হোক ফুটবলের নতুন যাত্রা

শেষ বাঁশি বাজার পর বাঁধভাঙ্গা উল্লাসে মেতে উঠে পুরা দল, ফটোগ্রাফারদের সামনে ঝাঁপিয়ে দলের পড়ে সবাই – আনন্দের মুহুর্তকে আঁটকে রাখার সুযোগ হাতছাড়া করা যাবেনা। আর এর মধ্যেই জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে ছুটে এলেন দলের কোচ গোলাম রাব্বানি ছোটন। উদযাপনের চরম মুহুর্তেও শিষ্যদের সঠিক নির্দেশনা দিতে ভুল করেননি বাংলার ফুটবলের নতুন যুগের এই রূপকার। আর সেই ছোটনের পরিকল্পনাতেই তার আগের নব্বই মিনিট অনবদ্য ক্রিড়াশৈলি উপহার দিল বঙ্গকন্যারা। প্রথমবারের মত অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-১৫ সাফ নারী ফুটবলের ফাইনালে শামসুন্নাহারের ৪২ মিনিটের গোলে শক্তিশালী ভারতকে ১-০ গোলে হারিয়ে শিরোপা জিতে নেয় বাংলাদেশ।

মাত্র ১-০ গোলে জয়, এ আর এমন কি! আসলে, স্কোরলাইন দেখে ম্যাচের সত্যিকার চিত্র বুঝা সম্ভব না একেবারেই। মাঠে বাংলাদেশ নারী ফুটবলারদের আধিপত্য এত বেশি ছিল যে ফলাফল ৫-০ হলেও অবাক করার কিছু থাকতোনা। যদিও সেটা হয়নি। কিন্তু মাঠে যে ফুটবল দক্ষতা প্রদর্শন করেছে বঙ্গকন্যারা, তা অনেকদিন গেঁথে থাকবে মানুষের হৃদয়ে।

ম্যাচের গল্প লিখবনা, লিখতে গেলে লম্বা হবে লেখাটা, কারণ ম্যাচের প্রতিটা মুহুর্তই ছিল যেন একেকটা গল্পের পটভূমি। খেলার রিপ্লে দেখার সময় চেষ্টা করেছি আজকের দলের একাদশের প্রতিটা খেলোয়াড় দক্ষতা সম্পর্কে জানতে। যতক্ষণ তাদের খেলা দেখেছি মনে হচ্ছিল ইউরোপের সবচেয়ে স্কিলফুল প্লেয়াররা বোধয় নেমেছে লাল সবুজ জার্সি গায়ে। কিন্তু পুরা টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ১৪ গোল করার পাশাপাশি কোন গোল হজম না করা দলের প্রতিটা প্লেয়ারই উঠে এসেছে দেশের সবুজ ছায়াঘেরা গ্রাম কোন থেকে। বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেসা মুজিব গোল্ড কাপের অসাধারণ এক প্রাপ্তি আসলো এই জয়ের মাধ্যমে।

দলের খেলোয়াড়দের কথা উঠলে প্রথমেই আসবে শামসুন্নাহারের নাম। আক্রমণভাগের সবচেয়ে চতুর খেলোয়াড় শামসুন্নাহার। বাম প্রান্তে যতবারই বল পেয়েছেন ভারত রক্ষণের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। কখনো স্প্রিন্টে হারাচ্ছে প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়কে, কখনো সিল্কি স্কিল কিংবা ম্যাজিক্যাল টার্নে বোকা বানিয়ে সুযোগ তৈরি করেছে আনুচিন মোগিনির জন্য। খেলার একমাত্র গোল করেছে শামসুন্নাহার নিজেই। দুর্দান্ত ড্রিবলে বারবার হানা দিচ্ছিল। কিন্তু সবচেয়ে কার্যকরী স্কিলটা প্রদর্শন করে ৪২তম মিনিটে।

থ্রোইন থেকে পাওয়া বল দারুন ভাবে এরিয়াল পাসে তাহুরা খাতুনের উদ্দেশ্যে সামনে বাড়ায় আনাই মোগিনি। দলের আরেক সুদক্ষ খেলোয়াড় তাহুরা খাতুনের কাছ থেকে বাম দিকে বল পায় শামসুন্নাহার। সহযাত ড্রিবলে ভারতের ক্রিতিকা দেবী আর সুস্মিতা তান্তিকে পিছনে ফেলে একসাথে। বক্সে ঢুকে ডুয়েল ব্যাটেলে ক্রিতিকার কাছে বল হারায় নাহার, কিন্তু এরপর ভারতীয় খেলোয়াড় বল ধরে রাখতে ব্যার্থ হয় এবং বল চলে যায় বাংলাদেশ স্ট্রাইকার আনুচিং মোগিনির পায়ে। তাকে থামাতে ছুটে আসে শিল্কি দেবী। দুর্দান্ত ক্লোজ কন্ট্রোলে পরাস্ত করে শট নেয় আনুচিং কিন্তু গোলকিপার মনিকা দেবী শটটিকে ঠেকিয়ে দেয় এবং প্রায় তিনফুট উচ্চতায় থাকা বলকে ভলিতে জালবন্দি করে শামসুন্নাহার।

