সৎ মা || ছোটগল্প

রাকার আজ খুব মন খারাপ। ওর ঘরের যে কাঠাল কাঠের আলমিরাটা আছে, সেখানে ঢুকে ভিতর থেকে তাক দুটো টেনে দিয়ে অন্ধকারে বসে আছে। ভিতরে খানিকটা মশাও আছে, অবশ্য রাকার অভ্যেস হয়ে গেছে। রাকার মন খারাপ থাকলেই এখানে এসে লুকোয়। কেউ খুঁজে পায় না, শুধু মা পেতেন। রাকার আজ আরও একটু বেশিই মন খারাপ। কারণ ওর বাবা বিয়ে করেছেন। সারা বাড়িতে সবাই খুব খুশী। রাকাকে কেউ খুঁজছেই না! খুব কান্না পাচ্ছে ওর। কিন্তু কাঁদবে না বলে পণ করেছে।

কে যেন ঢুকলো রাকার ঘরে। উহু, দুজন – মেয়েকন্ঠ। বলছে, ‘ছোট মেয়েটা রেখেই বাপে আরেকটা বিয়া করলো। আল্লাহই জানে কি হইবো।’

উত্তরে শুনতে পেল, ‘কি আর হইবো, বাড়ির সব কাজ করাইবো। না হলে বাপে যখন বাইরে থাকবে তখন পিটাইবো। খাইতে দিবো না।’

আবার বের হয়ে গেল। রাকা এবার কেঁদেই ফেলল। ওর মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে। মাকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে। গন্ধ নিতে ইচ্ছে করছে। রাকার খুব মনে আছে, মা যেদিন মারা গেলেন ক্যান্সারে সেইন মায়ের মুখটা কি শান্ত ছিল! ধবধবে সাদা কাপড়ে জড়ানো মাকে ওরা নিয়ে এল, সবাই খুব কাঁদছিল। রাকা একটুও কাঁদেনি, কাঁদতে পারছিল না বলে কাঁদেনি।

বাবার নতুন বিয়ের পর নতুন মাকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছে ও । ও স্কুলের একটা বন্ধুর মুখে শুনেছে, সৎ মা নাকি ডাইনির মতো হয়।

সকাল বেলা সবাই খেতে বসেছে ডায়নিংয়ে। বাবার নতুন বৌটা লাল শাড়ি পরে বসে আছে। রাকা নেই। ওর দাদী গেল ওকে ডেকে আনতে। গিয়ে দেখে মেয়েটা বিছানায় ঘুমোচ্ছে। আদর করে উঠিয়ে ব্রাশ করিয়ে দিল দাদী। রাকা দাদীকে ভালোবাসে। কিন্তু এখন ওর তার উপরও রাগ। যদিও শেষপর্যন্ত দাদীর কোলে চড়েই খেতে গেল। ওর চেয়ারে পা দুলিয়ে বসতেই দেখল নতুন মাকে। ভয়ে শুকিয়ে গেল। তাকাচ্ছে না ঠিক করে। আবার আড় চোখে দেখছে। একবার ধরাও পড়ে গেল। নতুন মা তার দিকে তাকিয়ে মিটি মিটি হাসছে, স্নেহভরা দৃষ্টিতে।

খাওয়া শেষে সবাই যখন যার যার ঘরে গেল, বাবাও বের হয়ে গেল; তখন নতুন মা এল রাকার ঘরে। ও তখন বসে বসে ছবি আঁকাচ্ছিল। নতুন মা এসে বসলেন ওর পিছনে। হঠাৎ রাকা শুনতে পেল, ‘বাহ! গ্রামের দৃশ্যটা তো খুব সুন্দর হয়েছে!’

পিছনে তাকিয়ে মাকে দেখতেই খাতা বুকের মধ্যে লুকিয়ে ফেলল। ভীরু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আবার মুখ নামিয়ে নিল। ওর কোকড়ানো চুলগুলো সরিয়ে নিল কানের পাশে। চুলগুলো একদম মায়ের মতো। এই নতুন মায়ের চুলও কোঁকড়ানো।

নতুন মা রাকার কান্ড দেখে হাসলেন। বললেন, ‘আমাকে তোমার পছন্দ হয়নি? রাগ করে আছ?’

