হেমন্তের এক মিষ্টি সকাল

টেস্ট স্ট্যাটাসের জন্য প্রথম প্রকাশ্যে নিজের পরিকল্পনার কথা জানান তৎকালীন বিসিবি সভাপতি জনাব সাবের হোসেন চৌধুরী। ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে সভাপতি নির্বাচিত হবার পরে প্রথম বোর্ড মিটিং এই তিনি তার ইচ্ছার কথা জানিয়ে একটা দীর্ঘদিন মেয়াদের পরিকল্পনার কথা জানান সবাইকে।

বিসিবির সেই কমিটিতে সেক্রেটারী ছিলেন সৈয়দ আশরাফুল হক, পরিচালক ছিলেন আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি।

টেস্ট স্ট্যাটাসের স্বপ্ন দেখার পর বিষয়টা অনেকটা অবাস্তব স্বপ্নের মতো ছিলো। কেউই বিশ্বাস করেনি এটা সম্ভব। সাবেক এক ক্রিকেটার নাকি সভাপতিকে বলেছিলেন, ‘সাবের তুমি তো মজা করে বলছো কথাটা তাইনা? এটাতো বাস্তবে সম্ভব না। আইসিসি কেন আমাদের এখন টেস্ট স্ট্যাটাস দিবে?’

এই কেন দিবে এটাই ছিলো একটা অফ ফিল্ড রাজনীতির বিষয়। সেই সময় টেস্ট স্ট্যাটাস পাবার জন্য কোন নিদৃষ্ট নিয়ম ছিলোনা। এখন যেমন আছে যে টেস্ট স্ট্যাটাস পাবার আগে সেই দেশের ঘরোয়া চারদিনের ম্যাচের প্রথম শ্রেনীর মর্যাদা পেতে হবে। বাংলাদেশের পূর্বে টেস্ট স্ট্যাটাস পায় জিম্বাবুয়ে, ১৯৯২ সালে। তারা কারন হিসেবে দেখিয়েছিলো তিন বার আইসিসি ট্রফি জেতার পরেও যদি টেস্ট স্ট্যাটাস না পায় তাহলে জিম্বাবুয়েতে ক্রিকেটের মৃত্যু হবে।

বাংলাদেশ কি বলবে? বলার জন্যতো আগে কিছু করা লাগে! তখন কোচ হিসেবে আনা হয় গর্ডন গ্রিনিজকে। টার্গেট করা হয় ’৯৭ আইসিসি ট্রফি। পরের অংশটা আশাকরি সবাই জানেন। বাংলাদেশ কেনিয়াকে পরাজিত করে আইসিসি ট্রফি জেতে এবং ওয়ানডে স্ট্যাটাস পায় একই সাথে বিশ্বকাপে খেলার টিকেট পায়। সেদিনের কথা যাদের মনে আছে তারা নিশ্চয় জানেন সেটা ছিলো ক্রিকেটের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় উৎসব। সারা বাংলাদেশ ছিলো রং মাখামাখি আর মিছিলের দেশ। মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে ওই ম্যাচেই ইউনিভার্সিটি অব কুয়ালালামপুর মালয়েশিয়ার প্রবাসী ছাত্ররা জয়ের পর ব্যানার উঁচিয়ে ধরে, ‘বাংলাদেশ নেক্সট টেস্ট প্লেয়িং নেশন।’

আইসিসি ট্রফি জেতার পরই সেই সময়ের আইসিসির সিইও ডেভিড রিচার্ডকে বিসিবি সভাপতি জানান ‘উই আর গোয়িং ফর টেস্ট স্ট্যাটাস’।