গোলের উল্লেখযোগ্য ব্যাপার ছিল, শামসুন্নাহারের একাগ্রতা। একসময় বল হারিয়েও সেটাকে অনুসরণ করার ফলস্বরুপ গোল করার সুযোগ পায় নাহার। কিন্তু শুধু শামসুন্নাহার না, তার মতো দলের প্রতিটা খেলোয়াড়ের কমিটমেন্টই ছিল অসাধারণ। প্লেয়ারদের মধ্যে দুর্দান্ত বোঝাপড়া এবং হার না মানা মানসিকতা বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব ১৫ প্রমীলা দলকে তৈরি করেছে অপ্রতিরোধ্য এক শক্তিতে।

আক্রমণ, মধ্যমাঠ, রক্ষণ – প্রতিটা ক্ষেত্রেই ভারতকে আউটক্লাসড করেছে বাংলাদেশ। স্ট্রাইকার আনুচিং মোগিনির পিছনে খেলেছে নাম্বার টেন তাহুরা খাতুন, তার ডান পাশে মার্জিয়া এবং বাম পাশে ম্যাজেস্টিক শামসুন্নাহার। ডিফেন্স সামলেছে দুই সেন্টার ব্যাক আঁখি খাতুন এবং নাজমা – সাথে ছিল দুই উইংব্যাক আনাই মোগিনি ও নিলুফার ইয়াসমিন নীলা। আক্রমণ এবং ডিফেন্সের সেতুবন্ধন করেছে অধিনায়ক মারিয়া মান্ডা এবং মণিকা চাকমা। এই দুই সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার মূলত পুরা খেলা কন্ট্রোল করে। ভারতের প্রতিটা আক্রমকে কূড়িতেই নষ্ট করে দিয়ে বল দখল নিচ্ছিল বার বার, সেই সাথে বলের যোগান দেয় আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের। সব মিলে একটা পরিপূর্ণ এবং ব্যালেন্সড দল ছিল বাংলাদেশ।

ম্যাচের পুরা নিয়ন্ত্রন হাতে নিয়ে একটার পর একটা সুযোগ তৈরি হচ্ছিল, কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেগুলো অফসাইডের ফাঁদে পড়ে নষ্ট হয়ে যায়। এই জায়গায় ভারতের রক্ষণভাগকে কৃতিত্ব দিতে হবে, কিন্তু অনেক সময়ই রেফারির ভুল সীদ্ধান্ত ছিল চোখে পড়ার মতো। ম্যাচের প্রায় ২৫ মিনিটের মাথায় সেন্ট্রাল মিডে মনিকা চাকমা চমতকার একটা টার্ন নিয়ে দৃষ্টিনন্দন একটি ডিফেন্সচেড়া পাসে খোঁজে নেয় শামসুন্নাহারকে। কিন্তু রেফারির অফসাইডের বাঁশি একেবারে ফাঁকা ভারতীয় রক্ষণকে গোল হজম করা থেকে বিরত রাখে, অথচ টিভিতে দেখা যায় নাহার অফসাইড পজিশানে ছিলনা। এরকম আরো অনেক বিতর্কিত মূহুর্ত ছিল খেলায়।

অবশ্য বাংলার দুরন্ত কিশোরীদের নৈপুণ্য এসব ভুলিয়ে দেয় দর্শকদের। ২২ মিনিটে তুহরার আরেকটি ১৮০ ডিগ্রি টার্নের পর তার ডান পায়ের বাঁকানো শট গোলপোস্ট ঘেষে চলে যায় মাঠের বাইরে। বলতে ভুলেই গিয়েছি, ম্যাচের শুরুতেইতো সংঘবদ্ধ আক্রমণে গোল পেয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু রেফারির বিতর্কিত ফ্রিকিকের বাঁশি বাংলাদেশকে গোলবঞ্চিত করে। কিন্তু বাতিল হওয়া গোলের আগমুহুর্ত ছিল চোখধাঁধানো ফুটবল। ডান প্রান্তে বল পেয়ে তুহরা সামনে বাড়ায় মার্জিয়ার উদ্দেশ্যে। প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়কে গতিতে পরাস্ত করে সেন্টার করে মার্জিয়া, এর মধ্যেই ডিবক্সে ছুটে এসে গোল করে তুহরা।

