হুমায়ূনের অনন্য তিন সৃষ্টি

১৯৭১

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটা আবেগ আমাদের প্রজন্মের প্রায় সবার মাঝেই আছে। ছোট বেলা থেকে এই বিষয়ে অনেক লেখা পড়েছি, অনেক নাটক সিনেমা দেখেছি। কিন্তু এই বইটি পড়ে অন্যরকম একটা ধাক্কা খেয়েছি।

দুনিয়াতে ভালো মানুষ অনেক আছে। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষই ভালো কাজ করে কাজের স্বীকৃতি পেতে পছন্দ করে, অন্তত সে যে ভালো কাজ করেছে এটা অন্যেরা না বুঝলে কষ্ট পায়। অথচ এই গল্পের নায়ক কাজটাকে দায়িত্ব মনে করে করেছে। সে জানতো অনেক মানুষই তার এই আত্মত্যাগের কথা জানবে না, হয়তো মনে মনে সারা জীবন তাকে ঘৃণা করবে। কিন্তু তারপরেও সে দায়িত্ব থেকে পিছপা হয় নি। মূল চরিত্রের নামটা এখানে বললাম না। যারা এখনো পড়েননি তাদের জন্য সারপ্রাইজ হিসেবে থাকলো। বইটা হুমায়ুন আহমেদের অন্যান্য বইয়ের মতোই সাবলীল। পড়তে একটুও কষ্ট হয় না, শুধু পড়া শেষ করার পরে কার জন্য যেন একটা কষ্ট অনুভূত হয়।

নির্বাসন

বাংলা ভাষায় দুঃখ বিলাস বলে একটা কথা প্রচলিত আছে। মানুষের বিচিত্র সব স্বভাবের মধ্যে একটা হলো মানুষ দুঃখ বিলাসী। আমার প্রিয় বইয়ের খুব সংক্ষিপ্ত তালিকায় এই বইটার নাম আসবে। যখন দুঃখ বিলাসী হতে ইচ্ছে করে তখন আমি এই বইটা পড়ি এবং প্রতিবারই চোখে পানি আসে। যাদের ধারণা হুমায়ুন আহমেদ প্রেমের উপন্যাস লিখতে পারে না তারা এই বইটি পড়ে দেখতে পারেন। তবে যারা বই পড়ে কাদতে চাননা তাদের জন্য এই বই না।

কিছু কিছু মানুষের জন্মই হয় হয়তো কষ্ট পাওয়ার জন্য। বাবা মারা যাওয়ার পর মা’র বিয়ে হয়ে যাওয়ায় আনিস বড় হয় চাচাদের পরিবারে। পরিবারের এক সদস্যা জরীর সাথে প্রেমের সম্পর্ক হয়ে যায়। সবাই জানাজানি হওয়ার আগেই দেশে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধ ফেরত আনিস অসুস্থ হয়ে পড়ায় সব কিছু ভেঙ্গে যায়।

বইয়ের শেষের দিকের একটা লাইন পড়ে বুকের ভিতরটা এতকাল পরেও মোচড় দিয়ে উঠে। ‘জরী নিচু হয়ে আনিসের কপাল স্পর্শ করলো। ভালোবাসার কোমল স্পর্শ, যার জন্য আজীবন একটা ছেলে তৃষিত হয়ে থাকে’ – মাত্র দুটি বাক্যে সম্পূর্ণ আবেগকে জাগিয়ে তোলে।

অমানুষ

১৯৯৯ সালের কথা, তখন ইন্টারমিডিয়েটে পড়ি। কলেজ শেষ করে বাসে করে চলে গেলাম বাংলাবাজার। সেখানে অবসর প্রকাশনী থেকে কিছু বই কিনে পুরোণ বইগুলোর দিকে একটু ঢু মারলাম। অল্প টাকায় বেশ কিছু ভালো বই পেয়েও গেলাম। বাসায় গিয়ে খাওয়া দাওয়া শেষ করে দুটি বই পড়তে পড়তে রাত ১২ টা বেজে গেল। সকাল ৮ টায় কলেজ, তাই তাড়াতাড়ি ঘুমোতে গেলাম। বিছানায় শুয়ে শুয়ে অমানুষ বইটাতে একটু চোখ বুলোতে গিয়ে আটকে গেলাম। এই বই শুরু করে কি শেষ না করে ঘুমানো যায়? সকালে কলেজ যেতে দেরী হওয়ায় স্যারের কাছে বকা খেয়েছি, কিন্তু জামশেদে আচ্ছন্ন আমার তাতে থোড়াই কেয়ার।

পৃ্থিবীতে কিছু মানুষ থাকে যাদেরকে তার আশেপাশের সবাই মন থেকে ভালোবাসে তার কাজের জন্য। এই ধরণের লোক গুলো কিন্তু ভালোবাসা পাওয়ার জন্য কাজটা করে না বরং ভালোবেসে কাজটা করে। গল্পের পটভূমিটা ইটালীর, নিঃসঙ্গ একজন মানুষের অন্যায়ের বিরুদ্ধে একক প্রতিবাদ। জামশেদ চরিত্রটা আমাদের সবার কল্পনায় পছন্দের একটা চরিত্র। জামশেদ যে ভালোবাসা পেয়েছে তা যে কোন মানুষই পেতে চাইবে, কিন্তু ও যে কাজগুলো করেছে তা খুব কম মানুষই করবে। বিষয়টা অনেকটা ‘সবাই স্বর্গে যেতে চায়, কিন্তু কেউ মরতে চায় না’ টাইপ।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।