বাংলাদেশের ক্রিকেটের অকৃত্রিম বন্ধু বলা হয় জগমোহন ডালমিয়াকে। তিনি সেই সময় ছিলেন আইসিসি প্রেসিডেন্ট। তিনি বাংলাদেশের ব্যাপারে অত্যন্ত পজিটিভ ছিলেন। ‘৯৭ সালে আইসিসি ট্রফি জয়ের পর বাংলাদেশের প্রথম পদক্ষেপ ছিলো ঘরের মাটিতে বড় টুর্ণামেন্ট আয়োজন করা। প্রথম পদক্ষেপ ছিলো ১৯৯৮ সালে স্বাধীনতা কাপ আয়োজন করা। স্বাধীনতার ২৫ বছর উপলক্ষ্যে আয়োজন করা ওই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং ভারত অংশ নেয়। বেস্ট থ্রি ফাইনালে ভারত পাকিস্তান প্রথম দুই ফাইনালে এক বার করে জেতার পর ৩য় এবং চ্যাম্পিয়ন নির্ধারনী ফাইনালে ভারত জয় পায়। তারপর বাংলাদেশে আয়োজন করাহয় প্রথম আইসিসি নকআউট বা মিনি বিশ্বকাপ (যেটা আজকের চ্যাম্পিয়নস ট্রফি)।

আট দলের সেই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ খেলেনি, প্রথম আট দল খেলেছিলো। মূলত এই টুর্নামেন্ট প্রমাণ করে দেয় বাংলাদেশ পূর্ন মর্যাদা পাবার যোগ্যতা রাখে। মাঠভর্তি দর্শক খেলাটার আর্থিক বিষয়গুলা ফুটিয়ে তোলে। আইসিসির এই হোস্ট বানানোর সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য বিরাট এক আশীর্বাদ ছিলো, হোস্ট না হলে ক্রিকেটের জন্য বাংলাদেশ কতখানি উপযুক্ত সেটা হয়তো বোঝাতে অনেক দেরি হয়ে যেত আমাদের।

১৯৯৮ সালের মে মাসেই ভারত বাংলাদেশ এবং কেনিয়াকে নিয়ে একটা ট্রাই নেশন কাপ খেলে। এই টূর্ণামেন্টেই বাংলাদেশ প্রথম ওয়ানডেতে জয়লাভ করে। হায়দ্রাবাদে কেনিয়াকে ৬ উইকেটে হারায় বাংলাদেশ। সেই সময় কেনিয়া বাংলাদেশের তুলনায় শক্তিশালী না হলেও দূর্বল ছিলোনা। ‘৯৬ বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে বিধ্বস্ত করা কেনিয়া এই টুর্নামেন্টেই আবার ভারতকে হারিয়ে দেয়। যাইহোক চার ম্যাচের তিন ম্যাচে হেরে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয় বাংলাদেশ।

১২-১৫ মার্চ ঢাকায় নিরপেক্ষ ভেন্যু হিসেবে এশিয়ান টেস্ট চ্যাম্পিয়নশীপের ফাইনালে পাকিস্তান এবং শ্রীলংকার টেস্ট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। ওই টেস্ট শেষে পাকিস্তান বাংলাদেশের সাথে একটা ওয়ানডে ম্যাচ খেলে।

১৯৯৯ বিশ্বকাপের আগে ঢাকায় আয়োজন করা হয় মেরিল কাপ। জিম্বাবুয়ে, কেনিয়া এবং বাংলাদেশ অংশ নেয় এতে। বাংলাদেশ গ্রুপ পর্বের চার ম্যাচই হেরে যায়। বাংলাদেশের প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরী এখানেই।

এরপর ১৯৯৯ বিশ্বকাপ। সেই বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারিয়ে ইতিহাস তৈরী করে বাংলাদেশ। হারায় স্কটল্যান্ডকেও। মূলত ১৯৯৮ সালেই মিনি বিশ্বকাপের সময় জগমোহন ডালমিয়া এবং সাউথ আফ্রিকা ক্রিকেটের প্রধান আলি বুখারের সাথে আলোচনায় সাবের হোসেন চৌধুরী এবং সৈয়দ আশরাফুল হক তাদের বুঝিয়ে দেন ক্রিকেটের বিশ্বায়নের জন্য বাংলাদেশের চেয়ে উত্তম জায়গা আর নেই।

এতো দর্শকের ব্যবসায়িক দিক নিয়েও আলোচনা হয়। কেবল মাত্র এই জনপ্রিয়তা এবং অবকাঠামো না থাকায় একসময় বাংলাদেশের প্রবল প্রতিপক্ষ কেনিয়া কোনদিন টেস্ট স্ট্যাটাস পায়নি। আর এখন হারিয়েই গেছে বলা যায়।

