায়ের দোয়া লেখাটা দেখা গেল। এভাবে টাকা দেখতে দেখতে মেসিয়ার ছেলেটা মনে মনে বললো, মা সামনের সপ্তা-ই বাড়িত আমু।

আমরা টং দোকানের সব বিল মিটিয়ে যে যার গন্তব্যে রওনা দিলাম। হাঁটতে হাঁটতে আমাদের মনে ভাবনা আসে। লোকটার হাতে তো টাকা নেই।এক হাজার টাকার নোটটাও মেসিয়ার ছেলেটাকে দিয়ে গেল। রিকশা ভাড়া দেবে কি করে?

৪.

এমন সময় পাশ থেকে আরাফ বলে, ভাইয়েরা একটু পা চালিয়ে হাঁটুন। মামার হোটেলতো বন্ধ করে দেবে…মেলা রাত হয়ে গেছে।

খালের পাড়ে মামার হোটেল। সালাম মামার হোটেল। এই হোটেলের কোন সাইনবোর্ড নেই। হোটেলে গিয়েই দেখবো যে,সালাম মামা ক্যাশবাক্সের সামনে চৌকির উপর বসে আছেন। কয়েকজন রিক্শাওয়ালা, সিএনজিওয়ালা রাতের খাওয়া শেষ করে ম্যাচের কাঠি দিয়ে দাঁত খোঁচাচ্ছে আর খোশগল্প করছেন। আমাদের কয়েকজনকে একসাথে ঢুকতে দেখে সালাম মামার বউ মানে ছবুরা খালা চুলার জ্বাল বাড়িয়ে দিয়ে খোশগল্প করা কাষ্টমারদের উদ্দেশ্যে বলবেন, খাইছেন দাইছেন অহন আপনেরা যান গা।আমার পোলাপান গুলা অহন ভাত খাইবো।

এরপর আমরা বেশি করে আদা-রসুন দেওয়া গরম মাংসের তরকারি দিয়ে ভাত খেয়ে, মিষ্টি পান চিবুতে চিবুতে যার যার বাড়ীর দিকে পায়ে হেঁটে রওনা হব। ছবুরা খালা হোটেলের সামনের রাস্তাটুকু ঝাড়ু দেওয়ার নাম করে যতক্ষন পর্যন্ত আমাদেরকে দেখা যায় ততক্ষণ পর্যন্ত চেয়ে থাকবেন। ছবুরা খালার ঘরে কোন সন্তান নেই। সালাম-ছবুরা নিঃসন্তান দম্পতি।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।