রাকা কোন কথা বলে না।

আবার নতুন মা বলে, ‘রাগ করো না, আমি তোমাকে বকা দেব না। খাইয়ে দেব, গোসল করে দেব, পড়াবো। আমি না, খুব ভালো ছবিও আঁকতে পারি। তোমাকে শিখিয়ে দেব।’

রাকা কিছু বুঝে উঠতে পারে না। ভাবলো, ও তো স্কুলে শুনেছিল সৎ মায়েরা নাকি ডাইনীর মতো হয়। ও ভূতের সিনেমায় দেখেছে ডাইনী। কিন্তু নতুন মা তো এমন না! ও তো ওর মায়ের মতোই মনে হয়। আবার কথাও বলছে ভালোভাবে। কিন্তু ডাইনীর কন্ঠ তো খ্যানখেনে! ভেবেই কূল পায় না।

নতুন মা বলল, ‘তুমি বোধহয় আমাকে পছন্দ করছ না। আচ্ছা আমি তাহলে উঠি। বিকেলে চকলেট কেক বানাবো। আমি খুব ভালো কেক বানাতে পারি। তুমি খাবে?’

রাকা তাজ্জব হয়ে গেল। নতুন মা কি করে বুঝলো ওর চকলেট কেক ভালো লাগে! একবার পিটপিট করে তাকালো মায়ের দিকে। নতুন মা মিষ্টি করে হেসে বের হয়ে গেল।

বিকেলে নতুন মায়ের বানানো চকলেট কেক খেয়েছে সে। এর মধ্যে খানিকটা কথাও হয়েছে। ভাব হয়নি এখনও। সে জেনেছে নতুন মা ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চায়। কিন্তু সে গাল ফুলিয়ে বলে দিয়েছে ভেবে দেখবে। নতুন মা আবার হেসেছে। রাকা অবাক হয়ে দেখেছে। রাতের বেলা নতুন মা এসে বলে তুমি আমার কাছে শোবে? উত্তরে রাকার ঘাড়ে যত জোর ছিল সব দিয়ে ঘাড় নাড়িয়েছে। না, সে শোবেই না।

রাতের বেলা একা একা ঘুমোয় ও। দাদীর কাছেও যায় না। অথচ পরদিন সকালে উঠে দেখে সে নতুন মায়ের কোলের মধ্যে শুয়ে আছে। স্বপ্ন দেখছে নাকি!

আজ ওর মায়ের জন্মদিন। ওর আবার মন খারাপ। আলমিরার মধ্যে লুকিয়ে আছে। কেউ খুঁজে পাবে না। ও জানে কেউ খুঁজতেও চাইবে না। অবশ্য নতুন মা ওকে কেন জানি বারবার কাছে রাখতে চাই। সে বলেছে, রাকা তার পাশে থাকলে নাকি তার মন ভালো থাকে। মা বেঁচে থাকলে মায়ের জন্মদিনেও রাকার পছন্দের খাবার তৈরী হয়। ঘর সাজানো হয়। আজ কিচ্ছু হয়নি।

খুট করে শব্দ হওয়ায় ঘুমটা ভেঙ্গে গেল রাকার। আলমিরার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। তাকিয়ে দেখে নতুন মা। মেয়েটা কাঁদছে। ও অবাক হয়ে তাকিয়ে মুখ ফুটে বলে ফেলল, ‘তুমি কাঁদছ কেন? তোমার কি হয়েছে?’

নতুন মা বলে, তুমি এখানে? আমি তোমাকে সব জায়গায় খুঁজে বেড়াচ্ছি!

রাকার সুরসুর করে বের হলো ওর সাথে। নতুন মা চোখ মুছতে মুছতে ওর পিছনে পিছনে বের হলো। বাইরে গিয়ে দেখে পুরো ঘর সাজানো। কি ব্যাপার! একটু পর সবাই একসাথে হলো, ডায়নিংয়ে। সেখানে কেক আনা হয়েছে। লেখা, ‘রাকার আম্মুর জন্মদিনে রাকা, নতুন মা, বাবা, দাদীর শুভেচ্ছা।’ রাকা হা হয়ে সবার দিকে তাকিয়ে আছে।

রাকা তাকিয়েই থাকে। নতুন মায়ের দিকে। নতুন মা তাকিয়ে তাকিয়ে হাসে, মিষ্টি করে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।