‘৯৯ বিশ্বকাপের পর সাবের চৌধুরী জগমোহন ডালমিয়াকে অনুরোধ করেন টেস্ট স্ট্যাটাসের পক্ষে ভোটাভুটির আয়োজন করার জন্য। ডালমিয়া সাবেরকে বলেন ওই মুহুর্তে ভোট দিলে বাংলাদেশ কেবল ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার ভোট পেতে পারে। বাকিদের ভোট পাবার জন্য বাংলাদেশকে টেবিল রাজনীতি করতে হবে। অর্থাৎ, সাউথ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়াকে রাজি করাতে হবে। নয় পূর্ন সদস্যের ভেতর অন্তত সাতটা ভোট দরকার!

সেই সময় বাংলাদেশের কোচ হয়ে আসে এডি বারলো, এডি বারলোর মাধ্যমে আলি বুখারের সাহায্যে নিশ্চিত হয় সাউথ আফ্রিকার ভোট। সাবের চৌধুরী নিজে সাউথ আফ্রিকা ভ্রমনে যান। একই সময়ে তিনি অস্ট্রেলিয়ার গিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে অনুরোধ করেন পাশে থাকার জন্য।

১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ দল কিছু আন অফিশিয়াল ম্যাচ খেলার জন্য নিউজিল্যান্ড যায়। নিউজিল্যান্ড এর ঘরোয়া দল গুলার সাথে প্রথম শ্রেনীর ম্যাচ খেলে। নিউজিল্যান্ডকে ম্যানেজ করার কাজটা তখনই করা হয়।

 

১৯৯৯ সালে ইয়ান বিশপের ওয়েস্ট ইন্ডিজ আন অফিশিয়াল ম্যাচ খেলতে ঢাকায় আসে (ভারত সফরের প্রস্তুতি হিসেবে)। একটা ম্যাচে এনামুল হক মনি পাঁচ উইকেট নেন। সেসময় ইয়ান বিশপ মন্তব্য করেন বাংলাদেশ টেস্ট খেলার যোগ্য। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ইয়ান বিশপকে বলা হয় তিনি যেন ফিরে গিয়ে ওয়েস্ট বোর্ডের প্রধান প্যাট রসুকে অনুরোধ করেন বাংলাদেশের পাশে থাকার। বিশপ কথা রেখেছিলেন।

আর জিম্বাবুয়ের প্রধান পিটার চিকোগাকে রাজি করানো হয় মেরিল কাপ চলার সময়। একমাত্র ইংল্যান্ডের সমর্থন নিশ্চিত ছিলোনা।

টেস্ট স্ট্যাটাস পাবার জন্য ১৯৯৯-২০০০ সালে চালু হয় জাতীয় ক্রিকেট লীগ। মাঠ স্বল্পতার কারনে ঢাকা, চট্টগ্রামের পাশাপাশি জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ হলের মাঠ ইত্যাদি মাঠেও খেলা হয়। যদিও এই ম্যাচ গুলার প্রথম শ্রেনীর মর্যাদা ছিলোনা। বাংলাদেশের ঘরোয়া চার দিনের ম্যাচ প্রথম শ্রেনীর মর্যাদা পায় বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্যাটাস পাবার পরে।

এর ভেতর ২০০০ সালের শুরুতে আইসিসি ৩ সদস্যের পরিদর্শক দল পাঠায় ঢাকায়। তারা সবকিছু দেখে পজিটিভ রিপোর্ট দেয় আইসিসিকে। পরিদর্শক দল ঢাকায় এসে বিসিবি এবং সরকারের সব অংশ থেকে দারুন সহযোগীতা পাবার কথা জানায় আইসিসির কাছে।

এর পাশাপাশি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিটা দেশের রাষ্ট্র এবং সরকার প্রধানকে টেলিফোনে বাংলাদেশকে ভোট দেয়ার আহ্বান জানান। ভূমিকা রাখেন ওইসব দেশে নিযুক্ত রাষ্টদূত এবং হাইকমিশনাররা।