যদিও সেটি বাতিল গোল ছিল, কিন্তু অনেকগুলা দুর্দান্ত মুহুর্তের একটি ছিল এটি। এর কিছুক্ষণ পরেই শামসুন্নাহারের ওভারহেড ছিল চোখে পড়ার মতো। ম্যাচের ৮৯ মিনিটের মাথায় আনুচিংকে বদলি করে নামে আরেক শামসুন্নাহার। মাত্র তিন মিনিটেই পায়ের যাদুতে নিজের জাত চিনিয়ে দিয়েছে সে। আসলে মনে রাখার মতো মুহুর্তের অভাব নেই এই ম্যাচে। যারা গ্যালারিতে বসে খেলা দেখেছে তারা সামনে থেকে প্রত্যক্ষ করেছে বাংলার ফুটবলের নতুন এই জাগরণ। অবশ্য জাগরণ কতটুকু হয়েছে বা এটা কতটুকু প্রভাব ফেলবে বাংলাদেশের ফুটবলে সেটা এখনি ববলা সম্ভব না। কিন্তু এই জাগরণের ধারাকে ধরে রাখা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

ফুটবলে আমাদের দেশের মানুষের আগ্রহ কখনো কমতি ছিলনা। দরকার শুধু একটু পরিকল্পনার যেটা দ্বারা মানুষ আকৃষ্ট করা যাবে তাদের সন্তানদের ফুটবলার বানাতে। তৈরি করে দিতে হবে প্রমাণ করার সুযোগ। সেই সুযোগ পেয়ে বঙ্গকন্যারা দেখিয়ে দিয়েছে যে তাদের ফুটবল দক্ষতা অনেক উঁচুমানের। ট্যাকটিক্যালি শক্তিশালী ভারতের সাথে নব্বই মিনিট আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছে তারা।

নান্দনিকতাকে প্রাধান্য দিয়ে ছুটনের তত্বাবধানে এই প্রমীলারা দেখিয়ে দিয়েছে সুযোগ এবং লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড পেলে বাংলার নারীরাও তৈরি করতে পারে ইতিহাস। জাতীয় দলের ফুটবলে যখন ক্রান্তিকাল চলছে ঠিক তখন এমন একটা উপলক্ষ হতে পারে সামনে নতুন উদ্দামে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা । খেয়াল রাখতে হবে এই মেয়েগুলো যেন হারিয়ে না যায়। তাদের প্রয়োজনীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করার পাশাপাশি যেন তারা ফুটবলে নিজেদের ভবিষ্যত খোঁজে পায় সেই ব্যাবস্থাও করে দিতে হবে কর্তৃপক্ষকে।

আজ আমরা ক্রিকেটে একটা ভাল অবস্থানে এসেছি কারণ আমাদের সর্বস্তরের মানুষ ক্রিকেট পছন্দ করে।  আর ক্রিকেটে মানুষের আগ্রহ তৈরি হয়েছে বিশ্ব ক্রিকেটে সাফল্যের কারণে। অনূর্ধ্ব ১৫ সাফ ফুটবলের সাফল্য হতে পারে ফুটবলের সেই মুহুর্ত যখন থেকে এদেশের মায়েরা স্বপ্ন দেখা শুরু করবে তাদের সন্তানও দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেবে। বিজয়ের মাসে এই বিজয়ের গল্পকে তৈরি করতে হবে কিংবদন্তিতূল্য গল্পে, যেখানে মিশে থাকবে মারিয়া, আঁখিদের নাম। মানুষের মুখে মুখে থাকবে তাদের নাম। বিশ বছর পরেও মানুষ স্মরণ করবে তাদের।

ব্যাস! ব্যাস!!

একটু বেশিই স্বপ্ন দেখে ফেলছি বোধহয়।

এতদিন তাদের কথা স্মরণে নাও থাকতে পারে বাংলাদেশের মানুষের। তবে আমাদের মেয়েরা এই বিজয়ের মাঝেও স্মরণ করতে ভুলেনি তিন মাস আগে হারানো সতীর্থ সাবিনার কথা, তারা ভুলে যায়নি একাত্তরের শহীদদের কথা, ভুলে যায়নি ষোল কোটি মানুষের কথা। গোলাম রাব্বানি ছুটন সত্যিই দলটাকে অনেক কিছুই শিখিয়েছেন, সেটা মাঠে হোক আর মাঠের বাইরে। তিনিতো তার কাজ করেছেন নিপুণভাবে। এখন বাকি কাজ বাফুফের। বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব গোল্ড কাপের হাত ধরে বের করতে হবে আরো নতুন তুহরাদের। সেই সাথে তাদের জন্য তৈরি করে দিতে একটি নিরাপদ ফুটবল যাত্রার যেখানে খেলতে গিয়ে হবেনা অন্নের চিন্তা। বঙ্গকন্যাদের হাত ধরে হোক ফুটবলে নতুন যাত্রা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।