এরপর সেই মূহুর্ত, ২৬ জুন ২০০০। লন্ডন, আইসিসির বার্ষিকসভায় আইসিসি প্রধান প্রস্তাব তুলেন ভোটাভুটির। বাংলাদেশের আবেদনের পক্ষে ৪৫ মিনিটের একটা রিপোর্ট উপস্থাপন করেন সাবের চৌধুরী। বেশকিছু প্রশ্ন করাহয় তাকে। বাংলাদেশ আশা করেছিলো ৭ ভোট কিন্তু মিটিং এর ভোট পর্বে ৯ দেশই বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাসের পক্ষে ভোট দেয়! পেয়ে গেল বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্যাটাস। সেই দিন মিটিং এ ছিলেন সাবের চৌধুরী এবং আশরাফুল হক আর বাইরে বসে ছিলেন আমিনুল ইসলাম বুলবুল।

একটা কথা সত্যি বাংলাদেশ হয়তো পুরাপুরি প্রস্তুত ছিলোনা টেস্ট স্ট্যাটাসের জন্য। ছিলোনা শক্তিশালী ঘরোয়া ক্রিকেট, টেস্ট খেলাটা কি সেটাই বেশিরভাগ ক্রিকেটার আগে জানতেন না, প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেট খেলার অভিজ্ঞতা ছিলোনা। এটাও সত্যি যে বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাস মূলত টেবিল রাজনীতির ফসল। তবে ওই সময়টা বাংলাদেশের পক্ষে ছিলো।

জগমোহন ডালমিয়া আইসিসির সভাপতি ছিলেন, তিনি খুবই আন্তরিক ছিলেন। সেই সময়ে যারা টেস্ট স্ট্যাটাস আদায় করতে পারেনি তারা কেনিয়া। তাদের অবস্থান আজ কোথায়? আবার আয়ারল্যান্ড প্রায় ৬ বছর আগে প্রথম শ্রেনীর মান সম্পুর্ন ক্রিকেট লীগ আয়োজন করেও এখনো টেস্ট স্ট্যাটাস পায়নি। সুতরাং বলাযায় ওই সময়ে টেস্ট স্ট্যাটাস আদায় না করতে পারলে হয়তো এখনো আমরা সহযোগী দেশ হিসেবেই থেকে যেতাম। হয়তো জিম্বাবুয়ে বা কেনিয়া হতাম আমরা।

ভারতের ব্যাপক সমর্থন দেয়ার যুক্তি ছিলো। ভোটাভুটির বেলায় একটা ভোট নিশ্চিত করে রাখা। সেসময় পাকিস্তান নিশ্চিত না, তামিল টাইগার ইস্যুতে শ্রীলঙ্কা সরকারের সাথে সাউথ ইন্ডিয়ার সম্পর্ক ভালো না, একাধিক ম্যাচ চেন্নাই থেকে সরিয়ে নেয়া হয় ওইসময়। ভারত ভালো দল হলেও অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড এখনকার মতো ভারতকে এতো তেল দিয়ে চলতো না। সুতরাং একজন বন্ধু ভারতের দরকার ছিলো আইসিসির সভাগুলায়। সেটা ভারত কি কারনে করেছে এটা তাদের বিষয়। আমাদের কিছুনা।

অভিষেক টেস্ট খেলার জন্য ভারত এবং ইংল্যান্ড দলকে আমন্ত্রণ জানায় বিসিবি। কিন্তু ব্যস্ত সূচী দেখিয়ে ইংল্যান্ড না আসলে সাড়া দেয় ভারত। পাকিস্তান, জিম্বাবুয়ের পর তৃতীয় কোন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অভিষেক টেস্ট ম্যাচেও প্রতিপক্ষ হয় ভারত।

এরপর আসে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। চলে আসে হেমন্তের সেই মিষ্টি সকাল। ইতিহাসে প্রথমবারের মত টেস্ট ক্রিকেটে টস করতে নামেন দুই বাঙালি অধিনায়ক। বঙ্গবন্ধু জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে হয় সেই ইতিহাসের সাক্ষী।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।